সড়কে হত্যা বন্ধের এখনই সময়

লিপিকা তাপসী:

এক বন্ধুর পার্টনার কাজ শেষে ফিরছিল, কিন্তু রাস্তায় থেমে গেল জীবন, ফেরা হলো না প্রিয়জনের কাছে। এক সহপাঠীর পার্টনার কী ভীষণ আনন্দ আর উত্তেজনায় ছুটছিল সদ্য জন্ম নেওয়া প্রথম সন্তানের মুখটি দেখবে বলে, আর দেখা হলো না। সন্তানের জন্মদিনটি কান্না হয়েই রইলো।

এরকম বহু গল্প বলে শেষ হবে না। প্রতিদিনই নিজে যখন বাসা থেকে বের হই ভাবি আর ফিরব কিনা। মেয়ে, তার বাবা কোথাও বেরোলে যতক্ষণ না ফেরে ততক্ষণ দুশ্চিন্তা ভর করে থাকে। বাসার কাছেই স্কুল, কিন্তু মেয়েকে স্কুলের রাস্তাটি পার করে দিতেই সাথে কাউকে থাকতে হয়। সাহস হয় না একলা পাঠাবার, কিংবা যেদিন কাউকে পাওয়া যায় না কী ভীষণ দুশ্চিন্তা নিয়ে অপেক্ষা থাকে ফিরে আসার।

যে মেয়ে আর ছেলেটি রক্তমাখা শরীর নিয়ে রাস্তায় পড়ে ছিল, অথচ একটু আগেই খুনসুটি দুষ্টুমীতে মেতে ছিল, বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল ফিরে আসবে বলে, ওই মুখগুলোতে কি নিজের সন্তানের মুখ বসিয়ে দেখেছেন কী বেদনা, কী কষ্ট! এতো এতো কিছু দিয়ে কী হবে যদি জীবনের নিরাপত্তাই না থাকে!

ঢাকার রাস্তায় পাবলিক ট্রান্সপোটের যে দুর্দশা রাস্তায় না চলাচল করলে বোঝা যাবে না। মাঝখানে কিছু সময় সকল রুটে সিটিং সার্ভিস চালু হয়েছিল। কিন্ত এখন অধিকাংশ রুটেই অবস্থা করুণ। রাস্তায় যে গাড়িগুলো চলে সেগুলো বাইরে থেকে দেখলেই বোঝা যায় সেগুলো আদৌ চলার যোগ্য কিনা। অথচ কী এক অদৃশ্য কারণে এগুলো দিনের পর দিন চলে। যারা ড্রাইভিং সিটে বসে থাকে তাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে কিনা মাঝে মাঝে চেক যে হয় না তা নয়, কিন্তু তারা পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে যায়, কারো কারো পকেট ভারী করে আবার রাস্তায় সদর্পে গাড়ি চালায়।

ফেসবুকে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে যে একজন কিশোর গাড়ি চালাচ্ছে। ঢাকায় লেগুনাগুলো যে চলে, তাদের ড্রাইভার অধিকাংশ বয়সে কিশোর। তারা দিনের পর দিন এই ড্রাইভিং করছে এবং মানুষ চড়ছেও তাতে। তাদের কি আদৌ লইসেন্স আছে, নাকি বিভিন্ন জায়গায় মাসোহারা দিয়েই লইসেন্স ছাড়াই চলে যাচ্ছে? অথবা কতসংখ্যক এরকম ড্রাইভার এভাবে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে? কীভাবে তার মনিটরিং হচ্ছে, দোষীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? যাদের এগুলো দায়িত্ব এগুলো দেখার তারা ব্যর্থ হলেও বহাল তবিয়তে স্বপদে থাকছে।

আমি কোন সেবা না পেলে আমার নিরাপত্তা না দিতে পারলে আমি আপনার বেতনের জন্যে আমার ঘাম ঝরানো পয়সা আমি কেন দেব?

একজন ড্রাইভার যখন এই ড্রাইভিং সিটে বসে তখন তার সাথে অনেকগুলো জীবনের নিরাপত্তা জড়িত থাকে। তাহলে লাইসেন্স কারা পাবে সেটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। ড্রাইভারকে মানবিক হতে হবে, নেশাগ্রস্ত হবে না, তার জন্যে নির্দিষ্ট কর্মঘন্টা থাকবে, তার একটি ভালো বেতন থাকবে। আমাদের দেশে আপনি কখনো গাড়ি না চালানো শিখেও লাইসেন্স কিনতে পারবেন। এগুলো দেখার কি কেউ আছে?

আজ ছোট ছোট বাচ্চাগুলোকে রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে দীর্ঘদিনের চলে আসা অনিয়মের ফলে ঘটে যাওয়া তাদের সহপাঠীদের হত্যা। আর এগুলো ঢাকতেই ছোট ছোট বাচ্চাগুলোর রক্ত ঝরানো লাগছে। এই যে আমার ঘামের পয়সা দিয়ে রাষ্ট্রকে দেই, কেন দেই? রাস্তায় মরবো বলে? আর মহাশয়েরা সেটি দাঁত মেলে অন্যদেশে কত কত মানুষ মারা যান তার হিসাব দিয়ে প্রমাণ করতে চান আমরা কত নিরাপদ আছি, আমাদের দেশে তো আর এতো মানুষ মরেনাই! আমাদের সন্তানদের দাঁড়াতে হয় তাদের নিরাপত্তা চেয়ে। আর আমাদের ঘামের পয়সায় বেতন পাওয়া একদল পুলিশ তাদের কলার ধরে, পেটায়।

যে শিশুরা আজ রাস্তায় তাদের ভরসা, আশ্বস্ত করেন। পিটিয়ে কখনো কিছু রক্ষা হয়নি কোন কালে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতিবছর ২০ থেকে ২১ হাজার লোক যদি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়ে থাকে, র্পাঁচ বছরে তা ১ লক্ষ। ২০ বছরে সংখ্যা কত? আর লক্ষ লক্ষ লোকের পরিবারে সর্বনিম্ন তিনজন করে লোকও যদি ধরি, তাহলে কত কত মানুষের দাবি নিরাপদ সড়কের, একবার ভাবুন।

কোন সিজনাল শিশু অধিকার সংগঠন, হাওয়া বুঝে চলা নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের সংগঠন শিশুদের এই আন্দেলনে না থাকলেও সড়ক হত্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সকল মানুষ এই দাবির সাথে আছে। সড়কে হত্যা এখনই থামান।

শেয়ার করুন:
  • 381
  •  
  •  
  •  
  •  
    381
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.