হিজাব কি কেবল ‘ভদ্র’ নারীদের প্রতীক?

0

ফারজানা সুরভি:

হিজাব পরা কিংবা না পরা-যার যার ব্যক্তিগত ইচ্ছা বলে মানি নূন্যতম ভদ্রতাবোধ থেকে। কেননা অন্য কারো পোশাক নিয়ে মাথা ঘামানোটা আমার মতে শোভন নয়। কিন্তু বাংলাদেশে হিজাবের পপুলারাইজেশনে আমি ভীত। কেনো ভীত-এই উত্তরটাও দেই।

১) হিজাব বাংলাদেশে এখন “সিম্বল অফ ডিসেন্সি”। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি ২০০৭ থেকে ২০১২ অব্দি। হিজাব তখন “সিম্বল অফ ডিসেন্সি” ছিলো না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মূলত মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত নারীরা পড়েন। তখন লম্বা একটা সালোয়ার কামিজ ও বুক ঢেকে রাখা বড় ওড়নাকে সিম্বল অফ ডিসেন্সি ধরা হতো। আমার মতো ফতুয়া পরা কিংবা সাইডে ওড়না পরা মেয়েরা ‘বেশ্যা’ হিসেবে ট্যাগ খেতেন। হিজাব খুব কম নারী-ই পরতেন। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আমাদের পোশাক নিয়ে একদম-ই মাথা ঘামাতেন না। আমি অনেক চমৎকার শিক্ষকের দেখা পেয়েছিলাম আমাদের লোকপ্রশাসন বিভাগে।

আমার ছোট বোনদের জেনারেশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন ২০১২/২০১৩ র দিকে। এরকম এক ছোট বোনের কাছে শুনলাম, তাদের বিভাগে “সিম্বল অফ ডিসেন্সি” এখন হিজাব বা বোরখা। যেই মেয়েরা হিজাব পরতেন না, তারাও ছেলে সহপাঠীদের “বেশ্যা” ট্যাগ খেতে খেতে ডিপার্টমেন্টে টিকে থাকার জন্য হিজাব পরা শুরু করলেন। সবচেয়ে অবাক ব্যাপার এই যে, ক্লাসে নাকি শিক্ষকরাও হিজাব না পরা মেয়েদের কটুক্তি করতেন। সেই সাথে ভাইভাতে নম্বর কম দিতেন।

আমার কাছে স্ট্যাটিস্টিকস নেই যে, কতোজন নারী হিজাব পরছেন এখন বাংলাদেশে! কিন্তু এখন শুধু লম্বা কামিজ বা মাথার ঘোমটাতে বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কুলাচ্ছে না। চাহিদা এখন হিজাবে গিয়ে ঠেকেছে। বেশিরভাগ মেয়েই স্লাট শেমিং-এর শিকার হতে চায় না। তাই নো ওয়ান্ডার, হিজাব পরে তারা নিজেদের ‘ভদ্র’ প্রমাণের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

২) হিজাব এমন একটি রিলিজিয়াস টুল, যা পলিটিক্যাল উইপন হিসেবে বাংলাদেশে ব্যবহার হচ্ছে ইস্লামাইজেশনের উদ্দ্যেশ্যে। প্রথমে ধনী শ্রেণীর নারীরা প্রচলন করেছিলেন হিজাবের, ফ্যাশন হিসেবে। তারা গুলশান-বনানীতে ‘হালাকা’ নামে বিভিন্ন এলিট মুসলিমাদের সাপ্তাহিক সভা করতেন। মধ্যবিত্ত সবসময়-ই ধনীদের ফ্যাশন ফলো করে নিজেদেরকে সোশ্যাল স্ট্র্যাটিফিকেশনে এগিয়ে রাখতে চায়। তাই কিছুদিন পরেই মধ্যবিত্ত নারীরাও শুরু করলেন ব্যাপকভাবে হিজাবের ব্যবহার। সেখান থেকে নিম্ন মধ্যবিত্তরা।

হিজাব আরবান এলাকাতে পপুলার এখন বাংলাদেশে। কুয়াকাটার প্রত্যন্ত গ্রামেও নারীরা বোরখাই ব্যবহার করেন সরাসরি। এই বছরেই কুয়াকাটা গিয়েছিলাম। খেটে খাওয়া শহুরে নিম্নবিত্ত নারীরা পেশার তাগিদেই পারেন না হিজাবের বিলাসিতা করতে। আগে আপনি মুসলিম হওয়ার জন্য নামাজ রোযা করলেই হচ্ছিলো। এখন “বেটার মুসলিম” নামের একটা আইডিয়া বেশ পপুলার। সেই “বেটার মুসলিম” নারীর ডেফিনিশন অনুযায়ী-হিজাব মাস্ট।

বলাই বাহুল্য- এই “বেটার মুসলিম” এর রিকোয়ারমেন্ট মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়েছে। তাই আমাদের মা-খালারা হিজাব না পরলেও আমাদের জেনারেশনের অনেকেই পড়ছেন। হিজাব এখন একই সাথে ফ্যাশন করা ও রিলিজিয়াস হিসেবে নিজেকে প্রমাণের একটি পোশাক বাংলাদেশে। ৬/৭ বছর আগেও কিন্তু এটা ছিল না।

৩) পোশাকের স্বাধীনতার যুক্তিতে হিজাবে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, বাংলাদেশে পোশাকের স্বাধীনতাটা শুধু হিজাবেই আটকে আছে। এই ভীষণ একপেশে স্বাধীনতা কিন্তু নারীর অন্য কোনো পোশাকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না। আমি স্রেফ ওড়নার বদলে ফতুয়া আর স্কার্ফ পরার কারণে রাস্তা-ঘাটে অনেকবার মোল্লার পোশাক পরা পুরুষদের আক্রমণ ও গালাগালির সম্মুখীন হয়েছি।

৪) হিজাবকে গ্লোরিফিকেশনের একটা চেষ্টা চলছে গণমাধ্যমে ও বাজার ব্যবস্থাতে। আমি সেদিন বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত ফটোগ্রাফারের একটি এলব্যাম দেখলাম। সেই ফটোগ্রাফার সব হিজাব পরিহিত নারীদের নিয়ে একটি এলব্যাম করেছেন। আমার তাতে সমস্যা ছিল না। সেই এলব্যামে উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত অব্দি সকল সোশ্যাল স্ট্র্যাটিফিকেশনের নারীদেরকে কভার করা হয়েছে। এবং সেইসব নারীরা বলছেন যে, কেন তারা ভালোবেসে বাই চয়েস হিজাব করেন? ঈশ্বরের সন্তুষ্টির জন্য কেউ হিজাব পরেন বললে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু তারা প্রায় সকলেই বলছেন, হিজাব রাস্তার ইভ-টিজার কিংবা রেপিস্টদের জন্য একটা সিগন্যাল যে হিজাবী নারী মানেই ভদ্র নারী। তাই তাকে যেন উত্যক্ত না করা হয়! এতো জঘন্য পুরুষতান্ত্রিক রেপ কালচার দেখলে বমি চলে আসে! আমার হিজাবের এই গ্লোরিফিকেশনে আপত্তি। হিজাব যদি স্রেফ একটা পোশাক-ই হয়, এটাকে এতো গ্লোরিফাই করার কি আছে? পাশ্চাত্যের পোশাককে যেমন আলাদা করে গ্লোরিফাই করার কিছু নেই। হিজাব-ও তো তাই হওয়ার কথা। তাই না?

আমি পিএইচডি শেষে ও কিছু শিক্ষকতার এক্সপেরিয়েন্স নিয়ে এক সময়ে দেশে ফিরতে চাই। কিন্তু আজকে থেকে দশ বছর পরে হিজাব-ই যদি বাংলাদেশের নারীদের জন্য একমাত্র সামজিকভাবে গ্রহণযোগ্য পোশাক হয়, নারী হিসেবে সেই দেশে ফেরত যেতে আমি আতঙ্কিত বোধ করবো।
আমার ভয় হবে যে, আমাকেও বাংলাদেশে হিজাব নামের পপুলার ড্রেস কোড মেনেই চাকরি-বাকরি করে খেতে হবে। আমার ভয়ের জায়গাটা বলাটা জরুরি মনে হলো।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 807
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    807
    Shares

লেখাটি ২,৯৪৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.