“এ ভাষা বোধ হয় জন্মায়, যে রোজ করে না, তাহার চেতনায়”

প্রজ্ঞা মৌসুমী:

আম্মা তখনো এঁটো গ্লাস-প্লেটও সরাতে পারেনি। খবর এলো এক স্টুডেন্টকে গাড়ি চাপা দিয়ে ড্রাইভার পালিয়েছে। আম্মা অস্থির হয়ে গেল। ভাইয়ারা সবে বের হয়ে গেছে। বলতে গেলে পাড়ার হাইস্কুল পড়ুয়া সবকটা ছেলেমেয়েই ততক্ষণে পথে। সব বাসায় নেমে গেছে হাহাকার। কোন রকমে ভিড় ছাপিয়ে একটা নাম এসে পৌঁছুলো- নাজমুল। নাম শুনে পাঁজর নড়ে যেতে চায়। কোন নাজমুল! আমাদের! আমাদের? আম্মার দিকে তাকানো যায় না।

সেদিনের দিনটা আমাদেরও হতে পারতো। হয়নি। ছেলেটা সুরমার ওপার থেকে আসতো। অবশ্য সেদিনের নাজমুল যেন আমাদেরই হয়ে গিয়েছিল। শহরের ছেলেপুলেরা গেল ক্ষেপে। ভাইয়ারা সারাদিন বাসায় ফেরেনি। আমরা ছোটরাও স্কুল কামাই দিলাম। দুপুরে ইলিয়াস কাঞ্চন এলেন। ভাঙচুর, মিছিল,শোক, ক্ষোভ…কতো কী হলো।

নাজমুলের আম্মার বিলাপ সেদিন সব মায়ের বিলাপ হয়ে গিয়েছিল। নাজমুল পিঠা খেয়ে বের হতে চেয়েছিল। স্কুলের দেরি হবে, নদী পার হতে হবে, ওর আম্মা বলেছিল, স্কুল থেকে ফিরে এসে খাস। সেই হাহাকার ছুঁয়ে গিয়েছিল সব মাকে। তারপর থেকে আমাদের কিছু খেতে ইচ্ছে করলে আম্মা ‘পরে’ বলতে পারতো না। নাজমুলের মতো যদি আর না ফেরা না হয় কোনদিন!

নাজমুল যেখানে মারা গেলো, সেখানে স্মৃতিসৌধ বানানো হয়েছিল। কতদিন পার হওয়ার সময় বুক কেঁপে উঠতো ছেলেটার জন্য। এখনও মনে পড়ে। বেঁচে থাকলে তারও তো একটা সংসার হতো। আমার মতো ওরও হয়তো একটা মেয়ে থাকতো… সময় চলে যায়। অনিয়মগুলো আমরা জমিয়ে রাখি। নাজমুল দিয়েই শেষ হয়না। যে সুনামগঞ্জকে আমাদের সময় জ্যোৎস্নার শহর বলা হতো, তার পেছনের মানুষটিও চলে গেল সড়ক দূর্ঘটনায়। তারপর একে একে চেনা অচেনা কতো মুখ। এখনও কোন দূর্ঘটনা শুনলে মনে হয় হয়তো কোন মা তখন পিঠে থালায় নিয়ে বসে, কোন স্ত্রী ঘড়ির দিকে তাকিয়ে, বারান্দায় কোন মেয়ে তার বাবার অপেক্ষায়…

দায়িত্ববোধের অভাবে দুর্ঘটনাকে, দুর্ঘটনা বলা চলে না। বিয়ের পর দু’বার রোড এক্সিডেন্ট হলো সোহেলের। গত বছর তো এখানেই, আমার কোলে দু’মাসের রোদসী। গাড়িটা দুবার ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়ার পরও সে যে হেঁটে বাড়ি ফিরেছিল, সেটাই আশ্চর্য। সেবার দেখেছি ড্রাইভার কী করে দায় এড়াতে চায়। পারলে উল্টো দোষ চাপায়। দুঃখ রাগে বলেছিলাম- ‘কপালে রোড এক্সিডেন্টই আছে। মরে আমাকে বড়োলোক বানায় দিয়ে যাবি।’ অথচ আমার প্রয়োজন খুবই সামান্য।

জীবনের কাছ থেকে বেশি কিছু চাইবার নেই আমাদের। মেরেকেটে দিন কেটে দিতে পারি সামান্য কিছু পেলেই। তবে তুচ্ছ, সয়ে যাওয়া আমাদেরও ক্ষোভ আছে, যন্ত্রণা আছে… ভাষাও আছে! ঋত্বিক ঘটক যেমন বলেছিল-

“তেমন ভাষাটি কিন্তু আছে। খুঁজিয়া পাইতেছি না কি সব আজে-বাজে করিতেছি… এ ভাষা বোধহয় জন্মায়, যে রোজ করে না, তাহার চেতনায়। জীবনে খুব প্রয়োজন না হইলে যে মুখ খুলে না। যে মুখ খোলে একমাত্র জীবনমরণ সমস্যার চাপে পড়িয়া। খুব খানিকটা না রাগিলে, খুব ভাল না বাসিলে, খুব খুশী না হইলে, খুব না কাঁদিলে এ আদিম ভাষা কোথা হইতে উঠিবে?”

শেয়ার করুন:
  • 75
  •  
  •  
  •  
  •  
    75
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.