মাদার অফ হিউম্যানিটির মান রাখুন

0

তাহমিনা আমীর:

আমরা যারা সাধারণ প্রবাসী, অর্থাৎ বাংলাদেশের সম্পদ, ব্যাংকের টাকা লুট না করা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, নিজেদের সুদীর্ঘ পরিশ্রমের কারণে বিদেশে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছি, আমাদের মন, চিন্তা, চেতনা কিন্তু বাংলাদেশকে ঘিরেই আছে। অনেক তো লেখা হলো ইলিশ মাছ, বাংলা বর্ষবরণ, বিভিন্ন বাঙ্গালি ইভেন্ট, প্রবাস জীবনের আনন্দ, দুঃখ নিয়ে লেখা। এবার সাম্প্রতিক দেশ নিয়ে যা ভাবছি তা সহজ করে লিখতে চাই।

একজন সাধারণ বাংলাদেশি প্রবাসী হিসাবে কী ভাবছি এই মতামতের জন্য আমিই দায়ী। অনুভূতি তো অতিথির মতোন, আসবে, যাবে। তা প্রকাশে বাধা থাকা উচিত নয়। সম্প্রতি নিরাপদ সড়কের দাবিতে সমগ্র বাংলাদেশের স্কুল ছাত্ররা যে নিরীহ প্রতিবাদ করেছিলো তা সরকারি পুলিশ, র‌্যাব, ছাত্রলীগের তাণ্ডবে এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পরিণত হয় শেষপর্যন্ত। শাসকগোষ্ঠী তা গুজব, বিএনপি, জামাতের ষড়যন্ত্র বলে শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চাইলেও পারেননি। ছাত্রলীগের তাণ্ডব পুরো বিশ্ববাসী দেখেছে। ইন্টারনেট বন্ধ করে, ফেইসবুক এর সরকার বিরোধী স্ট্যাটাসগুলো টার্গেট করে তরুণদের গ্রেফতার করেও লুকাতে পারছে না।

কতজনকে গ্রেফতার করবে? কয়দিন আগে আল জাজিরাতে ইন্টারভিউতে সত্যি কথা বলায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোক চিত্রশিল্পী শহীদুল আলমকে ডিবি গ্রেফতার করে, তার ওপর নির্যাতন চালায়। কেন? সত্যি কথাকে এতো ভয় সরকারের? গ্রেফতার আর দমন নীতি কেন হাসিনা সরকারের এতো প্রিয়? তিনি কেন পরিবহন মন্ত্রীকে অপসারণ করেননি, তার বদলে রক্তপাতকে কেন বেছে নিলেন? ছাত্রলীগকে কেন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে রাস্তায় নামানো হয়েছে? এর উত্তর প্রধানমন্ত্রী দিবেন না। ছল চাতুরী করবেন, যেমন অতীতে করেছেন কোটা সংক্রান্ত বিষয়ে।

আমি আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত বুঝি না। বুঝি আমার দেশের প্রধানমন্ত্রী তিনি। তিনি আমাদের নেত্রী, কিন্তু তার উপর আস্থা হারানোর কষ্ট, বেদনা আমাকে, আমাদের বহন করতে হয়। মনে হয় চিৎকার করে বলি, প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে বিশ্বাস করতে চাই। কিন্তু পারছি না। আপনি দেশবাসীর বিশ্বাস অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন। গত বছর দেশে গিয়ে ঢাকা শহর দেখে মুগ্ধ হয়েছি। যখন তখন বিদ্যুৎ যায় না, রাস্তাঘাট পরিষ্কার, ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা দেখে ভেবেছি, বাহ এই সরকার তো সত্যি দেশের জন্য কাজ করছে!

কিন্তু প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতোন আপনার সরকার দুর্নীতিগ্রস্থ, প্রশাসন এর স্থবিরতা, হুকুম না মানা, দেশের মানুষকে দুই ভাগে ভাগ করা, রাজাকার আর চেতনাবাজ। যে দেশের ভালো চায়, ন্যায্য সত্যি কথা বলবে, তাকে রাজাকারের ট্যাগ দিয়ে দেয়া হয়। গুম, খুন তো চলছেই। বিরোধী দলকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা, পরিশ্রম দেখে হতাশ। বাঁকা পথে না গিয়ে সরকার যদি আন্তরিকভাবে, সৎ হয়ে তাদের দায়িত্বটুকু পালন করতো, হাসিনা সরকারকে দেশের জনগণ বুক পেতে দিত। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অবধারিত ছিল।

সরকারের ভূমিকা এখন ঘষেটি বেগমের। জনগণ, বিরোধী দল নিয়ে ষড়যন্ত্র। দেশটাকে লুটপাটের বেহেশত বানিয়ে দিয়েছেন। ব্যাংকের অর্থ, স্বর্ণ, কয়লা, পাথর, কী নাই যা চুরি হচ্ছে না! রাষ্ট্র পরিচালনা কঠিন কাজ, বিশেষ করে বাংলাদেশে। একদিনে ঠিক হবে না, আশা করাও বাতুলতা। রাষ্ট্র পরিচালনায় ভুল হতেও পারে। পূর্বের সরকারগুলো ধোয়া তুলসী পাতা ছিল না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী কেন গুণ্ডা দল পালবেন? দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীর পাশে দাঁড়াবেন? প্রধানমন্ত্রীর কী স্বার্থ? রাজনীতি কি ব্যবসা? কে কতো ফান্ড দিচ্ছে তার হিসাব সবার আগে? শাহজাহানকে বরখাস্ত করলে পরিবহন ব্যবস্থা কিছুদিন অচল থাকতো! দেশের জনগণ বুঝতো, পরিবহন শ্রমিকদের গুণ্ডাগিরি আইন শৃঙ্খলার লোক দিয়ে কি দমন করা যেত না? তা না করে উল্টা নিরীহ জনগণ, কিশোর ছাত্রদের ধরপাকড়!

বিদেশের মতোন পরিবহন ব্যবস্থা সরকারের আওতায় আনা এবং তা সরকারি নীতিমালায় পরিচালিত হোক। চাঁদাবাজির টাকায় লোভ থাকলে তা কোনদিনই সম্ভব না। হায় বাংলাদেশ! কোটি কোটি জনপদের দেশে একজন সৎ প্রধানমন্ত্রী আশা করা কি অন্যায়? শুধু বক্তৃতায় দেশপ্রেমী হলে চলবে না। মন্ত্রী, এমপি তাদের ছেলেমেয়ে, বাড়িঘর সব ইউরোপ, আমেরিকা, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়ায়। তারা কী করে বুঝবে একজন মধ্যবিত্তের প্রতিদিনের বাসে চলার সংগ্রাম, স্কুলে বাচ্চাদের প্রেশার, শিক্ষার মানের অবনতি!

এই জনবিচ্ছিন্ন জনপ্রতিনিধি সাধারণ মানুষের দুঃখ গোছাবে কী, বরং বাড়াবে! বাংলাদেশ তাদের লুটের অভয়ারণ্য। সাধারণ প্রবাসী শ্রমিকদের কোনো সম্মান অর্থাৎ তাদের সাধারণ অধিকার দেশের এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে, বিদেশের- দেশের দুতাবাস, কোনো খানেই দেয়া হয় না। এগুলো নিজের অভিজ্ঞতায় দেখা। আমরা আরব বসন্ত চাই না। একজন স্বৈরাচারী সরকার যদি দেশকে আমেরিকা ইনভেইড করার পূর্বের ইরাক, লিবিয়া বানাতো, আফসোস ছিল না। কিন্তু উন্নয়নের নামে মানবিকতা বিসর্জন, সাধারণের দুর্ভোগ বাড়ানো, লুট, দেশের বাইরের নেগেটিভ লবিকে আশ্রয়, মিথ্যাচার দেশকে মহাশূন্যের দিকে নিয়ে গেছে।

স্যাটেলাইটের আগে আমাদের নিরাপদ সড়কের কথা, বেসিক নিয়ে ভাবার দরকার ছিল, আমাদের গিমিকের দরকার নাই। সেনাবাহিনী, পুলিশ, আমলা, শিল্পী সব ক্ষেত্রে দলীয়করণ করা হয়েছে। লাভ কী? সরকারের অন্যায়ে তারা সামিল হবে। একটা জাতিকে নষ্ট করার অপচেষ্টা! ছাত্রদের প্ল্যাকার্ডের অনেক কথাই তুলে ধরতে ইচ্ছা করতেছে। একজন লিখেছিল , “ডিজিটাল বাংলাদেশ নয়, নিরাপদ বাংলাদেশ চাই”। দুইটার দ্বন্দ্ব হবার তো কথা নয়। আমাদের স্বাধীন দেশ, আমাদের তো দরকার নাই চেতনা বিক্রি করার। সত্যি তো সূর্যের আলোর মতন তীব্র, প্রখর। এই সূর্যকে কে লুকিয়ে রাখবে? দলীয়করণের মেঘ এই সূর্যকে কতদিন ঢেকে রাখবে? একজন প্রধানমন্ত্রী দলের ঊর্ধ্বে গিয়ে জনগণের কথা শুনবেন, দেশকে জোর করে দলীয়করণ নয়, বরং জাতিকে ধর্ম, বর্ণ, দল নির্বিশেষে শক্তিশালী করার কথা ভাববেন।

ফেসবুকে সরকারকে সমালোচনা করলে ৫৭ ধারা মামলায় ১৪ বছরের জেল, আর সড়কে গাড়ি চাপা দিয়ে মানুষ খুন করলে মাত্র ৫ বছরের জেল! এটা কী ধরনের আইন? এই ধরনের গদি বাঁচাও আইন কোন বিবেকবান মানুষ প্রশংসা করবে আমার জানা নেই। প্রধানমন্ত্রী আপনি ছাত্রলীগের আহত গুণ্ডাদের দেখতে গেলেন হাসপাতালে, নিরপরাধ স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের পুলিশের রিমান্ডে দিলেন। এদের ছেড়ে দিন প্লিজ।

প্রতিহিংসার আগুনে পুড়ে আপনি অঙ্গার হয়েছেন, এবার দয়া, ক্ষমার বৃষ্টি জলে ভিজুন। ক্ষমতা কি চিরকাল থাকে? রক ব্যান্ড স্করপিয়নের ‘উইন্ড অব চেইঞ্জ’ গানটি শুনলে বুঝবেন অগাস্টের সামারে আগামী দিনের শিশুরা তাদের স্বপ্ন আমাদের সাথে শেয়ার করেছে। বাতাস বদলের সময় এসেছে। জিদ বাদ দিয়ে তাদের কথা অনুধাবন করুন। বিএনপি, জামাতের ক্ষমতাও হবে না এই ছাত্রদের কোন ভুলপথে পরিচালনা করার। গুড লাক বাংলাদেশ।

তাহমিনা আমীর
লন্ডন

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 2K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2K
    Shares

লেখাটি ৬,৩৭০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.