চুমু হোক সংস্কৃতি, চুমু হোক প্রতিবাদ

0

মুফতি আবদুল্লাহ আল মাসুদ:

“ঐ যে পেছন ঐ যে পরম জরা,

চক্ষুকর্ণ ময়লা দিয়ে ভরা,

চেঁচায় যেন ষাঁড় দিয়েছে গুঁতো,

চুমুই নাকি সব নষ্টের ছুতো।”

সামান্য একটা চুমু, সেটা নিয়ে কত তোলপাড়ই না করে ফেললাম অামরা! যে সাংবাদিক চুমুর ছবি তোলার মতো মানবতা-বিরোধী (?) অপরাধ করেছে, তাকে পিটিয়েছে তার সুভদ্র সতীর্থরা। এই ভয়ানক অপরাধের শাস্তি স্বরূপ চাকরিচ্যুতির ঘটনাও ঘটেছে তার ক্ষেত্রে।

একটা চুমু, একটা ছবি, কতই না নাড়িয়ে দিল অামাদেরকে। একটা চুমুর এতো পাওয়ার? অাগে তো জানতাম না!

একটা বন্দুকের গুলির কি এতো পাওয়ার অাছে? অসহায় মানুষের হাহাকারের কি এতো পাওয়ার অাছে? নির্যাতিত শিশু গৃহকর্মীর অার্তনাদের এতো পাওয়ার অাছে? সৌদি ফেরত নারীদের করুণ উপাখ্যানের কি এতো পাওয়ার অাছে?

যে পুলিশ ঘুষ না দেয়ার কারণে জনগণের টাকায় কেনা অাগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি করে মানুষ মেরেছে তার কিছু হয়নি কেন?

যে র‌্যাব সদস্যরা রুইকাতলার নাম ফাঁস হওয়ার অাশংকায় গুলি করে চুনোপুঁটিকে খুন করেছে তার কিছু হয়নি কেন?

যারা তনুকে ধর্ষণ করে হত্যা করেছে তারা তো দিব্যি অাছে। যে হাজী সাহেবরা সারাদেশকে ইয়াবা দিয়ে ডুবিয়েছে তাদেরও তো কিছু হয়নি। যারা কয়লা চুরি করেছে তাদেরও তো কিছু হয়নি।

লোক দেখানো দায়সারা গোছের কিছু মাঝেমধ্যে হলেও তার স্থায়িত্ব ধার্মিক পুরুষের শীঘ্রপতনের মতোই ক্ষণকালের।

ধর্ষণের জন্য পোশাক দায়ী নয় বলাটাও যে দেশে অপরাধ সে দেশে এরচে ভালো কি-ইবা অাশা করা যায়? প্রকাশ্যে খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ঘুষগ্রহণ ও টেন্ডারবাজি ধর্মপ্রবণ বাংলাদেশে এখন সমস্যা নয়, সমস্যা শুধুমাত্র চুমুতে। বাংলাদেশিদের সব অনুভূতি এখন চুমুতে গিয়ে ঠেকেছে।

চুমুর ছবি তোলাও যে একটা অপরাধ তা সম্ভবত বাঙ্গালিরাই অাধুনিক বিশ্বকে দেখাতে পেরেছে।

চুমু হচ্ছে ভালোবাসার অন্যতম নিরপেক্ষ মাধ্যম৷ নিরপেক্ষ বললাম এজন্য যে, চুমু সবাই সবাইকে দিতে পারে। সন্তান মা-বাবাকে, মা-বাবা সন্তানকে, ভাইবোনেরা পরস্পরকে, প্রেমিকা-প্রেমিক একে অপরকে, বন্ধু তার বন্ধুকে চুমু খেতে পারে।

প্রতিটি সন্তানই শিশুকালে সহস্রাধিক চুমু উপহার পায় মা-বাবা ও স্বজনদের কাছ থেকে। যতই বড় হতে থাকে ততই সে চুমুহীন হতে থাকে। কেন, একজন বড়মানুষও কি চুমু পেতে পারে না?

ধর্মীয় মূল্যবোধের নামে জরাজীর্ণ মূল্যহীন বোধ যখন অামাদেরকে জেঁকে ধরে তখন অামরা বোধের স্বাভাবিকতা হারিয়ে হয়ে যাই রুগ্ন-বোধী মানুষ। একটি শিশু যখনই বড় হতে থাকে তখনই সে বড়দের বুলি থেকে শিখতে থাকে সভ্যতার নামে বিভেদ। ঈশ্বরীয় কালচারের নামে বর্বরতা।

পরিবারে একটি ছেলে বড় হতে থাকে অার অনুভব করতে থাকে – তার মা ভিন্ন লিঙ্গের মানুষ, তার মা একজন নারী। এজন্যই ধর্মে যখন নারীপুরুষের সমতা নিয়ে অালোচনা হয় তখনই দেখি ধর্মগুরুরা নারীপুরুষের সমতা বলতে মা-ছেলের সমতা বুঝিয়ে পর্বত-মুষিক একাকার করার কসরত করে।

একটি মেয়ে বড় হতে থাকে অার যোজন যোজন দূরত্ব বাড়তে থাকে বাবার সাথে তার। মেয়েটি বুঝতে থাকে – তার বাবা ভিন্ন লিঙ্গের মানুষ, তার বাবা একজন পুরুষ। বড় হয়ে যাওয়া মেয়েটিকে বাবা অার অাদর করে চুমু খায় না, কারণ সে মেয়েমানুষ! সমাজও এসব অনাচার (?) মেনে নেয় না। বাবা তার মেয়েকে নারী হিসেবে ভাবতে নিতান্ত বাধ্য, কারণ এটাই ধর্মীয় শিক্ষা।

এজন্যই উচ্ছন্নে যাওয়া পশ্চিমারা নিজ মেয়েকে ধর্ষণ না করলেও ধোয়া তুলসীপাতা বাঙালি ঠিকই নিজ কন্যাকে নারী গণ্য করে ধর্ষণ করছে!

লেখক: মুফতি আবদুল্লাহ আল মাসুদ

বড় হয়ে যাওয়া ছেলেটিকে মা চুমু খায় না, কারণ সে পুরুষমানুষ! ভাই বোনকে চুমু খায় না, কারণ তাদের রয়েছে লৈঙ্গিক ভিন্নতা। অামরা ক্রমশ: বড় হতে থাকি, অার হারাতে থাকি চুমু, হারাতে থাকি প্রেম, হারাতে থাকি নির্মলতা। বড় হওয়ার পরের চুমু কেবলই যেন মাংস খাওয়ার এবং পাদুকা লেহনের নির্দিষ্ট কিছু প্রক্রিয়া। একজন নারী সেখানে খাদ্য, অার পুরুষ হচ্ছে মাংসখাদক। নির্দিষ্ট তন্ত্রমন্ত্র জপ করলেই সিদ্ধ হয় মাংসাহারের এ প্রক্রিয়া। ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক পীরেরাও চুম্বিত হয় মুরিদ কর্তৃক। লেহনকারীরা পীরের পদচুম্বন করে দুনিয়া কিংবা অাখেরাতের কামিয়াবি বাগিয়ে নেয়।

এই নষ্ট সমাজে কোরবানির গরুর মতোই বিয়ের বাজারে একটি মেয়েকে তোলা হয়। গরুটাকে মেকাপ মাখিয়ে, চুলে শ্যাম্পু দিয়ে, দাঁত ঝকঝকে বানিয়ে, হাইহিল জুতা পরিয়ে, অাদব-লেহাজ, লাজলজ্জা শিখিয়ে দরাদরি করে ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করার নামই হচ্ছে প্রচলিত বিয়ে। অাবার যারা নারীকে অতীব সম্মানের চোখে দেখে দাবি করে অাত্মতৃপ্তিতে ভোগে, তারা অাবার কোরবানির গরুর সাথে তুলনা না করে বরং কৃষিজমির সাথে নারীকে তুলনা করে! পুরুষ এখানে ক্রেতা, অার নারী এখানে বিক্রিত কৃষিজমি।

এই বিক্রিত পণ্যকে শেখানো হয় – “চাহিবামাত্র দেহের মালিককে দেহদান করিতে বাধ্য থাকিবে, নইলে সাত অাসমানের উপর হইতে নপুংসক ফেরেশতারা তোমাকে লা’নত করিবে!”

বৈবাহিক প্রক্রিয়ায় এককেন্দ্রিক ভোগতন্ত্রের রমরমা চর্চা হলেও সেখানে চুমু থাকে। তবে সে চুমু প্রেমের চুমু নয়, সে চুমু সহবাস নামক একধরনের নিয়মিত অস্ত্রচালনার চুমু। এই সহবাস হচ্ছে  কোরবানির মাংস খাওয়ার মতোই গোগ্রাসে মাংস গেলার রাত্রিকালীন অভ্যাস। কিছু মাংসপিণ্ড নিয়ে খাটের উপর শুয়ে থাকবে বিক্রিত গরু বা জমি, অার তার গায়ের উপর চড়ে হালচাষ করবে কৃষক।

নিস্তরঙ্গ, নিরুত্তাপ, নির্ঝঞ্ঝাট এক সঙ্গমের মাধ্যমে হয়ে গেল মাংসাহার।

এই মাংসাহার প্রক্রিয়ায় কিছু  চুমোচুমি থাকলেও সে চুমোর উত্তাপ নেই, সে চুমোয় তরঙ্গ নেই। নেতিয়ে পড়া ধানের মতই নিরুত্তাপ সে চুমু। মাঘমাসের নদীর মতই নিস্তরঙ্গ সে চুমু।

অামরা এই নেতিয়ে পড়া চুমুতেই অভ্যস্ত। অামরা এই নিস্তরঙ্গ চুমুতেই অভ্যস্ত। তাইতো প্রেমের চুমু দেখলে অামরা ভাদ্রের ‘ভদ্রের’ মত উত্তেজিত হই। শ্রাবণের ধারার মত অবিরাম চুমু দেখলে অামরা গোখড়াসাপে কামড়ানো লোকের মত ছটফট করি।

অামাদের ধর্মজীবী, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিজীবী, ব্যবসাজীবী, সংবাদজীবী সহ অধিকাংশ জীবেদেরই নাকি প্রেমের চুমু দেখলে হৃদয়ের যোনিপথে রক্তক্ষরণ হয়। হৃদয়ের যোনিপথে অনুভূতির প্যাড পরিয়ে রক্তপাত ঠেকিয়ে রাখা নাকি বড্ড কষ্টকর। এজন্যেই তাদের এত হাম্বা এবং হ্রেষাধ্বনি।

চার দেয়ালের ভেতরে, খাটের ওপর ওয়াই শেপে শুয়ে, অন্ধকার ঘরে, বাচ্চাকাচ্চারা যাতে টের না পায়, পাশের ঘরে ঘুমন্ত পিতামাতাও যেন ঠাহর না করে সেজন্য অতীব সাবধানতা অবলম্বন করে যে চুমোচুমি হয় তাতেই পরিতুষ্ট এ জাতি।

এখানে নদীর পাড়ে বসে চুমু দেয়া মানা। এখানে হিজল তল বা কৃষ্ণচূড়ার তলে বসে চুমু দেয়া মানা। এখানে বৃষ্টিতে ভিজে চুমু দেয়া মানা। এখানে কোকিলের কুহুতানের সাথে চুমু দেয়া মানা।

এসব মানায় কান দিয়ে অার কি হবে? এতদিন তো মানলাম, এবার না হয় শৃঙ্খলটা ভেঙেই ফেলি?

অাসুন না প্রিয় মানুষকে চুমু খাই প্রকাশ্যে।

ওদের হৃদয়ে রক্তপাত হবে? -হোক না।

ওদের হৃদে স্যানিটারী ন্যাপকিন পরিয়ে রাখলেই তো হয়।

চুমুই হোক সংস্কৃতি, চুমুই হোক প্রতিবাদ। চুমু দেয়া মানুষের সুস্থ সংস্কৃতি। চুমুহীন মানুষ হিংস্র হয়ে উঠতে পারে যেকোনো সময়ে। অামাদের ধর্মজীবী ও রাজনীতিজীবীরা চায় মানুষ অস্থিরতায় থাকুক, হিংস্র হোক।

অস্থির, চুমুহীন, স্নেহহীন  মানুষকে খুব সহজেই অান্দোলিত করা যায়, উস্কে দেয়া যায়। উস্কানি দিয়ে হিংস্র বানিয়ে ফেলা যায়। এরপর এই হিংস্রতাকে ব্যবহার করা হয় প্রতিপক্ষ দমনে এবং ক্ষমতার লালনে।

মানুষ চুমুহীন হলেই রাজনীতিক ও ধর্মজীবীর লাভের গুড় জমে ওঠে। অার তাই ধর্মজীবী ও রাজনীতিজীবীর যত অাক্রোশ চুমুর ওপরেই।

চুমু চলুক অারো। বন্ধু, প্রিয়জন, স্বজন সবাই সবাইকে চুমু খেয়ে ঐ জরা, ময়লা ভরা লোকেদেরকে দেখিয়ে দিতে হবে – চুমু চলবেই। চুমু অামাদের কালচার, চুমু অামাদের মুক্তির হাতিয়ার।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 541
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    541
    Shares

লেখাটি ১,৪৬৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.