“ধর্ষক”-এর বিরুদ্ধে অসৎ লড়াই? অর্জন কী?

0

অনুপম সৈকত শান্ত:

বিশিষ্ট স্যাটায়ার লেখক কুঙ্গ থাঙ এর “ধর্ষক নয়, ধর্ষণের শিকার নারী/শিশুটির পক্ষে থাকুন” শীর্ষক পরামর্শমূলক লেখাটির (http://www.nari.news/post/kungothang-dhorshok-noy-dhorshoner-shikar-narishishur-pokkhe-thakun) শিরোনামসহ বেশ কিছু পরামর্শের সাথে একমত। যদিও এই লেখাটিও এই ইস্যুতে তার পূর্বতন লেখাগুলোর মতোই ধর্ষণের চাইতেও তথাকথিত “মানবতা ভাইয়া ও আপা”দের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ কিংবা চলমান বিতর্কে “হেনতেন” উপায়ে বাহবা কুড়ানোর সস্তা আগ্রহই অগ্রাধিকার পেয়েছে। ফলে ধর্ষণের শিকার নারীর পাশে দাঁড়ানোর কিংবা ধর্ষণের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান (যার সাথে সম্পূর্ণ একমত এবং যাকে এই মুহুর্তের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আহবান বলে মনে করি) লেখাটির মূল ফোকাস থেকে সরে গিয়েছে!

জানি না ভদ্রলোকের মূল লড়াইটা কাদের বিরুদ্ধে! ধর্ষণের বিরুদ্ধে, ধর্ষকদের বিরুদ্ধে, এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ-রাষ্ট্র-আইন ও বিচার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে; নাকি- কল্পিত মানবতাবাদীদের বিরুদ্ধে, যাদের অনেকেও হয়তো এরকম ধর্ষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামে, গণপ্রতিরোধে, সম্মুখ সমরে অবস্থান করতে আগ্রহী!

তার লেখাগুলো পড়ে, তার রাগ-ক্ষোভ-আক্রোশ ও ঘৃণা এসব দেখে মনে হয়- কেবলমাত্র গণপিটুনির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অপরাধেই তিনি কথিত “মানবতাবাদী”দের ধর্ষণ প্রতিরোধের লড়াইয়ে অবাঞ্ছিত মনে করছেন! এতে ধর্ষণ কতখানি বন্ধ হবে, কিংবা ধর্ষণ বিরোধী সামাজিক আন্দোলন কতখানি শক্তিশালী হবে জানি না, তবে একধরণের স্তাবকদের বাহবা, ‘লাইক’, পিঠ-চাপড়ানি এসব ভালোই কামাই হবে নিশ্চিত। লাইক-শেয়ার-এটেনশনের প্রতি নিজের দুর্বার আকাঙ্ক্ষার কথাটা তথাকথিত “মানবতা ভাইয়া ও আপু”দের নামে চালিয়ে নিজ অভিজ্ঞতাপুষ্ট পরামর্শ দিয়েছেন তিনি ভালোই, “একমত ভাইয়া”- “সহমত আপু” -এরকমের কমেন্ট যে তাদের মত স্তাবকপ্রিয় লেখকদের একমাত্র অরাধ্য বিষয় সেটি বুঝতে পারা যায়, যখন দেখি শুধুমাত্র দ্বিমত করার কারণেই তিনি আমাকে তার আঙ্গিনায় কথা বলার অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন!

অথচ সত্য মিথ্যা মিশিয়ে আমার কথাকে বিকৃত করে আলোচ্য পোস্টখানিতে কিংবা ওনার ফেসবুকে আলোচনা করতে এতখানি বিবেকে বাঁধছে না! একজনের আড়ালে (আনফ্রেন্ড/ ব্লক করার মাধ্যমে) তার পুরাতন কথার অংশ বিশেষ স্ক্রিনশট দিয়ে ভুলভাবে উপস্থাপন করতে এতোখানি যার বাঁধে না, যার নামে সমালোচনা করা হচ্ছে নিদেনপক্ষে তার পাল্টা মতটুকু শোনার মতো বা তাকে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে দেয়ার মতো সৎ সাহস যার নাই- তিনি যখন জনগণের উদ্দেশ্যে পরামর্শনামা লিখেন, তখন পুরো ব্যাপারটিকেই বড় তামাশামূলক মনে হয় বৈকি!

আলোচ্য পরামর্শনামায় একটি বিষয়ে আমার বক্তব্যকে বিকৃত করা হয়েছে বিধায় প্রথমে সেই প্রসঙ্গে আমার কৈফিয়তটি হাজির করছি। প্রসঙ্গক্রমে অন্যান্য ব্যাপারেও কিছু আলোকপাত করা যাবে ক্ষণ।

তিনি বলেছেন, “অনেকে পরামর্শ দেয় মার্শালআর্ট শিখতে, এগুলো এবসার্ড কথাবার্তা দলে ভারি ইভটিজার বা গ্রুপ রেপিস্টের সামনে মার্শাল আর্ট-মার্টে কাজ হবে না”। ফেসবুকে এই লাইনের ব্যাখ্যায় জানিয়েছেন, “টাই (মার্শাল আর্ট-ই) সমস্যা সমাধানের পথ বলে জনৈক মানবতাবাদী দাবী করেছিলেন , তাই দলবদ্ধ আক্রমণের বিরুদ্ধে মার্শাল আর্টের অসাড়তার কথা টানতে হয়েছে”।

সেই “জনৈক মানবতাবাদী” হিসেবে আমার কিছু কমেন্টের স্ক্রিনশটও দিয়েছেন। অথচ কোথাও কি তিনি দেখাতে পারবেন যে, আমি মার্শাল-আর্টকে একমাত্র (এটা“ই”) সমাধানের পথ বলে উল্লেখ করেছি? “একমাত্র” তো দূরের কথা, মার্শাল আর্টকে কোথাও ধর্ষণ সমস্যার নিদেন সমাধান হিসেবেও কি উল্লেখ করেছি? যেকোনো যুক্তি-তর্কে, আলোচনায় সৎ আচরণ প্রত্যাশা করি। সত্য বলার সৎ সাহস হারিয়ে কিছু অর্জন করা যায় বলে মনে করি না।

আমি মার্শাল আর্টের প্রসঙ্গ টেনেছিলাম, কেননা তিনি এর আগে আরেকটি বিষয়ে মিথ্যাচার করছিলেন। একজন ধর্ষককে আটক করার পরে, তাকে গণপিটুনির বিরোধিতাকে তিনি ব্যঙ্গ করছিলেন এভাবে- ভিকটিমও ধর্ষককে কিছু বলবে না, আদর যত্ন করবে, ভাইয়া ভাইয়া বলবে ইত্যাদি। সেই প্রসঙ্গেই বলেছিলাম, ভিক্টিম আত্মরক্ষার্থে  প্রতিরোধ করবে, এমনকি খুনও করতে পারে। ভিক্টিমের প্রতিরোধের বিরুদ্ধে তো কেউ বলছি না, আমরা যারা গণপিটুনির বিরুদ্ধে কথা বলছি। সেই প্রসঙ্গেই বলেছিলাম, বিভিন্ন ধর্ষণ / নারী নির্যাতন বিরোধী পেজ, যেখানে নারীর মার্শাল-আর্টের কথা বলা হয়, নানারকম বহনযোগ্য অস্ত্রের পক্ষে বলা হয়, সেসবকেও তো সমর্থন করি।

সমর্থন করি, এই কথাটা বলা মানে, একে একমাত্র সমাধান হিসেবে মনে করা না বা উল্লেখ করা না, বরং এটাই দেখানো যে, ধর্ষণ- যৌন নির্যাতনের সময়ও সামান্য প্রতিরোধ না করেই- চুপ চাপ নির্যাতন ভোগ করে যাওয়া ও থানাপুলিশ করা ছাড়া একেবারেই নিষ্ক্রিয় থাকার কথা আমি, আমরা কেউ বলছি না! এধরনের যে চিত্র তিনি তুলে ধরার চেষ্টা করছিলেন, সেটি যে কতবড় মিথ্যাচার তা আঙ্গুল দেখিয়ে দেয়ার জায়গা থেকেই এ প্রসঙ্গ টেনেছিলাম। কিন্তু ভদ্রলোক যে কত বড় “টুইস্ট”-শিল্পী, সেটি আরেকবার এখানে দেখিয়ে দিলেন – আমার ঐ বক্তব্যকে মনের মাধুরী মিশিয়ে মিথ্যাভাবে উপস্থাপন করে!

চিত্র-১: ধর্ষণের বিরুদ্ধে থাকা অনেকেই গণপিটুনির সমর্থক। তারা ভিন্নমত শুনতে ভয় পান বলে ভিন্নমত দমনের পথ ধরেন। ধর্ষণকারী (বা ধর্ষক), ভিন্নমত দমনকারী আর গণপিটুনির সমর্থকদের মনস্তত্বের মাঝে বিস্তর মিল আছে

যাহোক, ওনার পরামর্শনামায় আবার ফেরা যাক। আমি একমত যে, ধর্ষকের পক্ষে নয়, আক্রান্ত/ নির্যাতিতের পাশে দাঁড়ানোই একজন মানুষের কাজ। ফলে ধর্ষক- নির্যাতকদের সামাজিকভাবে প্রতিহত করা, প্রতিরোধ করা জরুরি, একান্ত দরকার। তদুপরি ওনার মতো করে “খুন” না করে পেটানোর পক্ষে মত দিতে পারছি না। গণপিটুনিতে এই “খুন” না করার উদ্দেশ্যটাও তিনি প্রকাশ করেছেন, “খুনি” হতে না চাওয়া!

বাসে- রাস্তাঘাটে কিংবা যেকোনোখানে নির্যাতক, ধর্ষকদের প্রতিহত করার সময়ে এগিয়ে আসা, ঐ মুহূর্তে এমনকি আঘাত করা- সেটি নির্যাতিত কর্তৃক হোক কিংবা আশেপাশের লোকজন কর্তৃক হোক, নির্যাতক/ধর্ষককে নিরস্ত্র করতে দরকারে অস্ত্র হাতে তোলা- এসবে আমি কোন সমস্যা দেখি না; কিন্তু একজন যখন ধৃত, নিরস্ত্র; তাকে ধরে বেঁধে মবের হাতে ছেড়ে দিয়ে পিটুনি খাওয়ানোর বিরুদ্ধে থাকবে আমার অবস্থান। অনিয়ন্ত্রিত মবের হাতে পড়ে একেবারে মেরে ফেলা (খুন) হোক, কিংবা কুঙ্গ থাঙের মতো কুশলী লোকদের নিয়ন্ত্রিত পিটুনিতে হাত-পা ভেঙ্গে ফেলা, চোখ উপড়ে ফেলা, পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলা, পঙ্গু বানানো হোক- সবেতেই আমি আপত্তি করি। আমি থানা-পুলিশ- আইন আদালতের কথাই বলবো; যতই আমার দেশের বিচারহীনতার দোহাই দেন না কেন! আমার দেশের আইন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার ব্যবস্থা- এসবের সমস্যার বিরুদ্ধেও সেকারণে আমাদের লড়াই চালানো দরকার মনে করি; মনে করি না- ধর্ষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কোন শর্টকাট রাস্তা আছে।

যেহেতু ধর্ষকদের আদালতে সাজা হয় না, সেহেতু এদের ধরে গণপিটুনি/ ক্রসফায়ার দিয়ে মেরে ফেললেই, বা খুন হওয়ার আগ পর্যন্ত গণপিটুনি দিয়ে আধমরা করতে পারলেই ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে না! এসবের মাধ্যমে কারো কারো ক্ষেত্রে ধর্ষকদের বিরুদ্ধে পুশে থাকা তীব্র রাগ, ঘৃণা, ক্ষোভ প্রকাশ হওয়ার কাজ করতে পারে; কিন্তু গণপিটুনিতে অংশ নেয়া অধিকাংশ মবের ক্ষেত্রেই বিষয়টা কেবল হুজুগে মেতে বর্বর আনন্দে মত্ত হওয়া। যে মব একজন ধর্ষককে (ধর্ষক বা অপরাধী পরিচয়টা বস্তুত গৌন) নিমিষে পিটিয়ে মাটির সাথে পিষে ফেলতে পারে;  সেই একই মব অন্যক্ষেত্রে দেখা যাবে- বৈশাখী মেলার ভিড়ে নারী নির্যাতনে প্রত্যক্ষ (নিজেও সুযোগ বুঝে অংশ নেয়ার মাধ্যমে) বা পরোক্ষ (নারীর নির্যাতনের দৃশ্য উপভোগ  ও ধারণ করার মাধ্যমে) অংশ নিচ্ছে!

দুঃখিত, বাংলাদেশের এই মবের প্রতি আমার এতখানি আস্থা নেই! ফলে, তারা ধর্ষণ- নির্যাতন প্রতিরোধ করবে এমন প্রত্যাশার আগে আমার প্রত্যাশা থাকে- তারা যাতে নিজে কোন ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন- নির্যাতনে অংশ না নেয়!

ধর্ষককে ধর্ষক বলতে আদালতের রায় হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার দরকার নেই; অবশ্যই একমত। যেভাবে, ধর্ষকের পক্ষের লোকজন তথা আসামীপক্ষ, ধর্ষককে নিরপরাধ দাবি করার জন্যে আদালতের রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করে না। ফলে, বাদীপক্ষ অতি-অবশ্যই খুনী, ধর্ষক, চোর, নির্যাতক- এদেরকে অপরাধী হিসেবেই বলবে, তার জন্যে রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করার কিছু নেই। আমজনতা বা তৃতীয়পক্ষ যখন অভিযুক্তকে অপরাধী বলে, তার মাধ্যমে তারাও আসলেও ভিক্টিমের প্রতি মোরাল বন্ডিং এ যুক্ত হয়, এবং বাদীপক্ষে অবস্থান নেয়। যেভাবে গোলাম আযম-নিজামিকে সাজা দেয়ার অনেক আগে থেকেই রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী বলি, এরশাদ শিকদার- সুইডেন আসলামদের খুনী সন্ত্রাসী বলি, সেঞ্চুরিয়ান মানিক-আনিসদের ধর্ষক বলি; কোনক্ষেত্রেই মোটেও রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করি নাই। তাদের সর্বোচ্চ সাজার রায় প্রত্যাশা করেছি, চেয়েছি, অনেকের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাজার দাবিতে মিছিলও করেছি; কিন্তু সাজা দেয়ার ভার তো আদালতের হাতেই রেখেছি। নয় কি?

কেননা সাজা দেয়ার আগে রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করাটা উচিৎ এবং বাদীপক্ষ নিজ হাতে সাজা দেয়ার ভার তুলে নিতেও পারে না। এরকম সভ্য-ভব্য সমাজের প্রত্যাশা করি, নিদেনপক্ষে আইনের শাসন প্রত্যাশা করি! কেননা ন্যুনতম আইনের শাসন না থাকাটাই আসলে ধর্ষক-নির্যাতকদের মূল রক্ষাকবচ! কেননা যেই মুহূর্তে বলছি, বিচার হচ্ছে না বলে তাদের গণপিটুনি দেয়া উচিৎ- ঠিক সেই মুহূর্তে আসলে প্রকারান্তরে বিচারহীনতাকেই আমরা মেনে নিচ্ছি। যে বিচারহীনতা রনি হকদের তৈরি করে, সেটিকে জিইয়ে রেখে এক দুইজন রনি হককে পিটিয়ে আর সব রনি হকদের অভয়ারণ্য তৈরিতেই সাহায্য করা হচ্ছে মাত্র।

মার্শাল আর্টের বিরুদ্ধে ভদ্রলোকের একটি যুক্তির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। তিনি বলেছেন, “দলে ভারি ইভটিজার বা গ্রুপ রেপিস্টের সামনে মার্শাল আর্ট-মার্টে কাজ হবে না”! দলে ভারি নির্যাতক (“ইভটিজার”/ “ইভটিজিং”, “মা-বোনের সম্ভ্রম”- এসব শব্দাবলী পরিহারে সম্পাদকীয় নীতিমালা প্রত্যাশা করি), গ্রুপ রেপিস্টের সামনে মার্শাল আর্টে কাজ হবে না, হবে কিসে- একটু জানাবেন কি?

অস্ত্রের মুখে, অপহরণ করে, দলবেঁধে ধর্ষণের ক্ষেত্রে তথা এদেশে পাহাড়ে আদিবাসীদের উপরে আর্মি-সেটেলারদের কিংবা হিন্দুপল্লীতে সাম্প্রদায়িক হামলার সময়ে যেরকম নারী নিপীড়ন, নির্যাতন, ধর্ষণের ঘটনা ঘটে- সেগুলোর ক্ষেত্রে ভিক্টিমের একক প্রতিরোধ সম্ভব না হয়তো, ফলে মার্শাল আর্ট কাজে লাগবে না ঠিকই; কিন্তু প্রতিনিয়ত প্রতি মুহূর্তে চারদিকে অসংখ্য নারী নির্যাতন- নিপীড়ন- ধর্ষণের ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, যেগুলোতে আপাত নিরীহ, সুযোগসন্ধানী, ভদ্রবেশী পুরুষেরা যুক্ত; তাদের মোকাবেলায় কি কিছুটা সাহস নিয়ে দাঁড়ানোটা কাজে লাগে না? মার্শাল আর্ট কিন্তু মারামারির আর্ট না, এটি আত্মরক্ষার টেকনিক শেখায়।

এর সবচেয়ে বড় উপকার হচ্ছে, আক্রান্ত হলে ভয় পেয়ে মুষড়ে না পড়ে, পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলা শেখায় মার্শাল আর্ট। যেকোনো নির্যাতন-নিপীড়ন রুখে দাঁড়ানোর প্রাথমিক বিষয়টি হচ্ছে সাহস নিয়ে দাঁড়ানো তথা জড়তা ভেঙে দাঁড়ানো, যা অর্জনে মার্শাল আর্ট সহযোগিতা করতে পারে। এটি কেবল ভিক্টিমের জন্যে সত্য নয়, আশেপাশের যারা গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলবে, তাদের মাঝেও যদি কেউ মার্শাল-আর্ট জানা থাকে, তার/ তাদের এগিয়ে আসাটাও সহজ হতে পারে। ফলে কেবল আমার বিরোধিতার জন্যেই বিরোধিতা করতে এরকম দরকারি একটি টুলকে দূরে ঠেলে দেয়া ঠিক হচ্ছে কিনা ভেবে দেখতে পারেন!

 

 

 

 

 

 

চিত্র-২: যুক্তরাষ্ট্রের MTSU ইউনির University Police Department এর ৫ সপ্তাহব্যাপী Rape Aggression Defense (RAD) ক্লাসের জন্যে সাইন-আপ ওয়েবপেজ (https://mtsunews.com/summer-2017-rad-classes/)  থেকে সংগৃহীত।

পরিশেষে একটি কথা বলতে চাই; যারা আজ ধর্ষণ- যৌন নির্যাতনের ধারাবাহিক ঘটনাগুলিতে, বিচারহীনতায়, ধর্ষণ প্রতিহতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গাফিলতি ও ব্যর্থতায় তীব্রভাবে উদ্বিগ্ন, ক্ষিপ্ত, ক্ষুব্ধ হয়ে ধর্ষকদের পিটিয়ে মারার (কিংবা কুঙ্গ থাঙের মতো খুন না করে পেটানোর) পথ বাতলাচ্ছেন, একইরকম উদ্বিগ্নতা ও ক্ষোভ আমিও ধারণ করি বলে, তাদের প্রতি কোনরকম রাগ-বিদ্বেষ পোষণ করতে পারছি না, এমনকি তাদের অনেকের ঘৃণা-বিদ্বেষের পাত্র হওয়ার পরেও!

অন্তত চলতি এই বিতর্কে যখন গণপিটুনির বিরুদ্ধে থাকা কাউকে কাউকে ধর্ষকপক্ষের ভাষায় কথা বলতে দেখি, যখন দেখি কেউ কেউ অবলীলায় ভিক্টিম ব্লেমিং করছেন, ধর্ষণের ঘটনাকে মিউচুয়াল সেক্স বলে দিচ্ছেন, ভিক্টিমকে যৌনকর্মী বানাচ্ছেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের মাঝে ব্যক্তিগত কোন্দল আবিস্কার করছেন, ধর্ষণের অভিযোগের ব্যাপারে নানা কিসিমের সন্দেহের ডালি খুলে বসছেন, তখন তাদের গণপিটুনির বিরুদ্ধে থাকার চাইতেও ধর্ষকদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো গণপিটুনির পক্ষে থাকা লোকদেরই বেশি আপন ভাবি। আর সে জায়গাটিতেই উদ্বিগ্ন হই আরও বেশি, কেননা খুব ভুল একটি উপায় নিয়ে তারা মাতামাতি করছেন, যা বাস্তবে পরোক্ষভাবে ধর্ষক- নারী নিপীড়ক-নির্যাতকদেরই সহযোগিতা করবে!

কেন ভুল উপায়, সেটিই আসলে এ ক’দিনে অসংখ্যবার বলার চেষ্টা করছি! কুঙ্গ থাঙের মতো যারা “ফেসবুকে”, “অনলাইনে” ধর্ষকদের প্রতি জিরো টলারেন্স দেখাতে চান, তাদেরকে স্বাগত জানাই, যেকোন সময়ে কথা বলতে পারেন, যুক্তি তর্ক করতে পারেন। আমার ভুল দেখিয়ে/ বুঝিয়ে দিতে পারলে, গণপিটুনির পক্ষে দাঁড়াতে সময় নিবো না। কিন্তু, গায়ের জোরে, মোল্লাবাদী আচরণে, বিপক্ষ মত-ভিন্নমতকে থামিয়ে দিয়ে, মিথ্যা অসত্য দিয়ে, আমার/ আমাদের কথাকে বিকৃত করে, যদি মনে করেন ধর্ষণের প্রতি আপনাদের তীব্র লড়াই চালিয়ে যাবেন, তবে বলবো- কোন নৈতিক আন্দোলনই কোনদিন অসততা দিয়ে, মিথ্যা দিয়ে এগোতে পারেনি; ফলে কুঙ্গ থাঙের এরকম ‘অসৎ’ প্রচেষ্টার অর্জন – ব্যক্তিগত কিছু “লাইক”, স্তুতি, বাহবার মাধ্যমে পাওয়া আত্মতৃপ্তি ছাড়া আর কিছু বলে মনে হয় না।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 48
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    48
    Shares

লেখাটি ১৮৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.