মা তোমাকে স্যালুট

0

তামান্না ইসলাম:

আমি একজন মা হিসাবে খুব ভালো করে জানি যে সন্তানের জন্য প্রতিটা মায়ের কী পরিমাণ উৎকণ্ঠা থাকে। কী গভীর ভালোবাসা দিয়ে নিজের জীবনের সুখ শান্তি বিসর্জন দিয়ে, অপরিসীম কষ্ট করে প্রতিটা মা তার সন্তানকে বড় করে। বাবারাও করে, তবে মা হিসাবে মায়ের অনুভূতির কথাটাই আমি বললাম।
মা, বাবা সন্তানের মঙ্গল চান। জীবনে শিক্ষা, উন্নতি, প্রতিষ্ঠা, সুখ চান একথা ঠিক। কিন্তু সবার আগে চান সুস্থতা আর নিরাপত্তা। রাষ্ট্র যখন সেই নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেই রাষ্ট্রের কাছে আর কী চাওয়ার থাকতে পারে? আর কী বা আশা করা যায়? দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া বলে একটা ব্যাপার আছে, আমাদের দেশের বাবা মায়েদের, ছাত্র-ছাত্রীদের এখন সেই অবস্থা হয়েছে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। নিরুপায় না হলে, কোন বাবা, মা তাদের সন্তানদেরকে এতো অল্প বয়সে এবং এমনি আইন কানুনহীন দেশে, ভয়ঙ্কর অনিরাপদ পরিবেশে রাস্তায় নামতে দিতেন না।

লেখক: তামান্না ইসলাম

দেশে যে সড়ক ব্যবস্থা নিরাপদ নয়, অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত হচ্ছে এই ব্যাপারে কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না। এমন কোন পরিবার পাওয়া যাবে না যেখানে কেউ না কেউ এই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়ে, দেশে বেড়েছে যান বাহন। জনগণের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রাখতে হলে গণ পরিবহনের কোন বিকল্প নেই। মানুষ এগুলো ব্যবহার করতেও আগ্রহী। আর ট্রাফিক জ্যাম কমাতে হলে এগুলোর ব্যবহার বাড়াতে হবে। কিন্তু এই গণপরিবহনগুলো তথা বাস, ট্রাক, টেম্পু এরা যেভাবে রাস্তায় চলে, তাতে করে যাত্রী উঠা, নামা, চলার পথে যে কোনো সময় যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, এবং ঘটছেও।

শুধু যাত্রী নয়, এদের কারণে পথচারী বা ছোট যানবাহন যেমন সাইকেল, রিকশা ইত্যাদির আরোহীদের জীবন ও হুমকির সম্মুখীন। বাড়ির পাশের রাস্তায় দোকান থেকে জিনিস কিনতে গিয়ে বাস চাপা পড়ে মারা গেছে পথচারী, এটা শোনা কথা নয়, আমার পরিচিত একজন। রাস্তা পার হতে গিয়ে পায়ের পাতার উপর দিয়ে গাড়ি চলে গিয়েছে এটাও খুব সাধারণ ঘটনা। স্কুল, কলেজগুলো যখন ছুটি হয় তখন যে পরিমাণ ভিড় এবং অনিয়ম হয়, সেখানে ছোট শিশুগুলো সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে যে কোনো সময়। এই সব কিছুর পেছনেই কিন্তু আছে এদেশের আইন শৃঙ্খলার চরম অবনতি, অনিয়ম আর দুর্নীতি।

লাইসেন্স ছাড়া বাস, ট্রাক চালানো, ঘুষ দিয়ে লাইসেন্স পাওয়া, অল্প বয়স্কদের দিয়ে গাড়ি চালানো বা হেল্পারের কাজ করানো, কোন ট্রাফিক আইন না মানা, মাদক দ্রব্য সেবন করে গাড়ি চালানো, যে কোন ধরনের দুর্ঘটনা ঘটিয়ে পার পেয়ে যাওয়া, এমনকি মানুষ মেরে ফেলেও উপর মহলের ছায়ায় থেকে কোন রকম শাস্তির হাত থেকে বেঁচে যাওয়া এগুলো সব কিছুর পেছনেই প্রধান কারণ সীমাহীন দুর্নীতি। দেশে যে কোন মানুষ ঘর থেকে বের হলে প্রাণটা হাতে নিয়ে বের হয়। এরকম পরিস্থিতিতে প্রতিদিন বাবা, মায়েরা ভয়ঙ্কর উৎকণ্ঠা নিয়ে কাটায় তাদের সন্তান ঠিক মত ঘরে ফিরে আসতে পারবে কিনা সেটা নিয়ে।

ছবিটা ফেসবুক থেকে সংগৃহীত, কার তোলা জানা হয়নি। যেই তুলে থাকুক, তার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা।

এর পরেও এদেশের মানুষ মুখ বুঁজে সহ্য করেছে। আজ যখন তাদের প্রাণপ্রিয় সন্তানেরা নিজেদের এই ন্যুনতম নিরাপত্তার দাবিতে পথে নেমেছে, তখন বাবা, মায়েরা তাদের কোন মুখে ঠেকাবে? সন্তানরা জেনে গেছে, বুঝে গেছে এতোদিনে যে তাদের বাবা, মা তাদেরকে এমন দেশ দিতে পারে নাই, যেখানে তাদের জীবনের নিরাপত্তা আছে। তাই নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই দেশের দায়িত্ব নিজেদের ছোট্ট কাঁধেই তুলে নিয়েছে। তবে সেই ব্যর্থ মায়ের মনের কথা আমি জানি। ওই আগুন জ্বালা রাজপথ, দুর্নীতিবাজ পুলিশ বাহিনীর কাঁদুনে গ্যাস, লাঠির আঘাত বা ভয়াল ভ্যান, ছাত্র নামধারী পোষা গুণ্ডাদের অমানুষিক অত্যাচার, এই সবকিছুর মাঝে নিজের অতি আদরের সযত্নে লালিত সন্তানটিকে ছেড়ে দিতে যে কোনো মায়েরই বুক কাঁপে, হাত পা অবশ হয়ে আসে। আমি নিজেই জানি না মা হয়ে আমি কী পারতাম এই মহত্ত্ব দেখাতে? যে সব মায়েরা পেরেছে তাদেরকে স্যালুট।

আপনারা বার বার আমাদেরকে একাত্তরের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। আপনারা সবাই একেক জন জাহানারা ইমাম। দাবি আদায়ের আন্দোলনকে সঠিক পথে নিয়ে যান। আমি, আপনি যা পারিনি, আপনাদের সন্তানরা তা পেরেছে। এই সংগ্রাম কোন রাজনৈতিক সংগ্রাম নয়। এই দাবি কোন ক্ষমতার দাবি নয়। এই দাবি শুধুই জীবনের নিরাপত্তার দাবী। পৃথিবীর যে কোন সভ্য দেশের মানুষের যে অধিকার আছে।

এ আমাদের লজ্জা যে আমাদের সন্তানদেরকে আমরা সেই নিশ্চয়তাটুকু দিতে পারি নাই। এটা জানা কথা যে এই দুর্নীতির শেকড়ে টান পড়লে, পাল্টা আঘাত আসবেই এই শক্তিকে রুখে দাঁড়াতে। তাই মা আজ আপনাকে বড় প্রয়োজন আপনার সন্তানের, আর কিছু না শুধুমাত্র তার জীবনের নিরাপত্তার জন্য, যে জীবনকে জন্ম দিয়েছেন আপনি, যে জীবনের কাছে আপনি অঙ্গিকার করেছিলেন নিরাপত্তার। স্যালুট মা, বাংলাদেশের সব মানুষের কাছ থেকে স্যালুট।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 75
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    75
    Shares

লেখাটি ৩৮১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.