লাইসেন্স আছে আপনার?

সুচিত্রা সরকার:

মায়ের বয়স তখন চৌদ্দ। সদ্য বিবাহিত। দূরপাল্লার বাসে চড়লেন প্রথম। গন্তব্য ঢাকা, বরের কর্মস্থল। বসেছিলেন মহিলা সিটে। দাউদকান্দি পেরোতেই বাস অ্যাক্সিডেন্ট। মহিলা সিট থেকে সেকেন্ডের মাথায় বাসের সবচে পেছনের সিটে চলে গেলেন। রক্তারক্তি। হাতের কনুই কেটে একাকার। ভয়-আতঙ্কে আর কিছু হয়তো খেয়াল করেনি বালিকা-বধূ। এক সপ্তাহ পর তাঁর হাতের কনুই থেকে এক ইঞ্চি সাইজের একটা কাঁচ উদ্ধার করা হয়।
মা তবু ভাবেনি কথাটা…।

বাবা চলে গেলেন। মা প্রায়ই একা একা কুমিল্লা যাতায়াত করেন। আমি ঠাকুর- ভগবানের নাম জপি! যেন অ্যাক্সিডেন্ট না হয়! কুমিল্লা মহাসড়কটা যা ভয়াবহ! দীর্ঘ বিশ বছর একই রকম ডিলেমা বাস-যাত্রায়! আমি ভাবিনি এরকম…।

দুই বাসের রেষারেষিতে বাসের জানলা গেল ভেঙে। জানলার পাশের সিটে ছিলাম। পিঠ, মুখ, শাড়িতে অজস্র কাঁচের গুঁড়ো। তিড়তিড় করে কাঁপছিলাম অনেকক্ষণ। তবু চালককে প্রশ্নটা করে উঠতে পারিনি…।

পাশের বাড়ির ভাড়াটিয়া ঝন্টু। ওর সাইকেলটা নীলক্ষেতে সলিল সমাধি পেল। জিজ্ঞেস করিনি…।
আমাদের ইনস্টিটিউটের প্রথম বর্ষের ছেলে আহসান হাবীব, ওরও একটা সাইকেল ছিল-যেটায় চড়ে প্রতিদিন ক্লাসে আসতো। একদিন আর এলো না। একটা বাস তার যাত্রা থামিয়ে দিল। আহসান হাবীবের মা প্রতিবছর মৃত্যুদিনে আমাকে ফোন করেন। কাঁদেন। দোয়া করতে বলেন। তাঁর মাথায়ও আসেনি প্রশ্নটা…।

আমার বন্ধু মলয়, একটু একটু করে গুছিয়ে নিচ্ছিল জীবনটা! ওর জীবনটা কেড়ে নিল রাস্তা! কেড়ে দিল সড়ক! তখনও প্রশ্ন করিনি। মলয়ের মা আজও শ্মশানে বসে কাঁদে একমাত্র ছেলের জন্য। তবু তিনি শেখেননি কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়!

তবু প্রশ্নটা প্রায়ই দেখি। হুম, দেখি। এসব কথা শোনা যায় না। বাস চলতে চলতে হঠাৎ থেমে যায়। যাত্রীরা অস্থির- হলো কী? ‘পুলিশ গাড়ি আটকাইছে’ বলেই ছোট একটা কালো ব্যাগ নিয়ে নামে বাসচালক। তারপর লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান। পুলিশও সেখানে। ও সময়ই হয়তো ফিসফিসিয়ে প্রশ্ন আর উত্তর চলে দুজনের মধ্যে। কখনো রফা হয়। বা কখনো মনঃপূত না হলে কাগজ খায়।

মামলা খেয়েও চালক হাসিমুখে গাড়িতে স্টার্ট দেয়! মামলায় ওদের ডর-ভয় নেই! ওসব নস্যি! তবু ওদের জিজ্ঞেস করা হয় না…।

পুলিশকে জিজ্ঞেস করা হয় না- স্যার, কী বললেন চালককে? কোন ধারায় মামলা হলো? কতদিনের জেল? আপনার মুখের প্রশান্তির হাসি তো অন্য বার্তা দিচ্ছে- এভাবে কতদিন স্যার? বলা হয় না… হয় না…।

তাড়া থাকে। অফিসের। বাড়ি ফেরার। মায়ের ডাক্তার দেখানোর। বাহানা তৈরি করি শরীরের। অজুহাত বাস্তবতার। তাই প্রশ্নটা তৈরিই হয় না কখনো। প্রশ্নটা শিশুকালেই মরে যায় মনের ভেতর। প্রশ্নটা সাহস পায় না বাঁচবার!

তাই তারা বেঁচে থাকেন। বর্তে থাকেন। ঘুষ খান। ঘুষ খাওয়ান। দু’পক্ষ মিলে ইজারা নেন জনগণের জানের। হয় রাখবেন, নয় মারবেন। অচলায়তন তৈরি করেন। খুব সর্ন্তপনে। নিঃশব্দে। তাই কখনো জিজ্ঞেস করা হয় না…।

অ্যাম্বুলেন্সে প্রায় মৃত মানুষ আটকে থাকে সিগন্যালে, বিপরীতে মন্ত্রীর গাড়ি সাঁই সাঁই গতি! তবু জিজ্ঞেস করা হয় না, শহরে কার মূল্য বেশি!

হঠাৎ সেদিন, গেল সপ্তাহে যেন প্রাণ ফিরে পেল শহরটা। গতি পেল যেন একটা। নাড়া খেল বেদম।
প্রশ্নটা ছুটছে বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে! আলোর গতিবেগের সঙ্গে অংক কষছে প্রশ্নটা- ‘লাইসেন্স আছে আপনার?’

ট্রাক, বাস, কাভার্ড ভ্যান, প্রাইভেট কার- কেউ বাদ যায় না প্রশ্নটা থেকে। তা গাড়ি যারই হোক! ধরা পড়ে যায় অনেকের ফাঁকি!

একটা গাড়ি এক ‘বাহিনী’ কর্মকর্তার। চালক গাড়ি চালায় ষোলো বছর ধরে। এতো বছরে কখনো লাইসেন্স নিয়ে বের হয়নি! তার গাড়িটা আটকে দেয় ‘আঠারো বছর বয়স’। রাজা, উজির, নায়েব, পেশকার- কাউকে ওরা চেনে না।

ওরা চেনে কাগজ- যার নাম লাইসেন্স! তাই খোঁজে নির্মল আনন্দে! খোঁজে চোখে আঙুল দিয়ে শহরকে দেখিয়ে দিতে-কী ধাতুতে গড়া এ শহর! কাদের রেখেছে সভ্যতা নির্মাণে?

চপেটাঘাত সিস্টেমকে? নাকি আরো বেশি কিছু?

অনভস্ত রাস্তাগুলোও এতোদিনের নিয়মহীনের নীতিতে চলতে চলতে আজ যেন ‘ভেবড়ে’ যায়। কাঁচুমুচু করে রাস্তারাও। খানিকটা লজ্জিত কি?

কচি কচি হাত। কচি কচি মুখ। তারা ঠিক করেছে রাস্তার চার লাইন। আটকে থাকে না অ্যাম্বুলেন্স। প্রসূতি মা বিশেষ যত্নে যান বাড়ি। রিকশার জট ‘লেজে-গোবরে’ মাখে না। গাড়িগুলোও লাইন ধরেছে। বৃষ্টি-রোদে-ক্ষুধায় ওরা পোড়ে! তবু কী অমলিন হাসি!

‘না তো, সকাল থেকে রাস্তায়ই আছি। খাইনি তো কিছু।’ কোত্থেকে একদল মমতা এগিয়ে আসে। কিশোর বাহিনীর দিকে। বিচ্ছুবাহিনীর দিকে।

খিচুড়ি, চিপস, বিস্কুট, সিঙ্গারা আর মুঠো মুঠো ভালবাসা। শহরের মানুষের ভালবাসার ঝাঁপিতে আরো যা ছিল, দেয়। লেখক তার সব দেখতে পায় না।

লেখক শুধু শুনতে পায় একটা প্রশ্ন- ‘লাইসেন্স আছে আপনার?’

এরই মধ্যে কিশোরবাহিনী নতুন নতুন পদ্ধতি বের করে ফেলে। গাড়ি সামনে ‘ওকে’, ‘নট ওকে, ‘ইমার্জেন্সি’ লেখা নিয়ে শহরে পথ চলে।

এতো মেধাবী কেন এরা? কী দারুণ দারুণ সব স্লোগান, কবিতা, গান!
শহর ভেবেছিল এরা আত্মকেন্দ্রিক। যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি-যারা নব্বই দেখেনি-যারা তেমন বই পড়ে না-যারা সেলফিকে জীবনের ধ্যানজ্ঞান করে রেখেছে-তারা? কবে এমন বদলে গেল এরা?

শহর চমকে যায়। একটা জেনারেশন, সকলের অগোচরে নিজেকে প্রমাণ করতে কী ভেতরে ভেতরে তৈরি হচ্ছিল? নাকি, ওরা দেশপ্রেমে কাঁপে প্রাচীনদের মতই? দেশের সকল বিপদে ওরাও লাল-সবুজ পতাকাটা আঁকড়ে ধরে? জাতীয় সংগীতে ওদেরও গলার কাছটায় দলা পাকায়?

আশ্চর্য! গোটা শহরের অগোচরে নিজেদের তৈরি করেছে বিচ্ছেুবাহিনী। ভেতরে ভেতরে এতোটা বড় হয়ে গেছে। বড়দের দেখিয়ে দিল একহাত।

তাই রাস্তায় ওরা থাকুক বা না থাকুক, ওদের প্রশ্নটা থাকবেই-‘লাইসেন্স আছে আপনার?’,
গাড়ি দেখলেই লোকে মনে মনে ভাববে-‘লাইসেন্স আছে আপনার?’

কোথাও অন্যায় হলেই পরানের গহীনে বিষকাঁটার মতো বিঁধবে- ‘লাইসেন্স আছে আপনার?’
পুরো সিস্টেমের জন্যই ওরা জন্ম দিয়েছে এক গভীর তাত্ত্বিক প্রশ্ন!

তবে অতো সহজে নয়। প্রশ্নটা তৈরি করতে ওদেরও কিছু দিতে হয়েছে। দিয়েছে শ্রম অর ঘাম। দিয়েছে চেষ্টা আর কান্না।

নিষ্পাপ কিশোরের চোখে আজ কান্না ঝড়ছে। কান্নার কোনো রং নেই, কথাটা মিথ্যা। তাঁকিয়ে দেখুন, ওদের কান্নার রঙ আজ লাল!

৫.০৮.২০১৮
রাত ১১.২৮ মিনিট
লালবাগ, ঢাকা

শেয়ার করুন:
  • 546
  •  
  •  
  •  
  •  
    546
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.