লাঠিপেটা করে কি আর গণতন্ত্র চর্চা হয়?

নাসরিন শাপলা:

হায়ার স্টাডিজের জন্য দেশের বাইরে যাবো, সেই স্বপ্ন ছোটবেলা থেকেই দেখতাম। তবে ভুলেও দেশ ছেড়ে পাকাপাকিভাবে বিদেশে বসবাস করার চিন্তার ঠাঁইও ছিলো না সেই স্বপ্নে। তবুও ১৫ বছর আগে দেশ ছাড়তে হয়েছিলো সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত কারণে।

বাংলাদেশটা তখনও এমন ছিলো না। দেশে তখনও পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া শুরু হয়নি, ঢাকার কিছু কিছু রুটে ‘প্রিমিয়াম’ এবং ‘নিরাপদ’ নামে নিটোল মোটর্সের তত্ত্বাবধানে বেশকিছু ভালো আরামদায়ক এবং রিলায়েবল পাবলিক বাস সময় ধরে, নিয়ম মেনে ঢাকার রাস্তায় চলাচল করতো। আমরা ব্যক্তিগত গাড়ি রেখে, লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটে সারিবদ্ধভাবে বাসে উঠতাম, অধিকাংশই চাকুরীজীবী। প্রতিদিন উত্তরা থেকে মতিঝিল অফিসে পৌছাতাম মাত্র ৪৫ মিনিট থেকে ১ ঘন্টায়। ঢাকার রাস্তায় জ্যাম থাকলেও সেটা সহ্যাতীত কিছু ছিলো না।

মানুষের আয়-ব্যায়ের হিসেবটা এতো উৎকটরকম চোখে লাগতো না তখনও। একজন ছাত্র বা ছাত্রী দিনে বিশ টাকা হাত খরচ পেলেই বর্তে যেতো। দু’টাকায় একটা সিঙারা আর ১০ টাকায় একটি বার্গার পাওয়া যেতো। উত্তরার সাত নম্বর সেক্টর থেকে রাজলক্ষী মার্কেটে যাওয়া যেতো ৫ টাকা রিক্সাভাড়ায়। বিদেশ থেকে আসা আত্মীয়স্বজনের ডলার আর পাউন্ডের ক্রয়শক্তির পাশে আমাদের সৎ উপার্জনের টাকাকে একটু অসহায়ই লাগতো। এগুলো বোধহয় এই প্রজন্মের কাছে আজ অবিশ্বাস্য লাগে, যেমন আমাদের লাগতো নানী-দাদীর মুখে শোনা শায়েস্তা খানের টাকায় আটমণ চালের গল্প।

জন্মভূমি ত্যাগের পিছনে অনেক ব্যক্তিগত কারণ থাকলেও দেশের সিস্টেমের কারণের সাথে কিছু অসহায়তাও জমা হয়েছিলো। যেদিন জানতে পেরেছিলাম আমার কয়েকমাস বয়সী মেয়েটাকে এক প্রখ্যাত শিশু বিষেশজ্ঞের প্রেসক্রাইব করা শক্তিশালী অ্যান্টবায়োটিক ইঞ্জেকশনগুলো ভুল চিকিৎসার অংশ ছিলো, তখন প্রচণ্ড অসহায় লেগেছিলো। যখন মেয়েকে একটু ফ্রেশ কমলার জুস খাওয়াবো বলে পরিচিত ফল বিক্রেতার কাছ থেকে কিনে আনা কমলাগুলো জুসারে দিতেই জুসারটা কৃত্রিম কমলা রঙে ভরে গেলো, তখনও বড্ড বিশ্বাস ভঙ্গের কষ্ট পেয়েছিলাম। পাসপোর্ট করবো বলে যখন লোকাল থানায় পুলিশ ক্লিয়ারেন্স করাতে গেলাম, তখন কপালে বিশাল নামাজের দাগ ফেলানো কর্মকর্তা ইনিয়ে বিনিয়ে ঘুষ চাইলেন। নিজ হাতে ঘুষের দাবি মিটিয়ে যখন নিজের জন্মগত অধিকার বাংলাদেশী পাসপোর্ট করাতে হয়েছে, তখন আয়নায় নিজের মুখটা ঝাপসা দেখেছি, জানিনা সেটা নিজের প্রতি ঘৃণায়, নাকি অসহায় চোখের পানির কারণে।

এদেশে এলাম। আরেক জীবন শুরু হলো। তবুও দেশের টানে বছর ঘুরতে না ঘুরতে পুরো পরিবার বারবার ছুটে গেছি ভালোবাসার মানুষগুলোর কাছে। প্রতিবার গেছি, আর অনুভব করেছি চেনা দেশটা একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে, চেনা সম্পর্কগুলো বদলে যাচ্ছে। সময়ে আমিও বদলেছি। ধীরে ধীরে অনেক সম্পর্কের সূতো আলগা হয়ে গেছে, কিছু সূতো কেটে গেছে, আর কিছু সূতো আমি নিজেই কেটে দিয়েছি। জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি আর ভ্যালুজ ভিন্ন বলেই এই দূরত্ব। আর কিছু ভালোবাসার মানুষকে চিরতরে হারিয়েছি। ইনাদের হারিয়ে আগের মতো করে বছর না ঘুরতেই দেশে যাবার তাড়াটা ভিতর থেকে যেন কমে এলো। নিজেই প্রবাসে নিজের সাধ্যমতো ছোট্ট বাংলাদেশ বানিয়ে ভালোয় মন্দয় জীবন কাটিয়ে দিচ্ছিলাম।

আমি কখনো ভাবিনি দেশের সাথে আটকে থাকা সেই অদৃশ্য সূতোগুলোয় আবার কখনো এভাবে টান পড়বে। বাংলাদেশে ছাত্রদের এই ‘নিরাপদ সড়ক চাই” আন্দোলনের শুরু হবার পর থেকেই হাজার মাইল দূরে বসেও আমি প্রতিদিন আমার নিজস্ব বলয় থেকে বারবার ছিটকে পড়ছি। স্রোতের মতো ইমোশন এসে ভর করছে একের পর এক। কখনো বাচ্চাগুলোর শৃঙ্খলাবোধ দেখে আনন্দে উদ্বেলিত হচ্ছি, তো পরক্ষণে উদ্বেগে লাফিয়ে উঠছি, “আরে! আরে! বিচ্ছুগুলো করে কী? ঐ দানব বাসগুলোর সামনে যেয়ে দাঁড়ালো? যদি কিছু হয়?” পরক্ষণেই বিস্মিত হই, ‘না ওরা থামাতে পেরেছে দানবদের’।
লজ্জা পাই! ‘নাহ! ওদের শক্তিকে ছোট করে দেখাটা খুব ভুল হয়েছে’। গর্ব আর আশায় স্বপ্ন দেখতে শুরু করি যখন ওদের প্ল্যাকার্ডে লেখা দেখি, ”হয়নি ব’লে আর হবে না, আমরা বলি ‘বাদ দে’/ লক্ষ তরুণ চেঁচিয়ে বলে- ‘পাপ সরাবো হাত দে’”।

ওরা কেউ নেতা হতে চায়নি, ওরা কেউ হিরো হতে চায়নি। ওরা কেউ ক্ষমতা বা লাইম লাইট নিয়ে কামড়াকামড়ি করেনি। ওরা কেউ কাউকে বলেনি, ‘আমরা বেশী জিপিএ-৫ পাওয়া, আমরা নেতৃত্বে থাকবো’ অথবা কেউ বলেনি ‘আমরা স্কুল হিসেবে বনেদী বেশী, সুতরাং লাইম লাইট আমাদের’। কেউ না ! কেউ না ! ওরা তো শুধু আমাদের পাপটাকেই সরাতে চেয়েছিলো, পূণ্যের ভাগীদার হতে চায়নি। তবু কারো কারো ভয় হলো ওরা বুঝি পাপ সরাতে সরাতে কাউকে গদি থেকেও সরিয়ে দেবে।

সুতরাং শুরু হলো সবলের শক্তি প্রয়োগ। আমার ভাগ্নী নর্থ সাউথের ছাত্রী। প্রতিদিন ওর বুক ভাঙা আর্তনাদ শুনছি, পরিস্থিতির বর্ণনা শুনছি। আমার মেয়ের বয়সী মামাতো দেবর, যাকে জন্মের পর আমি কোলে নিয়েছি। কবে বড় এতো বড় হলো, বুঝিনি। ম্যসেজ পাঠিয়েছে,’ভাবি দোয়া করো, আমরা রাস্তায়’।
আমার বন্ধুরা এখন সবাই স্কুল-কলেজ পড়ুয়া সন্তানের বাবা- মা। প্রতিদিন তারা রোদ-বৃষ্টি মাথায় করে ছেলেমেয়েদের পাশে রাস্তায় দাঁড়িয়ে। তাদের হাহাকার শুনছি। এক আপা ধানমন্ডিতে তার বাসার সামনে মহিলা সাংবাদিকের লাঞ্ছনা সহ্য করতে না পেরে অসীম সাহস নিয়ে হেলমেট বাহিনীর মুখোমুখি যেয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। উনাকে জোর করে ওখান থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। মানসিকভাবে ভীষণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন আপা। বারবার বলছেন, ‘মেয়েটাকে বাঁচাতে পারিনি, এজন্য নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারবো না’। এই তো হলো আমার সব গুজবের সোর্সরা।

যারা জেনে বুঝে বা দলের প্রতি অন্ধ আবেগে এই ‘গুজব তত্ত্ব’ ছড়াচ্ছেন, তাদের মধ্যে কিছু মানুষ আমার সাথে ফেসবুকেও আছেন। নিপাট ভদ্রমানুষ তারা, ফেসবুক জুড়ে ছেলেমেয়েদের নিয়ে হাস্যোজ্জ্বল ছবি। তাদের জীবনে এই স্নেহপ্রবণ বাবার ভূমিকা যেমন সত্য, তেমনি অন্যের সন্তানের প্রতি হওয়া অন্যায়কে ‘গুজব’ বলে তারা উড়িয়ে দিচ্ছেন, এটাও সত্য। আমি শুধু ভাবি, কীভাবে পারেন আপনারা? আমার অভিজ্ঞতা বলে মা হবার পর আমার চোখে এই পৃথিবীটা অন্যরকম। আমি সমস্ত শিশুর মুখে আমার নিজের সন্তানের মুখ খুঁজে পাই, আপনারা কেন পান না? দিনশেষে কীভাবে নিজের সন্তানের মুখের দিকে তাকান?

লেখক: নাসরিন শাপলা

এই যে পুলিশ বাহিনীর একাংশ তাদের লাঠি আর রাবার বুলেট ছুঁড়ছে বাচ্চাগুলোর দিকে, ঘরে ফিরে নিজের বাচ্চাকে তো ঠিকই বুকে টেনে নেবে তারা। এমন হিটলারী নার্ভ আপনারা কোথায় পেলেন? এই ইউনিফর্ম আপনাদের নিমিষে মানব থেকে কীভাবে দানব বানিয়ে ফেলে আমার সেই হিসাব আজও মেলে না।

লাঠি দিয়ে আর যাই হোক গণতন্ত্রের চর্চা হয় না। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রী বাহিনী তো সরকারি এবং ব্যক্তিগত সফরে বহু দেশই ঘোরেন। সুযোগ হলে একবার অ্যামেরিকার হোয়াইট হাউজের সামনে যেয়ে দাঁড়াবেন। দেখবেন কতো মানুষ কতো ভয়ানক ভাষায় ট্রাম্পকে গালি দিয়ে চলেছে, তার নীতির সমালোচনা করে চলেছে। বিদেশে এসে শপিং, সাইট সিয়িং আর দলীয় লোকের সংবর্ধনায় অংশ নেবার পাশাপাশি কিছুটা শেখারও তো প্রয়োজন আছে। আপনাদের বিশাল বাহিনীর সফরের পয়সাগুলো তো আসছে এই জনগণের পকেট থেকেই। তাই কিছুটা দায়বদ্ধতা তো থেকেই যায়। না কি?

আর যদি গণতন্ত্রের চর্চা করতে না পারেন, সমালোচনা যদি সহ্য করতে না পারেন, গদি তো ছাড়বেন না জানি, শুধু আমাদের বাচ্চাগুলোকে ছেড়ে দিন। দেশ হোক মেধাশূন্য। থাকুন আপনাদের মেরুদণ্ডহীন পেটোয়া বাহিনী নিয়ে। পশ্চিমা দেশগুলো বসে আছে আমাদের মেধাবী সন্তানদের লুফে নেবার জন্য। এরা জীবনে সফল হলে তখন না হয় হাত কচলাতে কচলাতে সামনে এসে এদের বঙ্গসন্তান বলে সাফল্যের ভাগীদার হওয়ার চেষ্টা করে দেখতে পারেন।

নীচের ছবিটি দেখুন। মাত্র দুদিন আগের ছবি। ফটোশপ নয়, ১০০ ভাগ অথেনটিক ছবি। এগুলো সব আমাদের বাচ্চা, দুপাশে সাদা শাড়ি পরে বাংলাদেশের পতাকা কানাডার বুকে হাসিমুখে ধরে যে দু’জন ওরা আমার পেটে জন্মেছে। বাকিরা অন্য মায়ের। এরা জন্মেছে ইংরেজি ভাষার জঠরে। এর মাঝে থেকেও ওদের নিয়ে বাংলাদেশের পতাকাটা বিশ্বের বুকে উঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম করে যাই প্রতিনিয়ত। আর আপনারা খোদ বাংলাদেশে বসে শকুনির মতো খাঁমচে ধরেন সেই পতাকা।

কানাডায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এক টুকরো বাংলাদেশ

ধিক আপনাদের দেশপ্রেম, ধিক আপনাদের মসনদের লোভ! আমরা এক পা আগাই, তো আপনারা তিন পা পিছিয়ে দেন। বিদেশীদের প্রশ্নের মুখে পড়ি, ‘What is wrong with Bangladesh”? বিদেশে বসা আপনার ‘গুজব তত্ত্বের’ ধারক এবং বাহকরা কী উত্তর দেন জানি না, তবে আমি কী বলবো সেটা ভেবে ভিতরে ভিতরে লজ্জায় কুঁকড়ে যাই।

আমাদের এই বাচ্চাগুলো যখন এই বিশাল পতাকাটা এই কানাডার বুকে মেলে ধরেছিলো, মুহুর্তটা আমার মনে থাকবে সারাজীবন। বিকেলের আলো প্রায় ধরে এসেছে তখন, সামনে হাজার মানুষের মেলা, বাতাসে উড়ছে পতাকা, ব্যাকগ্রাউন্ডে গান বাজছে “কোন এক রাতজাগা ভোরে সরিয়ে নকশিকাঁথা, দেখবে সেখানে লিখে রেখেছি বাংলার বিজয় গাঁথা।” আমার দু’চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।

আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, সত্যের পথে চলা এই ছেলেমেয়েদের বিজয়গাঁথা আজ হোক কাল হোক রচিত হবেই হবে। তবে সেই বিজয়গাঁথার ইতিহাসে আপনাদের স্থান হবে রং সাইডে, অনেকটা আপনাদের ফ্ল্যাগ লাগানো গাড়িগুলোর পথচলার মতো।

শেয়ার করুন:
  • 422
  •  
  •  
  •  
  •  
    422
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.