অন্যকে মানসিকভাবে অসুস্থ করবেন না, প্লিজ

আমেনা বেগম ছোটন:

একটু আগে একজন আপু আমাকে ফোনে জিজ্ঞাসা করলেন, দেশে আসলে কী হচ্ছে, আমি কিছু জানি কিনা? প্রথমে জিজ্ঞ্যেস করলাম, কী হচ্ছে, কী জানতে চাইছেন? যে ছাত্রছাত্রী খুন করে গুম হচ্ছে, রেপ হচ্ছে এইসব?

আমি কোন সংবাদদাতা নই, সাংবাদিকও না, উনাকে কিভাবে কনফার্ম করি যে কেউ মারা যায় নাই! তবে অতি উৎসাহী লোকজনকে দেখতে পাচ্ছি ওত পেতে বসে আছে, একটা লাশের ছবি পেলে সেটা ভাইরাল করবে, আরও ১০০ জনের ইনবক্সে পাঠাবে। এখন পর্যন্ত অথেণ্টিক লাশের ছবি পাওয়া যায় নাই। পাওয়া গেলে নিশ্চয়ই এক্টিভিস্টরা আন্দোলন জোরদার করতে পারতো।

উনাকে জানালাম, ছাত্রলীগ স্টুডেন্ট এক্টিভিস্ট পিটিয়েছে, ভালো মতোই পিটিয়েছে, তাদের কেন্দ্রের সামনে পেয়েছে, লাঠিশোটা মজুদ ছিল। মারামারি হয়েছে, অনেক হতাহত হয়েছে, কিন্তু অর্গানাইজড প্ল্যানড মার্ডার হয় নাই।

ছাত্রলীগ আওয়ামী লিগ অনেক অপকর্ম করেছে। অপকর্ম তারা প্রকাশ্যেই করে, বিশ্বজিৎ কোপানো, হাতুড়ি পেটানো সব কিছু আপনারা দেখেছেন। মার্ডার, রেপ এগুলি করলেও দেখবেন, সবার হাতে মোবাইল ক্যামেরা আছে, এমন কিছু দেখলেই ভিডিও করে ফেলবে ।

তাদের অপকর্মের প্রতিরোধ ভুয়া ছবি দিয়ে হবে না। যেকোনো লাশই ভয়ংকর, সেটা নসিমন দুর্ঘটনা হতে পারে, গ্রামবাসীর মারামারির মধ্যে নিহতের লাশ, বিউটির লাশ, দেশে প্রতিদিন ডজনখানেক ধর্ষণ হয়, তাদের ছবি ও হতে পারে। লাশের বা ধর্ষণের শিকার ছবিমাত্রই সেগুলি নিরাপদ সড়কের আন্দোলনের কর্মীদের নয়।

আমি জানি, আপনাদের উদ্দেশ্য মহৎ। বাচ্চাদের নিরাপত্তা চান, সন্তানের থেকে মূল্যবান পৃথিবীতে আর কিছু নেই। দেশের ভালো চান, নাগরিক নিরাপত্তা চান – এটাই তো সবার চাওয়া হওয়া উচিৎ। কিন্তু সেটি ফেসবুকে প্যানিক ছড়িয়ে করা যাবে না।

আচ্ছা, কখনো কি ভেবেছেন যখন ফেসবুক ছিল না, তখন কিভাবে সমস্যা সমাধান হতো? আমাদের স্কুলে চিঠি লেখা শেখানো হতো, তোমার গ্রামের রাস্তা মেরামতের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর চিঠি লিখ।

এর মানে হচ্ছে আপনাকে জায়গা মতোন কাজ করতে হবে। আপনার ঘর থেকে শুরু হোক, রাস্তাঘাটের নিয়ম কানুন জানুন, মানুন, অন্যকে মানতে শেখান। জায়গায় জায়গায় মাঝেমধ্যে বাস ডিপোতে যান। অল্পবয়সী/লাইসেন্সবিহীন/রেকলেস ড্রাইভার দেখলে বাস নম্বর, ডেট টাইম নোট করে পুলিশকে জানান। আরো অনেক কিছু করতে পারেন। জাস্ট, ফেসবুকে আরেকজনকে মানসিকভাবে অসুস্থ করবেন না।

ওই আপু সারারাত কান্নাকাটি করেছেন, বাচ্চার বয়স আড়াই, আজ তার ৮ ঘন্টার শিফট, আপনার শখের দেশপ্রেম তার পুরো একটি দিন মাটি করেছে।

একেকজনের মানসিক সক্ষমতা একেক রকম, আমার মায়ের বয়সী লোকজন ফেসবুকে আছেন, উনারা এত প্যাচ বুঝেন না, এসব দেখে অসুস্থ হয়ে যান, অথবা শেয়ার করে আরেকজন কে অসুস্থ করে ফেলেন।

বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রচুর দুখজনক ঘটনা ঘটে। একে খুন করে, তাকে মেরে ফেলে সব কিছুর ফেসবুক ভিডিও যদি দেখতে যান, বাঁচতে পারবেন না। ধরুন বিউটির বাবা যে হত্যা করেছে সেটির ভিডিও দেখতে পারবেন?
কত ক্রসফায়ার এর নিউজ পড়েছেন, একরামুলেরটাই কেন আতংকিত করলো আপনাকে? সাউন্ড ক্লিপের জন্য?

ক্লাস সেভেনে একটা গল্প পড়েছিলাম আমেরিকার স্লাইক্লোন নিয়ে। টিভিতে আসন্ন ঝড়ের কথা এক নাগাড়ে শুনতে শুনতে সবাই আতংকে অস্থির হয়ে গেল। এক সময় যান্ত্রিক গোলযোগে টিভি সম্প্রচার বন্ধ হয়ে গেল। আমেরিকা বাসী হাফ ছেড়ে বাচল, টিভি বন্ধ করে ঘুমিয়ে গেল। প্রাথমিক প্রস্তুতি, নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা হয়ে গেছিল, ঝড়ে তেমন কোন ক্ষতি হল না।

এক সপ্তাহ পর, যদি কাংখিত লাশ না পরে, সরকার আরো গোয়ার্তুমি না করে, সবাই সব ভুলে যাবেন, দৌড়ে বাসে উঠবেন, বাসের আগে দৌড়ে রাস্তা পার হবেন, ইলিয়াস কাঞ্চন আবার একা হয়ে যাবেন।

যে বিষয় এক সপ্তাহ আয়ু রাখে না, তা নিয়ে কেন নিজের শান্তি নষ্ট করছেন? ছাত্রছাত্রীদের বাবা মা নিজের বাচ্চাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। দরকার হয় তাদের সাথে দাঁড়িয়ে থাকুন। ভাল থাকুন সবাই।

শেয়ার করুন:
  • 387
  •  
  •  
  •  
  •  
    387
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.