যদি রুখে দাঁড়াও, তবে তুমি বাংলাদেশ

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী:

কুর্মিটোলায় বিপথগামী বাসের নিচে প্রাণ হারানো দুই কলেজ ছাত্রের সহপাঠীরা রাজপথে নেমে এসেছে। তাদের সাথে সংহতি প্রকাশ করে নেমে এসেছে আরও অন্তত ত্রিশটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের দায়িত্বহীন মন্তব্য এবং বেফাঁস হাসিকে কেন্দ্র করে ক্ষোভে ফুঁসছে ছাত্র-জনতা। গত দুদিন ধরে ওরা বৃষ্টিতে ভিজছে। পুলিশের লাঠিচার্জে রক্তাক্তও হয়েছে সেই বাচ্চাগুলো, যাদেরকে আমরা সেলফি, ফেসবুক, ইউটিউব আর পিৎজার দোকানে চেক ইন করা ফার্মের মুরগি প্রজন্ম বলে চিনে আসছি।

বাতাসে সীসার বিষ, খাবারে ফরমালিনের বিষ, খেলার মাঠের জায়গায় কেবল বহুতল নাগরিক বস্তি, অনিরাপদ সড়কপথ – যেখানে প্রাণ হাতে নিয়ে আমাদের নিত্য যাতায়াত। স্কুলের অবাস্তব সিলেবাস শেষ করতে চৌদ্দ মণ ওজনের ব্যাগের ভারে ধনুকের মতো বেঁকে যাওয়া পিঠটা নিয়ে কোচিং এর পেছনে ছোটার পরে বাড়ি এসেও প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়া নামক অত্যাচার কোমলমতি কাঁধে-পিঠে চাপিয়ে দিয়েছি আমরা! আমরাই তো!

আমরা অভিভাবকরা কম যাই কীসে? জিপিএ ৫, গোল্ডেন এ+ ছাড়া কোনো রেজাল্ট না হলে ছেলেমেয়ে আত্মহত্যা করে মরুক তাও সই, তবু এর নিচে কোনো ফলাফলে যে আমাদের মান রক্ষা হবে না! এই কোচিং আর জিপিএ ৫ এর চাপে পিষ্ট হয়ে ছেলেমেয়েদের সাংস্কৃতিক চর্চা চুলোয় যাবার পথে।

আমাদের শিশুরা ফার্মের মুরগি শুধু না, ওরা আমাদের গিনিপিগ! আমরা আমাদের সন্তানদের আদৌ মানুষ করতে চাই নাকি রোবট বানাতে চাই?

কোনো সভ্য রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থায় শিশুদের এভাবে গিনিপিগ বানিয়ে তাদের শৈশব – কৈশোরের স্বর্ণসময়গুলো গলা টিপে হত্যা করা হয় কিনা আমার জানা নেই। তবুও আমাদের সন্তানেরা ওদের শরীর, মন এবং বয়সের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এই অব্যবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য অমানুষিক চাপ সহ্য করে যাচ্ছে। প্রাণপণ চেষ্টা করছে নিজেকে মেধাবী প্রমাণের, যেখানে মেধা নিরূপণের গোটা সিস্টেমটাই ত্রুটিপূর্ণ।
প্রতিদিন তাদের মনন পিষ্ট হচ্ছে এলিয়েন তৈরির মগজধোলাই কারখানায়।
আর হাত- পা- মগজ পিষ্ট হচ্ছে বিপদসংকুল সড়কে বেপরোয়া যানবাহনের চাকার নিচে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যে জাতি হেলাফেলা করতে পারে, তাদের জীবনের নিরাপত্তা না দিতে পারার মতো ব্যর্থতায় যখন দায়িত্বরত জনপ্রতিনিধি জনসম্মুখে নির্লজ্জ হাসি -তামাশা করতে পারে – তারপর দেয়ালে পিঠ ঠেকার আসলে কীইবা বাকি থাকে! আমরা আমাদের সড়ক- মহাসড়কে প্রাণ হাতে নিয়ে চলাচলে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। দুই বা ততোধিক বাসের গা ঘেঁষে ওভারটেক বা পাল্লাপাল্লির জের ধরে কম তো মায়ের বুক খালি হয়নি এযাবৎ!

ট্রাফিক আইনকে থোড়াই কেয়ার, লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালক – হেল্পারের দৌরাত্ম্য কিংবা ক্ষমতাধর ধনীর দুলালের অনিয়ন্ত্রিত বাহাদুরির কাছে জিম্মি পথচারীদের জীবন। প্রতিদিন অক্ষত দেহে, প্রাণ নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারাটাই যেন এক মহা সৌভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের কাছে।

সহপাঠীর মৃত্যুশোকে এবং সড়কে মানুষ হত্যার বিচারের দাবিতে ছাত্রদের “নিরাপদ সড়ক চাই” – কোনো অন্যায় দাবি নয়। অন্যায় – সড়কে মানুষ হত্যা রোধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা না গ্রহণ করা। অন্যায় – সন্তানহারা পিতার হাহাকারের জবাবে হায়নার মতো বিকট বেশরম হাসি। ঘাতক বাসচালক হত্যা করেছে তরতাজা তরুণ প্রাণ। আর এই দানবীয় হাসি হত্যা করেছে সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে। এই বেহায়া হাসি কেবল জনসাধারণের প্রতি চরম অবজ্ঞাই প্রকাশ করেনি, বিদ্রূপ করেছে আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতাকে।

আমাদের সন্তানেরা রাস্তায় নেমে এসেছে, এর দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। দেশকে এগিয়ে নেয়া, জাতির ভবিষ্যৎ এই শিশু-কিশোরদের মৌলিক চাহিদাসমূহের অন্যতম তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এটাও মনে রাখা জরুরি যে, দেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব কেবল মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নয়, সকল জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, শিক্ষক সম্প্রদায় এবং অভিভাবকবৃন্দকে সংকল্পবদ্ধ হতে হবে।

শিশুদেরকে ক্লাসরুমে ফিরিয়ে নিতে হলে তাদের কথা সরকারকে, প্রশাসনকে শুনতে হবে। তাদের নয় দফা দাবি বিবেচনা করুন। এই বাচ্চাগুলো স্কুল – কলেজ শেষে মায়ের কোলে ফিরতে চেয়েছে, নিরাপদ সড়ক চেয়েছে। ওদের গায়ে হাত তোলা, পুলিশী নির্যাতনে রক্তাক্ত করার মতো বর্বরতা দেখাবেন না। রুখতে হলে শিশু- কিশোরদের ন্যায্য আন্দোলনকে নয়, সড়কে মানুষ হত্যাকারীকে রুখুন, রুখে দিন জল্লাদের হাসি।

মনে রাখবেন, ওরা আন্দোলনে নেমে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা উচ্চারণ করেছে – বাংলাদেশে আজ যে আদর্শের সত্যিই বড় প্রয়োজন!

“যদি তুমি ভয় পাও, তবে তুমি শেষ
যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তবে তুমি বাংলাদেশ”

– এই শ্লোগান উচ্চারিত হয় যাদের কণ্ঠে – কে বলে সে নবীন প্রজন্ম অপরিণত, ফার্মের মুরগি? নিরাপদ সড়কের দাবিতে এ আন্দোলন ওদেরকে কোথায় নিয়ে যাবে জানি না। তবে এই শ্লোগান ইতিহাসে স্থান করে নিলো নিশ্চিত।
ওদেরকে শুনুন, বাংলাদেশকে শুনুন।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.