কিশোর বিদ্রোহ ২০১৮: পাহাড় আর পাহাড়ের কিশোর-কিশোরীরা

মুক্তাশ্রী চাকমা সাথী:

প্রসঙ্গ: স্লোগান “ভাই, ৪৭ বছরের পুরনো রাষ্ট্র যখন ঠিক করতে নেমেছেন, আমার পাহাড়ও ঠিক করে দিয়েন।”

গতকাল থেকে এই স্লোগান ঘুরপাক খাচ্ছে, আমার টাইমলাইনে। যতবার দেখছি, বুকের ভিতর মোচড় দিচ্ছে। স্লোগানের পিছনের অসহায়ত্ব দেখে, আকুতি দেখে। অবশ্য এই অনুনয়ের পিছনে দোষটাও কারো উপর চাপানো সম্ভব না। আবার যখন নিজের চারপাশে তাকাই, তখন অনেক সাহস জাগে সাহসী সাহসী ছেলেমেয়েদের আশে-পাশে দেখে। যারা ভাবে, জানে, করে এবং বোঝে- নিজেদের পাহাড় নিজেদের ঠিক করতে হবে। মাইনসে ঠিক করে দিবে এই আশায় থাকে না (যেমন ধরেন, কৃত্তিকা ত্রিপুরার উপর ঘটে যাওয়া নৃশংস ঘটনার পর কেউ জানুক আর না জানুক, পাহাড়ের ছেলেমেয়েরা তাঁদের প্রতিবাদ জানিয়ে গেছে, বসে থাকেনি।)

ঠিকই তো… কতো আর বসে থাকবো! অনুনয় করবো? ওরা কেন পাহাড় ঠিক করে দিবে? ওরা জানে আমাদের কী দরকার, আর কী দরকার না? ওদের কি আমাদের ঠিক কোন জায়গায় সমস্যা তা বোঝা সম্ভব? আমরা যেমন সমতলে মাঝে মাঝে যাই, তারাও পাহাড়ে জীবিকার প্রয়োজনে, বেড়াতে, আসেন।

Schools kids demanding justice for their friend Kritika Tripura stopped by Armed force in Khagrachari on July 31,2018. 9/10 years old Kritika was allegedly raped and her mutilated body was found later. Photo credit : unknown

অনেক আদিবাসী বন্ধুকে দেখলাম লিখছেন ফেইসবুকে “নিরাপদ সড়ক চাই এ দাবি তোলার আগে নিরাপদ পাহাড়ের দাবি করেন।” যারা দুটোই দাবি করছেন। তাঁদেরকে ভালবাসা। যারা যেকোনো একটা দাবি করছেন তাঁদেরও ভালবাসা কারণ তারা সে দাবিই জানাচ্ছেন যার সাথে তিনি নিজেকে দেখতে পান, যা তাঁর নিজের জীবনের সাথে, নিরাপত্তার সাথে জড়িত।

শ্লোগানটা দেখার পর আমার প্রথম যে ভাবনা মনে এসেছিলো তা হলো – আহারে… বছরের পর বছর শোষিত হতে হতে কতো আত্মবিশ্বাসহীন অবস্থা হচ্ছে আমাদের দিনকে দিন… আমরা ভাবি আমরা নিজেদের রক্ষা করতে পারবো না। অথবা ভাবি রক্ষা করার চেষ্টাটুকুও করার দরকার নেই, যদি কোন রক্ষাকর্তা আমার পিছনে না থাকে। আমাদের রক্ষাকর্তা লাগে – তা সে বাঙ্গালী রূপে হোক, আদিবাসী/ বাঙ্গালী নেতা রূপে হোক, ধর্মগুরু রূপে হোক, রাজা-রানী রূপে হোক, অফিসার রূপে হোক, প্রফেসর রূপে হোক, মানবাধিকারকর্মী/নারীবাদী রূপে হোক। আমাদের কাছে “ওরা” রক্ষাকর্তা রূপে আবির্ভূত হয় বেশী, সহযোদ্ধারূপে কম। সহযোদ্ধা না হওয়ার ফলে আমরা তাঁদের প্রশ্ন করার সাহস রাখি না, নিজের মাথা ঘামাতে চাই না। ভাবি সব উনি বলে দিবেন আর আমরা করবো।

গত ছয় দিন ধরে আমার মনে চলমান আন্দোলন নিয়ে খুব শান্তি… বাচ্চাদের আন্দোলন বলছি আমরা আদর করে, ছোট করে নয়। কিশোর বিদ্রোহ বলছি তাঁদের প্রাজ্ঞতা দেখে। আমি অসম্ভব ধরনের খুশী এটা দেখে – এইখানে কোন নেতা-নেত্রী নাই । এরা সবাই এঁকে অপরের সহযোদ্ধা। বাচ্চারা দেখিয়ে দিলো এমন এক আন্দোলন যা একজন নারীবাদী হিসেবে আমি সবসময় স্বপ্নে দেখেছি বাস্তবে হবে তা কখনো কল্পনা করিনি। বাচ্চারা দেখিয়ে দিলো খুব সম্ভব এমন আপাত দৃষ্টিতে (Uotopian Movemnet) আন্দোলন।

নারীবাদী হিসেবে প্রতিটা পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামোর বিপরীতে আমার লড়াই। তা সে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নারী থাকুক আর পুরুষ থাকুক। পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা কী জিনিষ? যে ক্ষমতা কাঠামোয় একজনের/বা গুটিকয়েক জনের কাছে সকল ক্ষমতা ন্যস্ত, তারাই সকল সিদ্ধান্ত নেয়। জনগণ/ছোটরা, ক্ষমতায় যারা থাকে না, তারা মূলতঃ ফলো করে শুধু, সিদ্ধান্তগ্রহণে অংশ নিতে পারে না। তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্য মানুষ বলে মনে করা হয় না।)

এই কিশোরে বিদ্রোহে আমি “আমরা সবাই রাজা আমাদের এ রাজার রাজত্বে, নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কি স্বত্তে” গানের প্রতিটা লাইনের প্রতিফলন দেখি। হাঁ, অনেক কিছুতে হয়তো ওদের “ভুল” হচ্ছে। আমাদের (প্রাপ্তবয়স্কদের) হয় না? আমরা কাজ করতে করতে শিখিনা? তাহলে? ওরাও শিখবে।

যাই হোক, কী বলা শুরু করেছিলাম আর কি বলছি… এখন আমাকে কেউ প্রশ্ন করতেই পারে – তাহলে পাহাড় কীভাবে ঠিক হবে, হে মহাপণ্ডিত সাথী?

“The placard says “In the hills, they’re being killed by rape. In the plains, they’re being crushed under the wheels of vehicles. When we demand justice, they try to scare us with batons and uniforms. Who cares? We want justice.” #WeWantJustice Photo credit ঈথা. Photo caption : Sarah Tasnim Shehabuddin . লিঙ্কঃ https://bit.ly/2MfV5YB

আমি জানি না। আপনি আপনার মাথা খাটান, পথ বের করেন। আপনি যে এলাকায় থাকেন সে এলাকায় কিভাবে সমস্যার সমাধান করা যায় তা ভাবেন। ভাবার সময় সমাধানগুলো যেন মানবাধিকারের মানদণ্ডকে না ভাঙ্গে তা মাথায় রেখে সমাধানের পথ বের করেন। এখন আপনি যদি “মাইরা কাইত্তা সব সাফ কইরা ফেল্মু” – এই সমাধান ভাবেন, তাহলে তা মানবাধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক, কাজেই ঐ সমাধান কাজে তো আসবে নাই, বরং ঝামেলা বাড়াবে।

আমার বেকুব মার্কা মাথায় আমার যা মনে হয় তা এইরকম – আমাদেরও যৌক্তিক প্রশ্ন করা শিখতে হবে, আবেগের সাথে যুক্তি লাগে। আমাদেরও সিনা টান করে দাঁড়াতে হবে। আলসেমি ছাড়তে হবে। ঢঙের বেলায় লাফায় লাফায় যেমন যোগ দিই। কাজের বেলায়, যে সমস্ত কাজে মাথা খাটাইতে হয়, পরিশ্রম করতে হয়, কথা বলতে হয় যুক্তি আর ফ্যাক্ট সাজিয়ে – ঐগুলা আমাদের শিখতে হবে, আর ঐগুলাতেও আমাদের লাফায় লাফায় যোগ দিতে হবে। ফান্ড থাকুক আর না থাকুক, পিছে কেউ থাকুক আর না থাকুক, কেউ আমাকে ডাকুক আর না ডাকুক। এইসব “বেয়াদবি/ নির্লজ্জতা” শিখতে হবে। কারণ আমরা যোগ না দিলে ওদের বড় সুবিধা হয় ভঙ চং বুঝায় দিতে।

কাজেই আমাদের কাজের সময় অজুহাত দেখানো বন্ধ করতে হবে। যার যা দায়িত্ব তা পালন করছি কিনা তা দেখতে হবে। নিজেদের দায়িত্ব পালন করে মাইনসে হাততালি না দিলে, কেউ একটু গালিগালাজ করলে “কষ্টে- অভিমানে কাজ বন্ধ করিলাম” এই সব আজাইরা মন্মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। যা করনীয় তা করছেন, তাঁর জন্য আবার আপনার প্রশংসা লাগবে কেন unless আপনি হন একজন attention seeker.

লেখক: মুক্তাশ্রী চাকমা সাথী

যে সব মানুষ কখনো আপনার সাথে কাজ করেনি, আপনার জীবন ও সংগ্রাম সম্পর্কে জানে না, শুধু শুনেছে – সেই মানুষজন দিক গালি, কি আসে যায়? আপনি জানেননা আপনি কেমন? তাহলে কেউ কিছু বললেই গোস্বা + মন খারাপ করবেন কেন? হাসবেন হা হা করে।

[বলছি বটে… কিন্তু আমার নিজেরই মিথ্যা কথা আর বানানো বানানো বদনাম গালিগালাজ শুনেও মন খারাপ না করে + কোন ধরনের স্বীকৃতি না পেয়েও কাজ কীভাবে করে যেতে হয় তা শিখতে বছরখানিক সময় লেগেছে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি ঐসব বড় মনের মানুষদের কাছে যারা সবসময় আড়াল থেকে/ ডেকে/ প্রকাশ্যে বলেছেন- “মন খারাপ করো না। কাজ করে যাও। লক্ষ্য ঠিক রাখো। ভুল থেকে শিখো।” আপনারা জানেন আপনারা কারা…

Anyway, একটু চর্চা করলেই যেকোনো কিছু পারা যায়। প্রথম দিকে কষ্ট হয়, তারপর আর হয় না। “I dont give a damn when I am doing nothing wrong” mood এ গিয়ে কাজ করেও যাওয়া যায়। আমি পারলে আপনিও পারবেন।]
এই যে বাচ্চারা (পাহাড়ি, বাঙ্গালী, ছেলেমেয়ে) কাউকে ভয় না পেয়ে দাঁড়াচ্ছে, মার খাচ্ছে, আবার ফিরে যাচ্ছে। আমরা এমন করি? রাষ্ট্রের যে ব্যক্তি, প্রশাসনের যে ব্যক্তি, প্রথাগত বিচার ব্যাবস্থার যে ব্যক্তি, রাজনৈতিক যে ব্যক্তি আমাদের পাহাড়ে নানা ধরনের হুমকি ধামকি, ক্ষমতার অপব্যবহার করে, ভয় দেখায় তাঁর মুখোমুখি একসাথে বা একা দাঁড়াই? তাঁকে বলি – তাঁর সীমার মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করতে? বলি না। তাঁকে আমরা সালাম করি ভয়ে- সম্মানে নয়। আমাদের ছোট কাল থেকে শিখানো হয় – বড় মানুষরা (সামাজিক স্ট্যাটাসে, ক্ষমতায়, প্রভাবে অথবা বয়সে বড়) যাই বলুক আমাদের “তুমি জিয়ান হ আয়” – ‘যা আপনারা বলেন’ বলে মেনে নিতে হবে।

আমরা প্রশ্ন করি না। যারা প্রশ্ন করে, চ্যালেঞ্জ করে বৈষম্যকে তাঁদের বরং আমরা একঘরে করি। তাঁদের সঙ্গ দিই না, তাঁদের পাশে দাঁড়াই না। আমরা হিসাব করি – ও কোন দলের/কোন জাতের, কোন এলাকার, আমার সাথে কেমন সম্পর্ক। তারপর তাঁদের আরও কোণঠাসা করি। সমাজের, প্রথার দোহাই দিয়ে। এইসব করতে করতে সহযোদ্ধাকে আমরা শত্রু বানাই। অথবা পুরুষতান্ত্রিক নেতা/ নেত্রী বানাই। দিন শেষে কোনটাই কোন কাজে আসেনা। নিজেদের দায়িত্ব নিয়ে নিজের কাজ করাটা এইকারনেই জরুরী।

একদিনে এইসব হবে না। আমিও জানি, আপনিও জানেন। কিন্তু চর্চাটা শুরু করতে হবে। ইচ্ছা করলে শুরু করে দিতে পারেন। আজ থেকেই।

শেয়ার করুন:
  • 594
  •  
  •  
  •  
  •  
    594
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.