‘সুন্দরী’ বাছাইয়ের প্রতিযোগিতা এবং নারীর ‘ক্ষমতায়ন’

0

নাদিয়া নাহরিন:

তখন বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণীতে পড়ি। সময়টা ২০০০ সাল। সেই সময়ের কোনো এক সন্ধ্যা কিংবা রাতে পরিবারের সঙ্গে টেলিভিশন দেখছিলাম। ইন্টারনেট বা সামাজিক মাধ্যম বহুল প্রসারিত মাধ্যম হয়ে ওঠেনি তখনও। তাই ‘বোকা বাক্স’টাই ছিল পুরো পরিবারের বিনোদন বনাম তথ্য পাবার অন্যতম মাধ্যম।

তো সেই বোকা বাক্সে চলা অনুষ্ঠানটি ছিল ‘মিস ওয়ার্ল্ড কনটেস্ট ২০০০’, অর্থাৎ একটি ‘সুন্দরী বাছাইয়ের প্রতিযোগিতা’। বিদ্যালয়ের প্রথম পাঠে এ ধরনের আয়োজন বা অনুষ্ঠানের প্রতি আগ্রহ ছিল বেশ। তাই মনোযোগ দিয়ে একের পর এক বিভিন্ন দেশের ‘প্রতিনিধিত্বকারী সুন্দরী’দের দেখছিলাম। তাদের বিভিন্ন গুণাবলী যেমন- কথা বলার ভঙ্গি, গান কিংবা ঝলমলে পোশাকে সুরের সঙ্গে মিলিয়ে নৃত্য। সে যাই হোক অনেক ধৈর্য বা শিশুবয়সের বিরক্তির পর ফলাফল জানা গেল যে এবারে বিশ্বসুন্দরীর খেতাবটি জিতে নিয়েছেন ভারতের প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। আর সঙ্গে সঙ্গেই পরিবারের দুয়েকজন সদস্য বলে উঠলো, ‘ধুর! এই ফল তো আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। আরেহ! পুরোটাই দুনম্বরী’।

লেখক: নাদিয়া নাহরিন

ভারতের প্রিয়াঙ্কা চোপড়া কতখানি সুন্দর কিংবা সুন্দর না; অথবা রূপ ছাড়াও তার অভিনয়ের যোগ্যতা আছে কি নেই; এ বিষয়ে এখানে কোন মন্তব্য করা হচ্ছে না। মন্তব্য করাও হচ্ছে না ‘সুইমস্যুট’ পরিধান নিয়ে।

মূলত যে বিষয়টি নিয়ে দ্বন্দ্ব কিংবা প্রশ্ন, সেটি হলো- এই ‘সুন্দরী’ কিংবা নারীদের প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিয়ে। এই যে আকর্ষণীয় পোশাক, জুতো কিংবা শারীরিক গঠন নিয়ে যে এই সুন্দরীরা কিংবা রূপালি পর্দার যে কোন তারকাই সগর্বে হেঁটে বেড়ান সেখানে তাদের ভিতটা কতখানি মজবুত!

এবার তাহলে সুন্দরী বাছাই পর্বেই চলে আসা যাক। এই যে বিভিন্ন দেশ থেকে একজন নারীকে ‘সুন্দর’ কিংবা ‘সুন্দরী’ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়; সেখানে যতটা না তার মেধা, কর্মনৈপুণ্য প্রভাব রাখে তার থেকেও বেশি প্রভাব রাখে বিচারক বনাম পুঁজিবাদী সমাজের কলকব্জা।

কীভাবে? খুব সহজ কথায়, আগে থেকেই নির্ধারণ করা হয়ে থাকে ‘কোন দেশের’ প্রতিনিধিত্বকারীকে বিশ্বের সামনে এনে দেওয়া হবে। এবং এটি নির্ধারণ করা হয় একেকটি দেশের ভৌগলিক অবস্থান, দেশটির সঙ্গে শীর্ষ পুঁজিবাদ আমেরিকা রাষ্ট্রের ‘বাণিজ্য সম্পর্ক’ কেমন। অর্থাৎ এমন একজন দেশের ‘সুন্দরী’ চাই যে কিনা বৃহৎ এবং ক্ষমতাশীল কর্পোরেট ব্র্যান্ডগুলোর নিত্য নতুন পণ্য উপস্থাপন করতে পারে। সেটা কীভাবে? অবশ্যই গণমাধ্যমের মধ্য দিয়ে। আমরা যে টেলিভিশনে প্রোগ্রামের চেয়ে বিজ্ঞাপন বেশি দেখে বিরক্ত, সেই বিজ্ঞাপন এখানে মূল এবং অন্যতম হাতিয়ার।

বিজ্ঞাপনের মূল কাজটাই হলো আপনার এবং আমার মধ্যে ‘কৃত্রিম চাহিদা’ তৈরি করবে। আমার হয়তো নির্দিষ্ট কোনো ব্র্যান্ডের পোশাকের প্রয়োজন নেই। তারপরেও নিজেকে ‘সুন্দরভাবে উপস্থাপন’ কিংবা ‘ভিন্ন’ করে তুলবার জন্যে আমার ঐ পণ্যটি চাই-ই। সেই পোশাকেরও আবার কোয়ালিটি যাচাই করা হবে তার মূল্য দিয়ে। ব্র্যান্ডের পোশাকের মূল্য যত বেশি, সেটির পরিধায়ক হিসেবে আমার মূল্যও তত বেশি। আর এই কৃত্রিম বা অহেতুক চাহিদাটিকেই বলে ‘কমোডিটি ফেটিশিসম’। এটি তো শুধু একটি পোশাকের উদাহরণ দেওয়া হলো। পোশাক ছাড়াও এর বিস্তার দেখা যাবে যেকোনো নামী দামী ব্র্যান্ডের পণ্যে কিংবা কোন রেস্তোরার খাবারে।

 আর চমকপ্রদ এই পণ্যগুলো আমাদের গণমানুষের সামনে এনে দেয় বিজ্ঞাপন এবং এই সুন্দর খেতাবধারী তারকারাই (বর্তমানে সুন্দরীদের পাশাপাশি সুন্দর বা খেলোয়াড়দেরও চোখে পড়ে)। এবং কিছুটা হলেও আমাদের মধ্যে কাজ করে, ‘আমিও ওমন হতে পারবো যদি নির্দিষ্ট পণ্যটি আমি ব্যবহার করি’।

এবং এখানেই এবং এভাবেই কর্পোরেট গোষ্ঠী বা ব্র্যান্ড কিংবা প্রতিষ্ঠানের মালিকদের লক্ষ্য হাসিল! তারা এই সুন্দরীদের দিয়ে যেই কাজটি করতে চায় সেটি শেষমেশ তারা করে নেয়! এবং স্বাভাবিকভাবেই সেই নারীটিও রূপান্তরিত হয় পণ্য উপস্থাপনকারী আরেকটি জড় পদার্থে। আরেকটি সহজ  উদাহরণ যদি দেওয়া যায়, সেটি হতে পারে আমাদের ‘লাক্স চ্যানেল আই সুন্দরী প্রতিযোগিতা’।  নামেই একটি ট্যাগলাইন জুড়ে দেওয়া হয়েছে- ‘ইউনিলিভার’ এবং ‘চ্যানেল আই’। অর্থাৎ এই প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত সুন্দরী  আপনার আমার সামনে তুলে ধরবে ইউনিলিভারের পণ্য। এবং এই পুরো প্রতিযোগিতার প্রচার এবং প্রসারে ভূমিকা রাখবে চ্যানেল আই। খেয়াল করলেই দেখতে পাওয়া যাবে, ‘ফেমিনা মিস ইন্ডিয়া’, ‘তিলোত্তমা সুন্দরী’ কিংবা ‘সানন্দা সুন্দরী’ সবগুলোতেই একেকটি ট্যাগলাইন জুড়ে দেওয়া আছে। যাতে ‘ব্র্যান্ডের নামেই প্রসার হয়’!  

এবার আসা যাক সুন্দরী বাছাইয়ে দেশ প্রসঙ্গে

১৯৯৪ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত এই অর্ধ-যুগের সময়ে ভারত থেকে সুন্দরী খেতাব অর্জন করেছে মোট ৬ জন। ঐশ্বরিয়া, সুস্মিতা সেন কিংবা প্রিয়াঙ্কা চোপড়া; এই প্রতিটি তারকার সঙ্গেই আমরা অধিকাংশই পরিচিত। কিন্তু আরেকটু পিছিয়ে যদি যাই, ফিরে দেখি ১৯৯৪’র আগেকার বছরগুলোতে। দেখা যাবে মাত্র একজন সুন্দরী রিটা ফারিয়া এই খেতাবটি পান ১৯৬৬ সালে। তার মানে ১৯৬৬ থেকে ১৯৯৪ এই দীর্ঘ ২৮ বছরে ভারতে কোন সুন্দরী-ই ছিল না! হঠাৎ করেই এর বুম হল ৯৪’এ এসে! নাকি মিস ওয়ার্ল্ডের আয়োজকদের প্রয়োজন পড়েনি এই রাজ্য থেকে কোন সুন্দরী বাছাইয়ের?

কারণটা তাহলে কী? অবশ্যই সেই বাণিজ্যিক! অর্থাৎ ভারত অবশ্যই বৃহৎ একটি দেশ। এবং আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র হওয়ায় খুব স্বাভাবিকভাবে সংস্কৃতির আদানপ্রদানও হবে। ফলে আমেরিকা বা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো যদি এই দেশটি থেকে একজন কিংবা কয়েকজন সুন্দরীকে বিশ্বের মঞ্চে উপস্থাপন করতে পারে, তাহলে বাণিজ্যের কতটা প্রসার হবে!

শুধু ভারত-ই নয়! ২০০১’র টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর পশ্চিমাদের থেকে একেবারেই সরে দাঁড়ায় মুসলিম প্রধাণ রাষ্ট্রগুলো। কিন্তু বাণিজ্য তো ধর্ম মানে না। তাই প্রয়োজন হয় সেই মুসলিম দেশ থেকেও ‘সুন্দরী’ বাছাইয়ের। তাই ২০০২ সালে তুরস্কের তরুণী জিতে নেয় বিশ্বসুন্দরীর খেতাব। আর লেবাননের তরুণী জিতে নেয় মিস ইন্টারন্যাশনালের মুকুট। বর্তমানে এই প্রতিযোগিতা আরও বিস্তৃত হয়েছে।

অর্থাৎ সুন্দরী হতে হলে প্রতিযোগীদের নিজ যোগ্যতার চাইতেও বড় ভূমিকা রাখে পিছনের অন্তর্মহল। আর ক্ষমতায়নের ব্যাপারটিতে যদি আসি, দেখা যাবে এই প্রতিযোগিতাগুলোর বেশ কয়েকটি গ্রুমিং সেশন থাকে। যেখানে নৃ-বিজ্ঞানী সুসান রাঙ্কল দেখেছেন যে, যেভাবে প্রতিযোগীদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের মেরামত করা হয় সেখানে নারীর মেধা, এবং যোগ্যতার চেয়ে শারীরিক সৌন্দর্যটাই বেশি প্রাধান্য পায়। শরীর যেন এখানে একটি ‘পার্টস’। অর্থাৎ, একজন সুন্দরীকে ‘চিকন, লম্বা পদ যুগলের অধিকারিণী, বিন্যস্ত কেশ, সরু কোমর, সুন্দর কণ্ঠ, স্ফীত স্তন, উজ্জ্বল রঙের’ ‘যোগ্যতা’ অর্জন করে নিতে হবে।

তার মানে কী দাঁড়ালো? আমি গাঢ় বাদামী বলে আমাকে ঘষে মেজে যখন উজ্জ্বল করা হবে, সে তো আমার বর্ণকে অসম্মান করা! একইভাবে লম্বায় একটু খাটো নারী হলে আপনার যোগ্যতা অস্বীকৃত হয়ে যাবে? বাইরে বেরিয়ে দেখুন তো, সারাদিন ইট ভেঙ্গে উপার্জন করা একজন নারী কিংবা হোস্টেলে থেকে স্বাবলম্বী হবার চেষ্টারত যে ছাত্রীটি, তার বর্ণটি কতোটা উজ্জ্বল? হাড়ভাঙা পরিশ্রম করা নারীদের নিয়ে গণমাধ্যম বিজ্ঞাপন তৈরি করে না। এবং ‘সুন্দরী’ উপাধি অর্জন করার জন্যে আমাদের সেই ট্যাগলাইনগুলোই গ্রহণ করতে হয়।

 অর্থাৎ, পণ্যের বাণিজ্য নামক জড় বস্তুটি ঠিক করে দিবে একজন নারীর তথাকথিত ক্ষমতায়ন! এজন্যেই হয়তো ভাষায় ‘সুন্দর’ শব্দটির সঙ্গে ই-প্রত্যয় যুক্ত করে আমরা এখনও বলি ‘এই সুন্দরী’!         

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 233
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    233
    Shares

লেখাটি ৪৭৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.