শোক দিবসের সাথে যখন রাজনীতি ও ব্যবসা জমজমাট

0

সাজু বিশ্বাস:

রাস্তার বিলবোর্ডগুলোই চোখে পড়ে বেশি। অন্তত দশ পনেরোদিন আগে থেকেই তারা রাস্তার বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ঝুলে আছে। সাদা ক্যানভাসের উপরে কাঁচাপাকা চুলের সাদা পাঞ্জাবি পরা বঙ্গবন্ধু। তার বুকের বামপাশের সাদা পাঞ্জাবিতে এক থোপ রক্ত, —সেখান থেকে রক্তের ফিনকি গড়িয়ে নিচে নামছে।

বোর্ডের নীচের অংশটা অপেক্ষাকৃত কালচে লাল। সেখানে স্হানীয় নেতার বা নেতাদের ছবি। একটু ভাল করে তাকিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, শোকে কুঁকড়ে যাওয়া চেহারা নয়। বরং মুখের উপরে ভাল করে ফটোশপের এডিটিং দিয়ে নেতাদের মুখগুলো যথাসম্ভব পেলব করে তোলা হয়েছে। যাতে মানুষেরা সহজে বুঝতে পারে,– হ্যাঁ, এই যে, ইনিই বর্তমানে এই এলাকায় জাতীয় শোক জ্ঞাপনের একমাত্র হকদার— এবং আপনারা শুধু এই সময় নয়, পরবর্তী যে কোন সময়েও দরকারে -অদরকারে তাকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে ভাবুন।

জাতীয় পত্রিকাগুলোর কাছে দিনটি একটি একটি রমরমা বাণিজ্যিক দিন। একমাস আগে থেকে এড-বুকিং আর ডিজাইনিং শুরু হয়ে গেছে। যে কোনও ন্যাশনাল বা ফেস্টিভ্যাল ডে-তে আগে টপিকের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। অনুষ্ঠান পালন হয়, তারপরের দিন সেই দিবসের বিস্তারিত রিপোর্ট পত্রিকায় আসে।

পনেরোই আগস্ট আলাদা। এই একটিমাত্র দিন, আগে থেকে সব সাজিয়ে গুছিয়ে মিডিয়ায় পেশ করা যায়। কোন কোম্পানি কোন পেইজের কতটুকু কিনবে, তাদের শোকদিবসের প্রতিপাদ্য কি হবে, তা আগেই ঠিক হয়ে গেছে। টিভিতে পুরনো আর্কাইভ ঘেঁটে বঙ্গবন্ধুর চমৎকার কিছু ভিডিও ও স্টীল ফটোগ্রাফি এবং পনেরোই আগস্টের ডকুমেন্টারি সংগ্রহ করাই আছে। শুধু সময়মত নতুন কিছু কথা ঢুকিয়ে তা প্রচারের অপেক্ষা। এবং বড় বড় প্রতিষ্ঠান এই রিপোর্টিঙের নীচের কোথায় কোন অংশটুকু কিনবে,জায়গা হিসেবে সেই অংশটুকুর গুরুত্ব বুঝে কেবল অর্থ-মূল্য নির্ধারণ করা বাকি। নিউজ উপস্থাপনের সাথে জড়িত প্রত্যেককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে শোকানুরুপ সাদা-কালো পোশাক পরিধান করে আসতে।

রাস্তার মোড়ের জুতসই জায়গাগুলোতে শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। সেখানে সকাল ছয়টা থেকে মাইকে ফতেহা পাঠ,দেশের গান ও বঙ্গবন্ধুর ভাষণ একসাথে বাজছে। গত কিছু বছর ধরে এইদিন একটি বড় উপলক্ষ্য! এইজন্য সেইভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে রেকর্ডিং তৈরি করা হয়েছে। শামিয়ানার এক কোণায় বড় বড় ডেকচি বসিয়ে মিলাদের খিচুড়ি রান্না করছে দুজন ভাড়া করে আনা বাবুর্চি।

দেশের কয়েকটি জাতীয় দৈনিকের একটি পুরো পৃষ্ঠা ধরে কিনে নিয়েছে একটি পণ্যের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। তারা শোক দিবসের টাইটেল লিখেছে,—” শোকের মাতম ভেঙে নতুনরূপে স্বপ্ন দেখি চিরন্তন “। উপরে কালো শোকদিবসের ব্যাচের মধ্যে আধখানা মুখের নির্মিলিত চোখ!

আজকাল সামাজিকতা মানেই অর্ধেকটা ফেসবুক। কার ছবি কতোটা ভাল হয়, তার একটা প্রচ্ছন্ন কম্পিটিশন আছে এখানে। শোকদিবস কে কোথায় কেমন করে পালন করছে, তা ফেসবুকের ছবিতেই বোঝা যাচ্ছে বেশ। এবং সেই অনুযায়ী সেই লোকের গুরুত্বও বাড়ছে বন্ধুদের কাছে! কে কত বড় মাপের গুরুত্ব রাখে, তার ছবির চেহারা তা প্রকাশ করতে পারছে অনায়াসে। ব্যক্তিগত এডভারটাইজিংও হয়ে যাচ্ছে এই ফাঁকে।

মাত্র পঁয়ত্রিশ বা ছত্রিশজন লোক উপস্থিত ছিল এই লোকটির জানাজায়। খুব নিরবে সারাজীবন গ্রামের কাদামাটি থেকে উঠে এসে জাতিসংঘের অধিবেশনের ডেস্ক পর্যন্ত বাংলা পৌঁছে দিয়েছিল যে মানুষটি, তাকে একরকম জোর করে কবরে পৌঁছে দেওয়া হল। সারাজীবনে রাজনীতি ছাড়া কিছুই সম্বল ছিল না তার। এমনকি নিজের পরিবারের প্রতিও তেমন কিছু দায়িত্ব পালন করতে পারেননি সারাজীবন। আপ্রাণ চেষ্টা করে টেনে হিঁচড়ে তিনি প্রথমে ব্রিটিশ, তারপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কবল থেকে বাংলার মানুষের অধিকার আদায় করার জন্য ছুটেছেন সারাজীবন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই মানুষটিই একমাত্র নেতা, যিনি ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখতেন, আমি নেতাই হবো— রাজনীতিই করবো। আর কিচ্ছু নয়। তিনি আর কিছুই করেননি।

কিছু বছর এমনও গেছে, যখন তার মৃত্যুবার্ষিকী নিয়ে টুঁ শব্দটাও করা যায়নি। কিছু বছর জাতীয় দৈনিকের এক কোণায় কেবল ছোট্ট করে সংবাদ এসেছে,— আজ বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী!

আজকের পনেরো দিনের শোক কর্মসূচি কেবলমাত্র সেই বিবাগী রাজনীতিবিদের জন্য ভালবাসার কারণেই? মনে হয় না তা। শোক দিবসের সাথে রাজনীতি আর ব্যবসা মিলে জমজমাট হয়ে উঠেছে। মাঝখানে কেবল বঙ্গবন্ধু একটা অর্থপূর্ণ লোগো হয়ে গেছেন। ব্র্যান্ডিঙের সুবিধা মতো একটি জায়গার নাম এখন জাতীয় শোক দিবস।

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর একটু খণ্ড অংশ দেখি। এই কাহিনী এতোটুকু বোঝার জন্য যথেষ্ট যে এই লোকটি তার সমস্ত দিয়ে দিয়েছিলেন রাজনীতির জন্য।

উনিশশো চুয়ান্ন সালের নির্বাচন। যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করেছে। ফজলুল হক এদিক ওদিক গুঁই গুঁই করলেন, কিন্তু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আর মাওলানা ভাসানীকে টলাতে পারলেন না। শেষকালে কোয়ালিশন সরকারের কো-অপারেটিভ ও এগ্রিকালচার ডেভেলপমেন্ট দায়িত্ব দেওয়া হলো শেখ মুজিবকে। এদিকে বেগম মুজিব আগেই ঢাকায় চলে এসেছিলেন, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার সুবিধা হবে,—এক জায়গায়ও থাকা হবে সেই উদ্দেশ্যে।
বঙ্গবন্ধু মন্ত্রী হবার পর তারা মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবনে উঠলেন।

মে মাসেই বঙ্গবন্ধু কোয়ালিশন সরকারে শপথ নিয়েছেন। মে মাসের শেষের দিকেই করাচিতে ডাক পড়ে তাদের। এদিকে করাচি থেকে বঙ্গবন্ধু ফেরার আগেই পাকিস্তান আর্মি নামিয়ে দিয়েছে পূর্ববাংলায়।

বঙ্গবন্ধুর জবানি——-

——” বাসায় এসে দেখলাম, রেণু (বেগম মুজিব) ভাল করে সংসার পাততে পারে নাই এখনো (মিন্টো রোডের সরকারি বাড়িতে)। তাকে বললাম, আর বোধ হয় দরকার হবেনা। কারণ মন্ত্রীত্ব ভেঙে দিবে, আর আমাকেও গ্রেফতার করবে। ঢাকায় কোথায় থাকবা! বোধ হয় বাড়িই চলে যেতে হবে। আমার কাছে থাকবা বলে আসছিলা, ঢাকায় ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ হবে…বোধ হয় তা আর হলো না। নিজের হাতের টাকাগুলিও তো খরচ করে ফেলেছো”।

এরপর তিনি বাড়িতে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলেন এবং বের হয়ে গেলেন। আওয়ামী লীগ অফিসে এসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরানোর সময় থেকেই পুলিশ তার পিছু নিল। এবং সেই দিনই তিনি গ্রেফতার হলেন।

আশা করি, আগামী সময়েও এই বাঙালির এই একমাত্র মূলধন, এই আপাদমস্তক রাজনীতির প্রতি সমর্পিত সাদাসিধে একমাত্র নেতার জন্য এমন দরদ বাঙালির দেখতে পাবো। সে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকুক বা রাজপথেই থাকুক। তখন হয়তো বুঝতে পারবো, লাখ লাখ টাকা খরচ করে এইসব বিলবোর্ড, বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ডিং শোকপালন কেবলমাত্র বাণিজ্য ছিল না। আসলেই তা ছিল মানুষটির প্রতি ভালবাসার নিদর্শন।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 90
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    90
    Shares

লেখাটি ২৮৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.