সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান

0

মুসকান ইউহানা:

সাল ২০০৬।
কাল রাত থেকেই হঠাৎ করে জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেলো।
একদমই হঠাৎ করে।
শাহীন সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো,বলে গেলো রাতে ফিরে এসেই মেয়েটাকে নিয়ে মার্কেটে যাবে; ঈদ চলে এসেছে।
শাহীন ফিরে এলো না। পরদিন লাশবাহী গাড়িতে করে ফিরে এলো ওর লাশ।
আমাদের একমাত্র মেয়ে মুমু ওর বাবার লাশ দেখেনি। আমি ওকে দেখতে যেতে দিইনি। আমি নিজেও প্রিয়তম স্বামীর লাশ দেখিনি।
চেয়েছি আমার স্মৃতিতে ও জীবন্ত হয়ে থাকুক।
ওর লাশের ছবি আজীবন স্মৃতি করে বয়ে বেড়ানো আমার জন্য কঠিন হবে।

মেয়েটাকেও দেখতে দিইনি। কারণ লাশের চেহারা নাকি বোঝা যাচ্ছিল না, আর আমার মেয়েটা আজীবন এই বীভৎস চেহারার সাথে তার বাবার চলমান স্মৃতিগুলো অবচেতন মনেই মিলাতে চেষ্টা করবে।
সেদিনই আমার স্বামীর লাশের খাটিয়া বাড়িতে থাকতে থাকতে প্রায় অচেতন আমাকে সাবান ছাড়া গোসল করানো হলো।
প্রায় একটা কাঠের পুতুলের মতো আমি সব নিয়ম মানলাম।
শাহীনের লাশ নিয়ে যাওয়ার সময় হয়েছে। আমার শ্বশুর সবার কাছে শাহীনের হয়ে মাফ চাইছেন। অবশেষে আমার কাছেও এলেন।

বিয়ের রাতে স্বামী দেনমোহরের দাবি মাফ করার আবদার করেছিলেন। আজ আবারও মৃত স্বামীর পক্ষ থেকে আমার শ্বশুর দেনমোহরের দাবি মাফ করার ‘আদেশ’ নিয়ে এসেছেন।
আমি প্রায় অচেতন অবস্থায় বিড়বিড় করছিলাম।
হঠাৎ একটা ঝাঁকি খেলাম।
কেউ আমাকে তুলে মুখে পানি ছিটিয়ে দিল।
বিয়ের কবুলের মতো জোরে স্পষ্ট করে সবাইকে শুনিয়ে মৃত স্বামীর দেনমোহর মাফ করতে হবে, বিয়ের মতো এখানেও সাক্ষী থাকবে সবাই।

আমি কিছু একটা বলছিলাম। আর কিছু মনে নেই।

পরদিন সকালটা শুরু হলো অন্ধকার নিয়ে। ভোরবেলা বাড়ির পুরুষরা জেগে উঠার আগে আমার শাশুড়ি আমাকে গোসল করতে বললেন। বললেন, আমার বাসি ছায়া কারও গায়ে পড়লে অমঙ্গল হবে।
আমি এক রাতে কী করে এতো অশুচি হয়ে গেলাম যে আমার ছায়াটা পড়লে অমঙ্গল হবে, আমি বুঝে পেলাম না।
সবসময়ের অভ্যাস মতো ঘুম থেকে উঠে আয়নার সামনে এলাম।

ভূত দেখার মতো চমকে উঠলাম আমি—-
আমার সব রং কোথায় গেলো?
ওর কাফনের সবটুকু শুভ্রতা আমি জড়িয়ে কেন!
অথচ সাদাতে আমার ভীষণ ভয় ছিল। আমি সাদা কোলবালিশের কভার পর্যন্ত ব্যবহার করতাম না। শাহীনকে কখনও সম্পূর্ণ সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরতে দিতাম না।
আজ জোর করেই সাদা আমার আপাদমস্তক গ্রাস করে নিলো।
গোসল শেষ করে এলাম।

আয়নাতে দাঁড়িয়ে আবারও হোঁচট খেলাম। আমার নাকফুল কই!
এতো সাধ করে পয়সা জমিয়ে শাহীন গেলো বছর আমাকে একটা ডায়মণ্ডের নাকফুল দিয়েছিল। আজ আমার স্বামীর ভালোবাসার স্মৃতি ব্যবহার করার অধিকারটাও আমি হারিয়েছি।

চারপাশ অচেনা লাগছে। নাস্তার টেবিলটা আমি গুছিয়ে দিতাম। এখন আমাকে সেখানে কেউ ডাকে না। প্রতি মুহুর্তে পরিবেশ আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে “আমার স্বামী মৃত”।

আমি এখন আমার বাবার অভাব অনুভব করছি। বিয়ের দু মাস পর হঠাৎ করে আব্বা মারা যান।
আমি যতবারই অজ্ঞান হয়েছি, জ্ঞান ফেরার পর দেখেছি শাহীনের কোলে আমার মাথা। আমি কেঁদেছি, কিন্তু ভয় পাইনি। আব্বার জন্য শোক ছিল, কিন্তু অসহায় বোধ করিনি। আমার স্বামী আমার ঢাল ছিল।

ইন্টারমিডিয়েটের পর আমার বিয়ে হয়ে গেছে। আব্বা পড়ালেন না। বললেন, সুপাত্র সবসময় পাওয়া যায় না।
আম্মা বললেন, সংসার করে চাকরি করবি? এতো কষ্টের কী দরকার?
ভাইয়া বললেন, তোর ভাবী তো মাস্টার্স পাশ। আমি তাকে চাকরি করতে দিই?
আমি সব শুনলাম, তাদের কোন যুক্তিই তখন খারাপ লাগেনি।
শাহীনও দেখতে সুদর্শন ছিল। হাসিমুখে বিয়ে করে নিলাম।

আমার ননদ ও আমি একই ইয়ারে পড়তাম। ও পাশ করে ভর্তি হলো, আমি পাশ করলাম, কিন্তু ভর্তি হতে পারলাম না।
শাহীন আমতা আমতা করছিল, শ্বশুর কড়া গলায় হুকুম জারি করলেন,”বাড়ির বৌ ভর্তি হতে পারবে না”।
আমার পড়াশোনা চিরতরে শেষ হলো।
আমি সোহাগী বৌ, আদরের পুত্রবধু এবং
মুমুর মা হয়ে গেলাম।
আট বছরের বিবাহিত জীবনের ঝুলি প্রেম, আবেগে পূর্ণ হয়ে রইলো।

আমার কোনো উপার্জন নেই, আবার অভাবও নেই।
যা চাই দুদিন আগে পরে পেয়ে যাই। শাহীন মানুষটাই এমন ছিল ওর ব্যাপারে কোন অভিযোগের সুযোগই সে রাখেনি।
আমার পড়াশোনা, চাকরি, টাকা, ক্যারিয়ার কোনটারই দরকার হয়নি।

এখন আমি বিধবা।
আমার স্বামী নেই, বাবা নেই, উপার্জন নেই, শিক্ষা নেই, প্রশিক্ষণ নেই….
আমার কোন ঢাল নেই, আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচার কোন পথও খোলা নেই।

মেয়েটার দুধ, ডিম,হরলিকস, দামী চকলেট, আইসক্রিমসহ অনেক কিছু খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে শাহীনের মৃত্যুর পরপরই।
কারণ ওর বাবা নেই, মা’ও অক্ষম।

শুধু দুবেলা ভাতে পেট ভরলেও মন ভরে না। এই সত্যটা মা-মেয়ে দুজনই অনুভব করছি।

দুদিন আগে মামা আমার জন্যে একটা বিয়ের সম্বন্ধ এনেছেন।
ছেলের দ্বিতীয় বিয়ে, আগের ঘরের দুই ছেলে আছে। বৌ নাকি মারা গেছে।
ছেলের বাড়ির লোক একটা শর্ত দিয়েছে। আমার মেয়ে আমার সাথে থাকতে পারবে না, অন্য কোথাও থাকতে হবে। কিন্তু তার আগের সংসারের ছেলেরা তার সাথেই থাকবে। এটি আমি প্রশ্ন না করেই বুঝেছি।

আমি আমার শ্বশুর আব্বার কাছে গেলাম। বললাম, বৌকে চাকরি করতে দিবেন না বলে পড়াটা শেষ করতেও দিলেন না।আপনার ছেলে তো মরে গেলো, এখন তার বাচ্চার দায়িত্ব কে নিবে?
মা হিসেবে তো আমি অক্ষম।

আমার শ্বশুর অনেকক্ষণ কাঁদলেন। তারপর বেরিয়ে গেলেন। সাথে একটা সেলাই মেশিন নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। আামার হাতে দিয়ে বললেন,

“বাঁচো, নিজের মতো করে”
আমি নিঃশব্দে হাসলাম।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 355
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    355
    Shares

লেখাটি ২,১১৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.