পুণাতি বা পূর্ণার না বলা কথা

0

তন্দ্রা চাকমা:

আমার জন্ম হয়েছিল স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হতে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আর দশটা শিশুর মতো আমিও স্বপ্ন বেচে, মহাশূন্যের মহাযাত্রী হতে চেয়েছিলাম। এই বোধ হয় আমার অপরাধ। আমার স্বপ্ন পূরণের আগে, আমার শরীরের কথা শোনা ও বুঝার আগে আমাকে চার নরপশু শেষ করে দিল। আমার মাত্র ৯ বছর, আমি কি একা একা তাদের সাথে পেরে উঠি? কিন্তু তবুও একটু আশায় বুক বেঁধে চিৎকার একটা দিয়েছিলাম। কিন্তু সেটা আশেপাশের কারো কাছে যাওয়ার আগে সব শেষ হয়ে গেল।

শরীরের যে অংশ দিয়ে সবাই পৃথিবীর আলো দেখে, সেই অংশে ওরা ইচ্ছে মত ক্ষত বিক্ষত তো করেছে, আর সব শেষে যেটা করেছে সেটা আরও নির্মম। ওরা সেখানে চ্যালা কাঠ দিয়ে ইচ্ছে মতো খুঁচিয়েছে। আমার একটাই অপরাধ, আমি কন্যাশিশু, আমি ত্রিপুরা আদিবাসী শিশু এবং আমি পড়াশুনা করছি ও আলোর পথে হাঁটছি।

হ্যাঁ, আমি সেই আমি। আমার নাম পুণাতি ত্রিপুরা ওরফে পূর্ণা ত্রিপুরা। আমি জানি আমাকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য সরকার আছে। সরকারের বিশেষ বাহিনী সরকার বাহাদুর অন্যান্য অনেক এলাকার চাইতে বেশি। তাহলে আমি এভাবে মরলাম কেন? আপনারা বলুন।

আমার মা খুব বড়লোক নয় যে তোমাদের মতো আমাকে নামী-দামী বোর্ডিং স্কুলে রেখে পড়াবে। আমি জানি আমার এই নয় মাইল এলাকার কাছাকাছি স্কুল আমার স্বপ্ন পূরণের জন্য যথেষ্ট। শুনেছি আমাদের দেশ নাকি আগামী ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে। উন্নয়ন সেটা আবার কী? প্রশ্ন হলো, মা কেন এখনও জুম চাষ করে? আমাকে কেন গ্রামের নির্জন রাস্তায় একা একা স্কুলে আসতে হয়? আমার স্কুল কেন আমার বাড়ির কাছে নয়? আমি লেখাপড়া করতে পারলে আমার দেশ উন্নয়নের গাড়িতে চড়তে পারবে সে কথা আমি জানি। তাই দেশকে ভালবাসি বলে একা একা ভয়কে জয় করে স্কুলে আসি। কিন্তু তোমরা আমাকে সেটা করতে দিলে না। কারণ তোমরা দেশকে ভালবাসো না, তোমরা চাও না আমি শিক্ষিত হই। আমি স্বপ্ন দেখি।

উপরের কথাগুলো পুণাতি বলেনি। বলার সুযোগ পায়নি। কিন্তু সে না বললেও আমি জানি এগুলো তার কথা। এদেশের প্রতিটা আদিবাসী শিশুর কথা। আমি আজ থেকে ১৮ বছর আগে পুণাতির গ্রামে অফিসের কাজে অনেকবার গিয়েছি। আমি জানি গ্রাম থেকে মেইন রোডের রাস্তা অনেক দূর, অনেক নির্জন। আর ১৮ বছর আগে এই রাস্তা যেমন ছিল তেমনি আছে। এতোটুকু উন্নয়নের ছোঁয়া পায়নি। বাজি ধরে বলতে পারি আগামী ২০২৪ সালে একই রকম থাকবে। তাকে ছাড়িয়ে সাজেক ভ্যালী অনেক এগিয়েছে। সাজেক ভ্যালীর বাইপাস রোড হোল এই নয়মাইল।

তন্দ্রা চাকমা

আমি আমার লেখার মাধ্যমে আবেদন জানাবো যদি কেউ এই হত্যাযজ্ঞ না চায় তাহলে বিচার প্রক্রিয়া ও প্রশাসন যাতে ঠিকভাবে কাজ করে সেদিকে নজর দিক।

এছাড়া পুণাতির মতো শিশুরা যাতে নিরাপদে শিক্ষা নিতে পারে সেই ব্যবস্থা নেয়া হোক। তাদের জন্য কি হতে পারে না অনলাইন স্কুল? বিদ্যুৎ বাবু নেই তো কী হয়েছে? সোলার প্যানেল কি করা যাবে না হাজার হাজার পুনাতির জন্য?

আমি এতো কিছুর পরেও আশাবাদী। আমাদের দেশে কয়েক শ সংস্থা আছে যারা আন্তরিক হলে এটা সম্ভব। তাদের কর্মীদের সময় না হলে আমি আছি, এসব যাতে ঠিকভাবে চলে তা দেখার জন্য।

আর যেন কোন পুণাতি হারিয়ে না যায়। আলো আসুক সবার মনে।

শেয়ার করুন:
  • 1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1K
    Shares

লেখাটি ২,০৭২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.