আমাদের মনের সেই জোরটা আর আছে কি!

0

সালমা লুনা:

আজ সকালে মেট্রোর সামনে গাড়ির সামনে দিয়ে যে নারী দুহাতে দুটি স্কুলের পোশাক পড়া মেয়ের হাত ধরে রাস্তা পার হচ্ছিলেন কোনদিকে না তাকিয়ে, গাড়ি থামিয়ে নেমে গিয়ে তাকে খুব নরম গলায় আমার বলতে ইচ্ছা করেছিলো, ‘আপা কোনদিকে যাবেন? ওই তো পাঁচগজ দূরেও না ফুটওভার ব্রিজটি। আপনার এবং আপনার হাতে ধরা দুই শিশুর নিরাপত্তার জন্যই। দয়া করে ওইটি ব্যবহার করুন’।

বলতে পারি নাই।

স্কুলের গেইটের দুপাশে পতাকা লাগানো সরকারি গাড়ি, আর্মির আর পুলিশের লোগোঅলা যে গাড়িগুলো এবং উঁচুতলার মানুষের দামী দামী গাড়িরা তাদের মালিকদের সন্তানদের নামিয়ে দিয়েও অযথা রেখে দিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছিলো। খুব খেয়াল করে দেখলাম তাদের ড্রাইভারগুলো বেশ দশাসই। ভেতরে বসে ফোনে কথা বলছে কেউ, আবার কেউবা প্রজাজ্ঞানে অন্যদের মাপছে। তাদের জন্যই যে হেঁটে আসা রিক্সায় আসা বাচ্চারা এমনকী গাড়িগুলোও নিরাপদে স্কুলের গেইটে পৌঁছাতে পারছে না, এটা তারা উপভোগ করছে। তারা যাদের বহন করে এনেছে সেই মালকিনরা নিশ্চয়ই ভেতরেই দাঁড়িয়ে হাহাহিহি করছেন।

খুব ইচ্ছে করেছিলো গাড়ি থেকে নেমে স্কুলের গেইটে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে রাস্তা মাথায় তুলি, “ভাবী! ভাবী! এই যে ভাবীরা! চটপট গাড়িতে উঠে পড়ুন দেখি এবার। বাকি গল্প মোবাইল ফোনে বরদের পকেটের পয়সা খর্চা করে বাড়ি বসে করবেন বরং। এইবেলা গাড়িতে চড়ে বাড়ি চলে যান। নয়তো বন্ধুবান্ধবীদের নিয়ে কাছেই আপনাদের উপযোগী আধুনিক আড্ডাখানা গ্লোরিয়া জিনস, ক্রিমসন কাপ নয়তো কোল্ড এন্ড ক্রিমারিতে চলে যান দেখি। বেশ মাখো মাখো আড্ডা হবে। ডায়মন্ডের সেট, সোনার দাম কমে যাওয়া, নয়তো এই ঈদে মরিশাস নাকি মালদ্বীপ যাচ্ছেন – তাই নিয়ে।

বলতে পারি নাই।

ফিরে আসবার পথে সোবহানবাগে যে ভদ্রলোক বাইকের সামনে হেলমেট পরা শিশুসন্তানকে বসিয়েছেন, তার পরনে মাস্টারমাইন্ডের পোশাক। আর পেছনে সম্ভবত স্ত্রী যিনি হয়তো শিক্ষিকা ওই স্কুলেরই (পরে দৃষ্টি অনুসরন করে দেখেছি মেইন শাখাতেই নেমেছেন) তারা দুজনেই হেলমেট বিহীন যাচ্ছিলেন। তিনজন মিলে কথা বলে বেশ হাসছিলেন। একটু সময়ের জন্য আমার পাশাপাশি দাঁড়ালেন।

তখনও ইচ্ছে হলো গাড়ির কাঁচ নামিয়ে বলি, ‘ভাইয়া বাচ্চার পাশাপাশি আপনারাও পরুন না হেলমেট। আপনাদের কিছু হলে ওই শিশুটির কী হবে’?

বলতে পারি নাই।

মায়ের দোয়া লেখা হিউম্যান হলার নাকি টেম্পুটা ডানে-বামে জিগজ্যাগ করে বাইক স্কুটি গাড়িদের দাবড়ে যে চলছিলো আসাদ এভিনিউ ধরে। একটু ঝুঁকে দেখলাম বছর কুড়ি হবে বয়স ড্রাইভারটার। দাঁত বের করে হাসছে। আমার কী ভীষণ ইচ্ছে করছিলো নেমে গিয়ে ওর লাইসেন্সটা দেখতে চাই।

আমার সে অধিকার কোথা?

বাসার একদম কাছেই একটা ডেঞ্জার জোন আছে। একটি হসপিটালের সামনের রাস্তাটা হঠাৎ করেই যেখানে বেশ বাঁকা আর সংকীর্ণ হয়ে গেছে। সেখানে গত তিনচার বছরে কমপক্ষে ছজন মানুষ মারা গেছেন। ওখানে এসে দেখলাম চলন্ত বাসের সামনে দিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হলো কিছু মানুষ। পার হয়েই তাদের সেকি হাসি! যেন বিরাট একটা কাজ করেছে।
তখনও ইচ্ছা করেছিলো গাড়িটা সাইড করে নেমেই যাই। গিয়ে সবাইকে ধরে ধরে জিজ্ঞেস করি এই যে ভালোমানুষের বেটাবেটিরা! হেসে হেসে তো দিব্যি পার হলেন। এইসব ‘মৌমিতা’ ‘আবাবিল’ ‘ঈগল’এর ড্রাইভাররা আপনাদের বেয়াই লাগে নাকি ? যদি চাপা দিয়ে চ্যাপ্টা করে যেতো, এই হাসি কোথায় থাকতো ?

জিজ্ঞেস করিনি।

কে আর এতোসব জিজ্ঞেস করার হুজ্জোতি করে বলেন?

তাছাড়া জিজ্ঞেস করতে যে মনের জোরটা লাগে, তা আর কই আমাদের?

সবই তো ফুরিয়ে গেছে।

আলাদিনের চেরাগ ফুঃ দিয়ে নিভিয়ে দিলে সব ভালো ভালো জিনিস উপহার দেবার দৈত্যটাও যেমন চলে যায়, তেমনি আমাদের ভালোর আশাটাও চলে গেছে এক ফুঃ এ। এখন আছে শুধু অন্ধকার আর বঞ্চনাভরা একটা হাহাকার।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 271
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    271
    Shares

লেখাটি ১,১৩৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.