গল্পের জাদুকরের প্রয়াণ দিবসে দুই নারীর প্রতি শ্রদ্ধা

0

সাদিয়া রহমান:

গল্পের জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ চলে যাওয়ার ছয় বছর হয়ে গেলো। দেশের এই লেখকের প্রসঙ্গ উঠলেই যে দুইজন মানুষের নাম সাথে সাথেই এসে যায় তা উনার দুই সহধর্মিনী গুলতেকিন খান এবং মেহের আফরোজ শাওন। লেখকের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে প্রায়ই জনসাধারণ ছন্দ হারায়। সেই হারানো ছন্দে মিলিয়ে যায় দুটি স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্ত্বা। হয়তো এমন একজন ব্যক্তিত্বের সাথে জড়ালে তার ছায়ায় পড়ে যাওয়াও স্বাভাবিক। কিন্তু এরপরেও দুইজনকে স্ব স্ব সম্মানে স্বীকার করে নেয়াটাও কর্তব্য।

যেকোনো মানুষের কর্মজীবন, ব্যক্তিগত জীবন আলাদা হয়। সেই মানুষ যদি সৃজনশীল কোনো ব্যক্তি হোন তবে ব্যক্তিগত আর কর্মজীবনের সাথে আরেকটি সত্তা সৃষ্টিশীল সত্ত্বা যুক্ত হয়। ক্ষেত্রগুলো একে অন্যের ওপরে ওভারল্যাপ করতেই পারে, কিন্তু একটা দিয়ে অন্যটিকে বিচার করা যায় না। তাই একজন লেখক তার ব্যক্তিগত জীবনে কী করলেন, কোথায় গেলেন, কীভাবে চললেন তা নিয়ে সাধারণের আগ্রহ থাকলেও তা কখনো তার কর্ম বিচারের মাপকাঠি হতে পারে না।

আমাদের সমাজে যেহেতু এই পার্থক্য বজায় রাখার চল নেই সেহেতু আমরা সব গুলিয়ে ফেলি। ক,খ,গ, ঘ সব একসাথে ঘেঁটে দিতে যাই। যখনই সব জগা খিচুরি করতে যাই, চলে আসে পক্ষ-বিপক্ষ, দলাদলি, কাঁদা ছুড়াছুড়ি। ঠিক যেমনটা হয়েছিলো এই ক্ষেত্রেও। যেহেতু আমরা সবকিছু গুলিয়ে ফেলি সেহেতু আমাদের একটা পক্ষ নিতে হয়। একটা পক্ষ নিলে সেই পক্ষ সমর্থন করতে হয়। সেটা করতে গিয়ে অন্ধত্ব আসে, গোড়ামী আসে, অপমান করার প্রবণতা আসে। যেগুলোর আসলেও প্রয়োজন আছে কিনা তা বলা যায় না।

প্রয়াত লেখকের প্রথম দিকের লেখায় তাঁর প্রথম স্ত্রী গুলতেকিন খানের কথা বার বার এসেছে। অভাবের সংসার, টানাপোড়েনের মাঝে প্রতিষ্ঠার আনন্দ এসেছে। প্রবাস জীবন এসেছে, প্রবাস জীবনে গুলতেকিনের সংগ্রাম এসেছে। গুলতেকিনের অপরূপ সৌন্দর্য্য এসেছে, একটা চিঠি পড়ে সব ফেলে রেখে তাঁর একা বিদেশে পাড়ি জমানো এসেছে।

আবার শেষ দিকের লেখাতে এসেছে মেহের আফরোজ শাওনের কথা। তাঁর গুণের কথা, তাঁর গায়িকা সত্ত্বার কথা। এসেছে সমাজের বিরুদ্ধে যেয়ে চোখের জল ফেলে একা বিয়েতে বসার কথা। পরের দিকের লেখায় এসেছে একজন শাওনের ওপরে লেখকের নির্ভরশীলতার কথা।

লেখক বেঁচে থাকতে এবং চলে যাবার পর এই দুই নারী নিয়ে কম আলোচনা সমালোচনা হয়নি, পক্ষ-বিপক্ষ টানাটানি সবই এখনও হয়। কিন্তু কেনো? কেনো আমাদেরকে যেকোনো একজনের পক্ষ নিতেই হবে? কেনো আমাদেরকে এই দুই নারীর একজনকে বেছে নিতেই হবে? কেনো একজনকে অপর জনের মুখোমুখি দাঁড় করাতেই হবে?

ব্যক্তিগত জীবনে কবি গুলতেকিন খানের গুণের অভাব আছে কি? এমন টানাপোড়েন এর মাঝেও সন্তানদের কাছে যিনি “আয়রন লেডি” হিসেবে পরিচিত, তাঁকে বিচার করার যোগ্যতা আমাদের আছে কি? তাঁর জীবন দর্শন নিয়ে যদি উনি লেখেন, তা দার্শনিকের কথনই হবে না কি?

অপরদিকে মেহের আফরোজ শাওন একজন নতুন কুঁড়ি খ্যাত শিল্পী ব্যক্তিত্ব, তাঁরও রূপের তো কোনো কমতি নেই। এটিএন বাংলার নাদিম জয়ের অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্য অন্তত এই সাক্ষ্যই দেয় যে তাঁর পথও কন্টকময়ই ছিলো। সে অনুষ্ঠান না দেখলে এখনো অনলাইনে বিভিন্ন সংবাদের নিচে বা ছবির নিচে মন্তব্য পড়লেই তাঁকে আমরা কোন অবস্থায় রেখেছি তা স্পষ্ট হয়ে যাবে।

ব্যক্তিগত জীবনে তাদের দ্বন্দ্ব কোথায়, তা আছে কী নেই, থাকলে কোথায় আছে, কেনো আছে, তা আমাদের পাঠ্য বস্তু না। কোন অবস্থানে কে, কীভাবে প্রতিক্রিয়া করেছিলেন তা কতটা ঠিক ছিলো বা বেঠিক ছিলো বাইরে থেকে আমরা সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে দেবার কেউ না। প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কি করেছিলেন না করেছিলেন তা আমরা জানি না তাই বিচারকের আসনেও বসতে পারিনা।

এত কথা বলার একটাই কারণ। প্রিয় লেখককে আমরা তাঁর সবটা নিয়েই গ্রহণ করেছি বলে ভাবলেও আসলে তা সত্য নয়। যতদিন তাঁর জীবনের দুই ভিন্ন সময়ের দুই নারীকে মুখোমুখি দাঁড় করানো না থামাবো, ততদিন তাঁকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদাটা হয়তো দেয়া হবে না।

পাঠক, জনতার ভালো লাগুক বা না লাগুক এই দুইজন স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন দুজন নারী যেমন আপন মহিমায় উজ্জ্বল, তেমনই আমাদের লেখকেরও অংশ। যতদিন এটা না মেনে নেয়া হবে ততদিন তাঁর সম্পূর্ণটা নিয়ে তাঁকে ভালোবাসা হবে না।  তাই এই প্রয়াণ দিবসে বিশেষভাবে ভালোবাসা, সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাই তাঁর সাথে জীবন ভাগ করে নেয়া দুইজন নারীকে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 173
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    173
    Shares

লেখাটি ১,১১৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.