মেয়েরা মেয়ে নয়, নিজেকে মানুষ ভাবতে শিখুক

0

রিমা লিমা:

অনেকদিন আগে সানন্দায় একটা বিতর্ক পড়েছিলাম, “মেয়েরাই মেয়েদের আসল শত্রু”; পড়ে খুব মজা লেগেছিল। আমরা যারা পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছি এবং কর্মক্ষেত্রে যোগদানে পরিবারের পূর্ণ সহযোগিতা পেয়েছি, আমরা খুব ভাগ্যবতী নিঃসন্দেহে।

এর ব্যতিক্রমও কম নয়। অনেকেই বাধ্য হোন মাঝপথে পড়াশোনার পাঠ চুকাতে! হতে হয় পুরোদস্তুর একজন গৃহিণী! আবার কারও চাকরি জীবনের সমাপ্তি টানতে হয়। একটি মেয়ে কত সহজে হার মেনে নেয়। তার শিক্ষা, তার কর্মময় জীবন শেষ হয় শুধুমাত্র সংসার জীবনে প্রবেশ করার জন্য!

আমার কিছু বিবাহিতা সহপাঠী ছিল যারা খুব গর্ব করে বলতো, “পড়াশুনা করছি যাতে মাস্টার্স করেছি এটা বলতে পারি, আর আমার স্বামীর অনেক টাকা তাই কোন দুঃখে চাকরি করবো!” ওরা দিব্বি শুধু পার্লার, ফ্যাশন, বেড়াতে যাওয়া, নতুন শাড়ি গহনার হিসাব করেই সময় কাটিয়ে দিত। আবার আমাদের মধ্যে অনেকেই শুধুমাত্র কে পুরাতন ফ্যাশনের জামা পরে, কার মেকাপ সেন্স কত খারাপ, সেই সমালোচনায় মুখর হতেই দেখেছি। অনেকেই ছিল যাদের নিত্যনতুন হাল ফ্যাশনের জামা, জুতো আর বাহারি ব্যাগ দেখে অবাক হতাম। ভাবতাম ওরা এতো সময় কীভাবে পায়! এরা আবার একটা দল ছিল। তারা সবসময় একসাথে থাকতো। ভাবটা এমন ছিল আমরা যারা অতি সাধারণ বা দামি কাপড় পরি না, বা সামর্থ্য রাখি না, তারা ওই দলটির সাথে মেশার যোগ্যই নই।

কলেজে যখন ছিলাম সবসময় মহিলা শিক্ষিকাদের ভয়ে তটস্থ থাকতাম। কলেজে একমাত্র ইংলিশ সাহিত্য পড়াতেন শ্রদ্ধেয় রদরিজ স্যার। কেন যেন স্যারকে কেও ভয় পেতাম না। পড়া না পারলে হেসে বলতেন, “পরীক্ষা সামনে তাই মনোযোগী হও।” যদি ফাইনাল পরীক্ষাতে এক্সটারনাল হিসেবে কোনো নারী শিক্ষিকা আসতেন তো কথাই নেই। একবার মনে আছে আমরা রোল নাম্বার অনুযায়ী ক্রমানুসারে দাঁড়িয়েছিলাম একের পর এক কার ডাক আসে সেই প্রতীক্ষায়। আর বাইরে থকে ভিতরের কথোপকথন আর শিক্ষার্থীর নাস্তানাবুদ হওয়ার সাক্ষী হয়ে মনে মনে দোয়া পড়ছিলাম যেন আমার প্রতি শ্রদ্ধেয় শিক্ষিকা কিছুটা সদয় হোন! খুব মনে আছে একবার যখন আমার এক বান্ধবীকে ডাকা হলো, ভয়ে সে বিষম খাচ্ছিল, একপর্যায়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, এই আমার নাম কী …কারণ সে তার নিজের নামটি ওই মুহূর্তে ভুলে গিয়েছিল!

সবসময় মা পড়াশুনার পাশাপাশী মেয়েকে আপ্রাণ চেষ্টা করেন ঘরের কাজ ও রান্নাবান্নায় পারদর্শী করে তুলতে। সেখানে ছেলে সন্তান দিব্বি পায়ের উপর পা তুলে কোন ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস নিয়ে, না হয় বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে সময় কাটায়। বাড়ির মাছের মাথা, মুরগীর রানটা সুপুত্র চাঁদ বদনের কপালেই জুটে!

কর্মজীবনে অনেকের অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি, একজন নারী সুপারভাইজারকে নিজের অসুবিধা বুঝানো খুব কঠিন, কারণ তিনি নারী হয়েও দৈনন্দিন জীবনে একজন কর্মজীবী মা যে সমস্যার মুখোমুখি হোন তা বুঝতে চান না।

অনেককে বলতে শুনেছি কীভাবে তারা প্রতিনিয়ত শাশুড়ির আচরণে, অত্যাচারে অতিষ্ঠ হোন। তাদের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে কীভাবে তিনি হস্তক্ষেপ করেন। নয়তো বড়জা বা ননাস, ননদরা কতটা সক্রিয়, কীভাবে তাদের স্বামীরা তাদের কথায় সব সিদ্ধান্ত নেন, বা বউয়ের উপর চড়াও হোন! আবার এর ব্যতিক্রমও আছে, যেখানে শাশুড়ি তার সাধের বউমার কাছে কোন সম্মান পান না, কারণ বউমা সারাক্ষণ তার রুমেই থাকেন, তিনি শুধু খাবারের সময় বের হোন। অথচ শাশুড়ি আশা করেন বিকালে দুজন বসে একসাথে গল্প করবেন, একসাথে চা পান করবেন।

আমি যেহেতু চাকরিজীবী তাই বাচচার স্কুলে খুব একটা যাওয়া হয়ে উঠে না। তারপরও যেদিন সুযোগ পেয়ে গিয়েছি আমাকে দেখে অনেকদিন বলতে শুনেছি যেমন- গৃহিণী মাদের আলাপ, “আমি ভাবী, আমার সাংসারের কোন জিনিষটা কোথায় সব জানি। কাজের লোকের হাতে সংসার কক্ষনো নয়। আমার বাসার চিরুনিটা কোথায় আমি বলে দিতে পারবো…।” আমি মনে মনে বলি…আমার চিরুনি তো আমার ব্যাগেই থাকে।

মধ্যযুগের সমাজ ব্যবস্হায় পুরুষেরা এমনভাবে তাদের প্রদত্ত নিয়ম কানুন মানবার জন্য একদল নারী প্রতিনিধি তৈরি করে নেয়। তারাই যুগে যুগে সেই নিয়মের বাহক এবং ধারক। সেই শৃংখল থেকে আমরা আজও বের হতে পারিনি। তাই আমরা নারীরা নিজেরাই পারি নিজেদের চেষ্টায় মানুষ হয়ে উঠতে। প্রতিটি নারী জীবনে বিভিন্ন পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা পালন করে। যেমন মা হিসেবে নিজের মেয়েকেই নয়, পাশাপাশি ছেলেকেও ঘরের কাজ শেখাতে পারেন। ছেলেমেয়েতে কোনো বিভেদ নয় এই শিক্ষা দিতে পারেন। মেয়েকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পূর্ণ সহযোগিতা করতে পারেন।
নিজের স্বকীয়তাবোধ নিয়ে বেড়ে উঠলে যে কী আনন্দ, সেটা মেয়েরা উপলব্ধি করতে শেখো। দেখবে জীবনটা কত বড় আর কত সুন্দর।

উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত গৃহিণীদের শুধুমাত্র পার্লার, সংসার কিংবা নতুন রেসিপি নিয়ে বা জা, ননদ, ভাইয়ের বউ বা শাশুড়ি নিয়ে গল্পে মশগুল দেখলে যেমন অবাক লাগে, তেমনি একজন অশিক্ষিত/কমশিক্ষিত গার্মেন্টস কর্মীকে দেখলে মনটা ভরে যায়। কত প্রতিকূলতা, বাধা তাদের পথে, তবুও তারা নিজের পরিচয়ে বাঁচতে চায়। জীবন সংগ্রামে লড়ে যেতে চায় দৃঢ়প্রত্যয়ে!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 829
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    829
    Shares

লেখাটি ১,৮১০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.