মা-বাবারা কি এখনও দাঁড়িয়ে দেখবেন?

0

সুপ্রীতি ধর:

আমারই এক সন্তানের হাতে প্লেকার্ডে লেখা, ‘মা, তুমি আমার জন্য আর অপেক্ষা করো না। আমি আর ঘরে ফিরবো না।’ তাকিয়েই ছিলাম হাতে তুলে ধরা লেখাটার দিকে, যেন আমাকেই সে বলছে, মা, আমি আর ফিরবো না। আমার পেটের ভিতরে নাড়ি, তাতে যেন কম্পন উঠলো, কান্নাটা গলায় দলা পাকিয়ে গেল। ও তো আমারই সন্তান, আমারই ছেলে সৌম্য। আমাকেই তো একথা বলছে সে। ছেলেটি আমার বন্ধুহত্যার বিচার চাইতে রাস্তায় দুদিন ধরে পড়ে আছে।

আমি আর ঘরে ফিরবো না….কেন লিখছিস এই কথা? বাবা, তোদের যে ফিরতেই হবে ঘরে, মায়েরা সব অপেক্ষায় আছে। তবে তোদের ভেতর থেকে মনুষ্যত্ব যে মুছে যায়নি, এটাই আমাদের পরম পাওয়া।

ছবিতে দেখলাম পুলিশ ওদের মেরে রক্তাক্ত করে দিচ্ছে। ওদের হাতে গভীর ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছে। আপনি/আপনারা কেমন বাবা-মা, তারপরও চুপ করে বসে আছেন? আমার এই বাচ্চাদের গায়ে যারা হাত তোলার স্পর্ধা দেখাচ্ছেন, আমি তাদের বলছি, এই হাত আমি ভেঙে দেবো। মায়েদের আসুরিক শক্তির কথা মনে হয় আপনাদের জানা নেই। সন্তানের গায়ে হাত তুলে আপনারা কেউ পার পাবেন না। একবার আমরা মাঠে নেমে এলে আপনাদের প্রিয় মসনদ কেঁপে উঠতে বাধ্য।

এমন হাজারও ছেলে আমার আজ রাস্তায়। আমি মা। আমরা যারা মা-বাবা, তাদের ভিতরে কি সন্তান হারানোর বেদনা বাজছে না? আমরা তারপরও কেন ঘরে বসে আছি? কেন ছেলেদের হাত ধরে, ওদের বুকে চেপে দাঁড়াচ্ছি না রাস্তায়?

মলি জেনান লিখেছেন, আজ যে তারুণ্য বিক্ষোভে ফেটে পড়বে না, সে আর কোনদিনই জাগবে না।
সে মৃত ফসিল মাত্র….।
সত্যি কথাই তো। প্রতিবাদে শামিল হওয়ার এই তো সময়। এই একটি প্লেকার্ডের ভাষাই তো সবাইকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবার কথা অন্যায়ের বিরুদ্ধে। কিন্তু আপনারা কোথায় আজ সব।

যে পিতাটি তার কন্যাকে হারিয়ে বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে আছে, আমি তার ভিতরটা মরে যেতে দেখছি। সেইসাথে আমিও মরছি একটু একটু করে। সন্তান হারানোর কষ্ট কতোটা পেলে মানুষের এমন নির্বাক দৃষ্টি হয়, কেউ বলতে পারবেন? যে মা তার কন্যা বা ছেলেকে হারিয়ে ঘরে এসে আর্তনাদ করছে, তার ভিতর-বাহির সব বেরিয়ে আসছে কান্নার দমকে, আমরা উপলব্ধি করতে পারছি? তাহলে কেন চুপ করে আছি? কেন সেই মায়ের কাঁধে হাতটি রাখছি না আমরা? কেন আমরা শত শত, হাজার হাজার মা বেরিয়ে আসছি না রাস্তায় সন্তান হত্যার প্রতিবাদে?

বিচার চাইতে গেলে দুজন হত্যার বিচার চাওয়া যাবে না? ৩৩টা লাশ লাগবে? ওই নরপিশাচ নৌ পরিবহন মন্ত্রীর ওই দানবীয় হাসির উত্তর তোরা দিবি বাবারা, এই আমার অনুরোধ।

আমরা কি অপেক্ষা করছি কবে আমার ঘরে শোক আসবে? নিজের সন্তানকে আগলে রেখেছেন, গাড়িতে চড়িয়ে বাইরে পাঠান, ভাবছেন, নিরাপদে আছেন? সত্যিই নিরাপদে আছেন? পড়েছেন তামান্না সেতুর লেখাটা? পড়েননি। যান পড়ে আসেন। যে সন্তান আজ নিরাপদে আছে আপনার ঘরের অভ্যন্তরে, সে নিরাপদ নয়। কতোভাবে সে নাই হয়ে যেতে পারে। কন্যা হলে ধর্ষণের শিকার হতে পারে। এতোবড় যে ব্যবসায়ী লতিফুর রহমান, তিনি কি পেরেছিলেন তার মেয়েকে বাঁচাতে? পারেননি। আপনিও কিন্তু পারবেন না। মেয়ে হলে ধর্ষণ হবে, হত্যা হবে, তার যোনিপথে গাছের গুড়ি ঢুকিয়ে দেয়া হবে, হাত কেটে দেয়া হবে, যৌতুকের বলি হবে, আরও কতোকী!

ছেলে সন্তান বলে ভাবছেন, যাক্ বাবা, মেয়ে তো নেই, নিরাপদে আছি! না, আপনার ছেলের পকেটে ইয়াবা গুঁজে দিয়ে ফাঁসিয়ে দিতে পারে যেকোনো মুহূর্তে, খবরও পাবেন না ক্রসফায়ারে দেয়ার আগ মুহূর্তেও। আমিনবাজারে সেই যে ছয়টা ছেলেকে শবেবরাতের রাতে স্রেফ ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে মেরেছিল গ্রামবাসী, মনে আছে সেই ঘটনা? এখনও মনে হলে আমার গাঁয়ে কাঁটা দেয়। সেই থেকে আমি আমার ছেলেকে নিয়ে তটস্থ জীবনযাপন করেছি। রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে বাসার নিচের দোকানদার সবাই এখন ইয়াবা সাপ্লায়ার। আপনি কোনদিকে ছেলেকে আটকাবেন? আপনি জানেন, ছেলে আপনার কোচিংয়ে যাচ্ছে। আসলেই কি যাচ্ছে?

এই রক্ত আমার সন্তানের, এই রক্ত আমার গর্ভের। আমি মা, আমরা মা, তারপরও কেমন নির্লিপ্ত হয়ে আছি….আমার সন্তান মার খেয়ে যাচ্ছে, ওদের ছোট ছোট শরীরে যখন পুলিশ তার সমস্ত শক্তি দিয়ে আঘাত করছে, তখন তো ওরা আমাদেরকেই ডাকছে, আমরা কি শুনতে পাই না? পাচ্ছি না?

একটা সত্য ঘটনা বলি। আমার ছেলে কারও সাতেও নেই, পাঁচেও নেই। কারও সাথেই মেশে না ধরতে গেলে। কমপ্লেক্সে ভোগে। সেই ছেলেও একদিন এডিক্টেড হয়ে গেল। আমার ঘর থেকে দুই-দুইটা ল্যাপটপ হাওয়া হয়ে গেল। পুলিশ এলো। কিছুই বের করতে পারলো না। পরে অনেকদিন পরে জানতে পারলাম, ওর দুই বন্ধু মিলে এই কাজটি করেছিল। ও নিজেও জানতো না। যাক্, ল্যাপটপের ওপর দিয়ে গেছে ভেবে সান্ত্বনা পেলাম, কিন্তু হুঁশিয়ার হলাম ওর ব্যাপারে। ছেলে তো পেটের সন্তান। ওকে ফেলে দিতে তো পারি না। অনেক কষ্টে তাকে বের করে আনলাম সেই পথ থেকে। পথটা কিন্তু অনেক কঠিন ছিল। বিশেষ করে আমি যখন সিঙ্গেল মা, যখন আমার পাশে কেবল আমিই নিজে, তখন দাঁতে দাঁত চেপে সেই সময় পার করেছিলাম। জানি না কতোটুকু পার পেয়েছি, তবে সময়ই বলে দেবে।

সেতু লিখেছে, জান্নাতের আশায় ছেলেকে নামাজে পাঠাতেও ভয়। যদি হোলি আর্টিজানের মতোন কিছুতে জড়িয়ে যায় ধর্ম পালনের নামে! সত্যিই তো! কোনদিকে যাবেন আপনি আজ? মাদক ব্যবসা আর ধর্ম ব্যবসা দুটোই জমজমাট আমাদের দেশে। চোরদের রাজত্বে কোনো ন্যায়বোধ, দেশাত্মবোধ কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। প্রশাসন নিজে এসবের সাথে জড়িত। দেখেননি কক্সবাজারে বদিকে নিয়ে কী হলো? এরপরও চোখ খুলতে বাকি আপনাদের? মাদক সম্রাট বদিকে এই সরকারই রোষানল থেকে বাঁচাতে ওমরাহ করতে পাঠিয়ে দিয়েছে। কতোটা নির্লজ্জ আর বেহারা সরকার হলে মানুষের জীবন নিয়ে, আমাদের সন্তানদের নিয়ে এমন খেলা খেলতে পারে! আজ যদি এরকম শত শত বদিকে ধরা হয়, বন্ধ করা হয় মাদক ব্যবসা, বন্ধ করা হয় আত্মীয়করণের নামে সড়কের এই হত্যা হত্যা খেলা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধ করে যদি সুদক্ষ, প্রশিক্ষিত চালকদের হাতে রাস্তায় ভার দেয়া হয়, তবেই না আপনি বাসায় ফিরে সন্তানকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে যাবেন!

পরশু থেকে নানামুখি উত্তেজনা, অস্থিরতায় কাটছে আমাদের অধিকাংশ মানুষের জীবন। যদি আমরা নিজেদের মানুষ বলে দাবি করি, তাহলে এই অস্থিরতা থেকে নির্লিপ্ত থাকার উপায় আমাদের জানা থাকার কথা না। সন্তানরা রাস্তায়, মার খাচ্ছে পুলিশের, ওরা প্রতিবাদে মুখর হয়েছে, স্কুল-কলেজ থেকে ওপর মহলের চাপে টিসি দেয়ার নির্দেশও আসছে, তারপরও সন্তানরা আমাদের রাস্তায় বসে আছে। এই জনস্রোত রুখে দেয়া এতো সহজ নয়।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

প্রচণ্ড সত্য একটি কথা আযম খান লিখেছে, একজন বাবা দাঁড়িয়ে আছেন সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে। তিনি সেখানে একা। তার পাশে কেউ নেই। যাদের সন্তানেরা এখনো বেঁচে আছে তারা কেউ পাশে দাঁড়াবার প্রয়োজন বোধ করেন নাই, এগিয়ে আসেন নাই। যতক্ষণ নিজের কোনো প্রিয়জন না হারাবেন এভাবে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করবেন না। তখন তারাও একা দাঁড়াবেন। কেউ পাশে থাকবে না। এ এক স্বার্থপরতার লুপহোলে আটকে গেছে বাংলাদেশের মানুষ।

এখনও বলছি। মা-বাবারা, আপনাদের কাছে হাতজোড় করে বলছি, প্লিজ একটিবার সন্তানের পাশে দাঁড়ান। ওরা শক্তি পাক আপনাদের কাছ থেকে। ওরা মায়ের কাছে ফিরবে না তো কার কাছে ফিরবে? বুক পেতে দিন ওদের কাছে। ভালবাসা দিন। আর যে মেয়েটি চলে গেছে, যে ছেলেটিকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি, তাদের মা-বাবাদের জড়িয়ে ধরুন। বলুন, এই যে হাজার হাজার সন্তান তোমাদের আজ জেগে আছে, এরাই তোমাদের সন্তান।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.6K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.6K
    Shares

লেখাটি ২,৩৩২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.