কথায় নয় কাজে #MeToo আন্দোলন

0

তামান্না ইসলাম:

অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশের সমাজে একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে কর্মজীবী মেয়েরা কর্মস্থলে বিভিন্নভাবে তাদের নারীত্বের সুযোগ নিয়ে থাকে। বিভিন্ন ছলনায়, মোহে, কৌশলে জড়িয়ে, নিজেদের সৌন্দর্য, মিষ্টি মুখ, মিষ্টি কথা, এক কথায় ফ্লার্ট করে, ক্ষেত্রবিশেষে শরীরের বিনিময়েও তারা অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও সুযোগ-সুবিধা, ছুটি, বেতন, বোনাস, দায়িত্ব, প্রমোশন পর্যন্ত হাতিয়ে নেয়।

মেয়েদেরকে এই দুর্নাম দেওয়ার পেছনে মূলত কাজ করে তিনটি কারণ, এক কিছু কিছু ছেলের ফালতু ভিত্তিহীন ইগো, যারা কোনভাবেই মানতে নারাজ যে মেয়েরাও কাজে তাদের মতো সমকক্ষ, একই রকম পারদর্শী হতে পারে। আর কোনক্রমে যদি মেয়েরা তাদের চেয়েও ভালো হয়ে যায়, তাহলে তো কথাই নেই। তাদের ঘুম হারাম। নিজেদের এই দুর্বলতা ঢাকতে হীনমন্যতা থেকে তারা এধরনের অপপ্রচার করে এক ধরনের আত্মপ্রসাদ পায়।

দুই, অস্বীকার করার উপায় নেই যে আদিকাল থেকে মুষ্টিমেয় কিছু মেয়ে আছে যারা এধরনের সুযোগ নেয়, তবে এদের সংখ্যা খুব কম। সত্যি কথা বলতে কী এরা নারী জাতির কলঙ্ক এবং মেয়ে হিসাবে এদের জন্য আমি করুণা বোধ করি, এদের জন্য লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়।

তৃতীয় কারণটি স্রেফ বহুকাল ধরে জাঁকিয়ে বসা মানসিকতা। মেয়েরা দুর্বল, বাইরের কাজে পটু না, রঙ, ঢং, রূপ যৌবনই এদের সম্বল, শিক্ষা, দীক্ষা, বুদ্ধি নয় এই প্রাচীন মানসিকতা থেকেই এই সব কানাঘুষা শুরু হয় এবং মানুষ এগুলো রসিয়ে বলতে মজা পায়, বিশ্বাসও করে যাচাই বাছাই না করে।

আজ থেকে বহু বছর আগেই দেখেছি এক পরিচিতা, দারুণ সুন্দরী, প্রাইভেট কোম্পানিতে এমডি’র সেক্রেটারি। উনাকে প্রায়ই বসের সাথে বাইরে যেতে হতো। বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে তার সুখের সংসার। কিন্তু এই বিদেশ ভ্রমণের কারণে তার সম্পর্কে কুৎসার কোনো অভাব ছিল না, সেটার কোনো সীমাও ছিল না। সামনে দেখা হলে সব স্বাভাবিক, কিন্তু পেছনে চলতো কানাঘুষা।

যাই হোক, এর উল্টো দিকও আছে। সেটা আরও ভয়াবহ। যেখানে মেয়েরা কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন যৌন নির্যাতন এবং অবমাননার শিকার। সুন্দরী মেয়ে বা নারী দেখলে অনেক পুরুষেরই মাথার ঠিক থাকে না। একসাথে দিনের পর দিন কাজ করতে গেলে আগ্রহ জন্মাতে পারে, আকর্ষণও। কিন্তু কাজের স্বার্থে এটাকে কর্মক্ষেত্রের বাইরে রাখা খুব জরুরি। কোথায়, কীভাবে সীমারেখা টানতে হবে এটা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ভালমতো জানা থাকা দরকার। বন্ধুত্ব আর প্রেম বা শারীরিক সম্পর্ক এক জিনিস নয়।

দেশে আজকাল ডিভোর্সের হার অনেক বেড়েছে। আর অনেকক্ষেত্রেই এই ডিভোর্সি নারীরা অবিবাহিত মেয়েদের চেয়ে অনেক গুণ বেশি অনিরাপদ। কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন হয়রানির শিকার হতে হয় তাদের। তাদের সম্পর্কে মানুষের করুণা, সহমর্মিতার সাথে যোগ হয় এক ধরনের তাচ্ছিল্য এবং তারা খুব সহজপ্রাপ্য, দুর্বল, অসহায় এধরনের মানসিকতা। ডিভোর্সি নারীমাত্রই যে পরকীয়ার জন্য লালায়িত, তা কিন্তু নয়। তারা এতোটা উপোষীও নয় যে তাদের কোনো রুচিবোধ, ন্যায় নীতি থাকবে না। তারা সাজগোজ করে মানেই তারা লাস্যময়ী, একটা প্রমোশনের বিনিময়ে যা চাইবে তাই পাওয়া যাবে তাও নয়। কর্পোরেট অফিসগুলোতে এগুলো নিয়ে মেয়েদেরকে অনেক হয়রানির কথা শুনি। জোর করে কাজ দিয়ে দীর্ঘ সময় ফাঁকা অফিসে আটকে রাখা, গায়ে পড়ে লিফট দিতে চাওয়া, অকারণে টেক্সট করে উত্ত্যক্ত করা, গিফট দেওয়া, না চাইলেও জোর করে চা, কফির নামে রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাওয়া, এমন অভিযোগ প্রায়ই পাওয়া যায়।

দেশের কর্পোরেট অফিসগুলোতে এ বিষয়ে কি কোনো নিয়মের কড়াকড়ি আছে? নিয়ম থাকলেও সেগুলো কি আদৌ মানা হয়? কোন মেয়ে যদি এই ধরনের হয়রানির শিকার হয়ে অভিযোগ করে, তবে সে অভিযোগগুলোকে কি আদৌ পাত্তা দেওয়া হয়? কোনো তদন্ত হয়? নাকি উল্টা সেই মেয়েরই চাকরি খায় সেই বস, সমাজ তাকে খারাপ চোখে দেখে, আর এই ভয়ে কোনো মেয়েই কোনো অভিযোগ করতে সাহস পায় না।

মেয়েরা কম-বেশি হয়রানির শিকার সব জায়গাতেই হয়। হয়তো খালি ডিভোর্সিদের জন্য দৃষ্টিভঙ্গিটা আলাদা। কিন্তু যেটা সবচেয়ে আলাদা, সেটা হলো উন্নত দেশে আইন এবং তার প্রয়োগ। উপরের যে দুটো সমস্যার কথা বলেছি, এই দুটো সমস্যা বাস্তব, সবখানেই আছে। আবার কোনো দুরভিসন্ধি ছাড়াও খুব স্বাভাবিকভাবে দুজন অবিবাহিত মানুষও একসাথে কাজ করতে গিয়ে একজন আরেকজনের প্রতি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে একজন যদি হয় আরেকজনের অধস্তন, তাদের পক্ষে নিরপেক্ষভাবে কাজ করা, বা কাজের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব নয়।

এই সব সমস্যাগুলোকে মাথায় রেখে উন্নত দেশগুলোতে এসব ব্যাপারে প্রতিটা কোম্পানির ভীষণ শক্ত আইন আছে। যে কোনো ছেলে বা মেয়ে যৌন হয়রানির অভিযোগ করলে, এমনকি তৃতীয় পক্ষও অভিযোগ করলে, বা গোপন প্রণয়ঘটিত ঘটনার অভিযোগ আসলে সমস্ত গোপনীয়তা রক্ষা করে সেই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হয়। অভিযোগ প্রমাণ হলে সাথে সাথে চাকরি খতম। অপ্রমাণিত হলেও অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে কোনো বিরূপ ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। কোম্পানির কেউই এই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
#MeToo আন্দোলনের পর থেকে এই আইনগুলো আরও শক্তভাবে মানা হচ্ছে। যৌন নির্যাতন বা হয়রানি নয়, এমনকি অধস্তন কর্মচারির সাথে প্রেম থাকার অভিযোগে অনেক বড় বড় কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও চাকরি হারাতে হয়েছে। এই উদাহরণগুলো সেসব কোম্পানি এবং অন্য কোম্পানির হাজার হাজার লাখ লাখ কর্মচারিদের জন্য দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে, তাদের মনে সাহস জুগিয়েছে।

মেয়েরা (বিরল ক্ষেত্রে ছেলেরা) কোন রকম হয়রানির আশঙ্কা করে না। নিশ্চিন্ত মনে কাজ করতে পারে। কাজের ক্ষেত্রে সুস্থ, নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা কোম্পানির দায়িত্ব। #MeToo আন্দোলনকে কথায় না তার কাজে বাস্তবায়ন করছে।

আসুন আমাদের দেশেও আমরা কড়াকড়ি ভাবে এই পদক্ষেপগুলো নেই। মেয়েদের জন্য কাজের নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করি। ছেলেদের মনেও এই বিশ্বাস জন্মাক যে ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সবার সফলতার একমাত্র পথ কর্ম দক্ষতা, এবং পরিশ্রম।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 122
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    122
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.