পাত্রী চাই

0

সাবরিনা স. সেঁজুতি:

বানর সদৃশ পাত্রের জন্য সুন্দরী, উচ্চশিক্ষিতা, সচ্ছল পরিবারের পাত্রী চাই। পাত্রের বয়স ৩৩ ছুঁই ছুঁই, বাবা মায়ের একমাত্র পুত্র, লেখাপড়ায় মাঝারি। পাত্রের বাবা বিরাট ধনী, আর পাত্র তার অধিকাংশ সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী। ও হ্যাঁ, ছেলের বড় তিন বোন আছেন, তারা সকলেই বিবাহিতা।
রতনের জন্য এরকম একটা বিজ্ঞাপন লেখা যায় কিনা ভাবছিলেন রতনের মামা। মামা রসিক মানুষ। বিয়ে শাদি করেন নাই, চিরকুমার। চিরকুমার হবার পেছনের ইতিহাসটা অবশ্য বেশ লম্বা তবে আজ সে গল্প নয়। আজ কেবল রতনের পাত্রী খোঁজা বিষয়ক জটিলতার গল্প।

পাঁচ বছর ধরে রতনের বাবা-মা রতনের জন্য পাত্রীর সন্ধান করে যাচ্ছেন কিন্তু সৎ ঘরের সৎ পাত্রীর সন্ধান মিলছেই না যেন। তাই আজ সকালে হতাশ হয়ে রতনের একমাত্র মামাকে ডেকে পাঠালেন রতনের বাবা । নাস্তার টেবিলে চায়ের কাপে ফুঁ দিতে দিতে বললেন, ঐ শালা, এবার তুমি-ই দেখ। আমার ছেলের কপাল আবার তোমার মত হলো নাকি? এদিক সেদিক কম তো দেখলাম না, কিন্তু মনের মতো পাত্রী কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। (মামাকে রতনের বাবা কখন তুই, কখন তুমি সম্বোধন করেন । তবে বেশি আবেগ তাড়িত অবস্থায় সাধারণত তুই তুই করেন । বোঝা যাচ্ছে এখনো তেমন একটা আবেগ তাড়িত হন নাই।)
মামা বললেন, দুলাভাই আপনি একদম চিন্তা করবেন না, আমি আজই পেপারে বিজ্ঞাপন দিয়ে দেবো। পাত্রী পাবেন না মানে? পাত্রীর লাইন ধরে যাবে বাড়ির সামনে। দশটা না পাঁচটা না, একমাত্র বাপের একমাত্র পুত্র বলে কথা । ধনীর বাপের নন্দ দুলাল, তিন মেয়ের পর ছেলে, শখ করে ছেলের নাম রেখেছেন রতন, মানে জুয়েল, ডায়মন্ড! আর তার জন্য পাত্রী পাবেন না তা কি হয়?

রতনের বাবা ধমকের সুরে বললেন, আরে শালা, তোমার যত্তোসব রসিকতা। একমাত্র বাপ কিরে? বাপ কি কারো দুইমাত্র হয় নাকি? তোকে যা বলি তাই কর। ঘরে বসে বসে বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে মাতামাতি না করে ভাগিনার জন্য পাত্রী খোঁজ বেটা। ছেলের মাথায় টাক পড়ে যাচ্ছে। পুড়া টাক পরার আগে পাত্রী না পেলে শেষে তালাকপ্রাপ্তা বাচ্চাসহ বউ ঘরে তুলতে হবে। তুই আজই তোর বন্ধু বান্ধবের কাছে খোঁজ লাগা। তোর কিনা এক বান্ধবী ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের? তাকে বল, শুনেছি সে আজকাল ঘটকালি করে বেড়ায়। দেখ না ভাই। মরার আগে ছেলের ঘরে নাতি পুতি দেখে মরতে চাই। তোর বোন প্রতি রাতেই কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করে। আর ভাল লাগে না। সোনার টুকরা ছেলে আমার তার পাত্রী পেতে নাকি এতো ঘাটের জল খেতে হচ্ছে।

রতন সম্পর্কে দুলাভাইয়ের এই উচ্চ ধারণা দেখে মামা মোটেও অবাক হন নাই, বরং অনেক দিন পর ব্যাপক বিনোদন পেয়েছেন। মনে মনে খুব বলতে ইচ্ছে হচ্ছিলো, তালাক প্রাপ্তা বাচ্চা সহ মেয়ে হলেই তো ভালো দুলাভাই। রতনের আর কষ্ট করতে হবে না। তবে আজকের মতো দুলাভাইকে মাফ করে দিলেন মামা, তাকে সান্ত্বনা দিয়ে পাত্রী খোঁজা বাবদ হাজারখানিক টাকা নিয়ে নিজের ঘরে এসে বিজ্ঞাপন লেখায় ব্যস্ত হয়ে গেলেন।

তখন থেকেই মামা একটা জুতসই বিজ্ঞাপন লেখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু পাত্রের বর্ণনা দিতে গেলেই কেমন যেন সবকিছু গুবলেট হয়ে যাচ্ছে। প্রায় ঘন্টা দুয়েক নানবিধ চেষ্টা চালিয়ে ভাবলেন এবার একটা সিগারেট ফুকা যাক । সিগারেটের ধোঁয়ার বিরাট গুণ, কত অসাধ্য সাধন হলো এই ধোঁয়ার বলে। তার তুলনায় রতনের বিয়ে তো তুচ্ছ সমস্যা।
সিগারেট আবার ঘরে ফুকা যায় না, আপার কড়া নিষেধ। তাই সিড়ি বেয়ে ছাদে উঠতে শুরু করলেন মামা। সেই ১৪ বছর বয়স থেকে মামা এই বাসায় থাকেন। রতনের মা তার বড় বোন। বাবা মারা যাবার পর আপা তাকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছিল আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগে। পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে সে ছিল সব থেকে ছোট । রতনের সাথে তার বয়সের পার্থক্যও খুব বেশি না। একসাথেই বড় হয়েছে বলতে গেলে। দুলাভাইও মামা-কে কখন পর ভাবেন নাই ।

লেখাপড়ায় দুলাভাইয়ের পরিবারের তেমন একটা আগ্রহ না থাকলেও মামার লেখাপড়ার ব্যাপারে দুলাভাই সবসময়ই উৎসাহ দিয়েছেন। এ বাড়িতে মামা-ই বলতে গেলে একমাত্র উচ্চ শিক্ষিত অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাশ। তবে সে কারণে তার চিন্তা চেতনার সাথে বাড়ির লোকের খুব একটা যায় না বললেই চলে। তাতে অবশ্য মামার কোন আক্ষেপ নাই, সে আছে তার জগতে। রতনও বড় হবার পর থেকে মামা কাছ থেকে দূরে দূরে । পড়াশুনা ঠিক মতো করলো না। কোন মতে টেনে টুনে ইন্টারটা পাশ করেছে। অবশ্য এর জন্য রতনকে দোষ দেয়া যায় না । অতি আদরের ফল। শুরুর দিকে রতনের জ্ঞান বুদ্ধি যে খারাপ ছিল, তা না। বাবা-মায়ের অতি আহ্লাদে উঠতি বয়সে বখে গিয়েছিল রতন । শেষমেষ আপার কান্না-কাটি, আর দুলাভাইয়ের অনুরোধে মামা নিজে বহু কসরত করে তাকে পথে এনেছিল । এসব ভাবতে ভাবতে ছাদে উঠে এলেন মামা।

ছাদে উঠে দেখেন রতন আকাশের দিকে বেকুবের মতো হাঁ করে তাকিয়ে আছে। মামা গলা খাকারি দিয়ে বললেন, কিরে ভাগিনা, ভাবছিস কী? বিয়ে নিয়ে চিন্তিত? তুই একদম ভাবিস না, এবার তোর বিয়ের দায়িত্ব আমার। আজ সকালেই এই নতুন দায়িত্বে আমাকে বহাল করা হয়েছে। দুলাভাই নিজে ডেকে নিয়ে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন । তোর জন্য পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনটাও মোটামsটি দাঁড় করিয়ে ফেলেছি। সিগেরেটটা ফুকেই সব ফাইনাল করে ফেলবো। খালি বিজ্ঞাপনটা একবার ছাপাতে দে, দেখিস , আমার সোনায় সোহাগা ভাগিনার জন্য হলিউড বলিউডের হিরোইনদের লাইন পড়ে যাবে বাসার সামনে। কিন্তু…!

মামা একটু থামলেন। সমস্যা একটাই। তোর সম্পর্কে দু-একটা ভাল কথাও তো লেখা দরকার বিজ্ঞাপনে, সেটাই ঠিকঠাক মতো বেরুচ্ছে না মাথা দিয়ে। তবে তুই চিন্তা করিস না, বেড়িয়ে যাবে । ধোয়া মাথায় ঢুকলে সব আসান হয়ে যাবে। তা বেটা তুই এতো ভাবছিস কি?
এবার রতন মাথা ঘুড়িয়ে মামার দিকে তাকালো। মামা তোমাকে একটা কথা বলি? তুমি মাথায় হাত দিয়ে বল কাউকে বলবে না?

মামা চিন্তিত হয়ে বললেন, ঘটনা কি রে? কিশোর প্রেমিকের মতো মাথায় হাত দিয়ে কিড়ে কাটতে বলছিস? প্রেমে টেমে পড়েছিস নাকি? দেখ তোকে আগেই সাবধান করে দেই, এই বাসায় প্রেম-ট্রেম করা কিন্তু একদম হারাম । দুলাভাই খবর পেলে তোর প্রেমিকার বাসায় আগুন লাগিয়ে দিয়ে আসবে।
আজাইরা চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল। তোর বিয়ে হবে দুলাভাই আর আপার মন মতো। তুই হলি তাদের একমাত্র উত্তরাধিকারী, বংশের প্রদীপ। যাকে তাকে তো আর তোর বউ করে আনা যাবে না।
রতন বললো, ধুর মামা, তুমিও! তুমিও লেকচার দিয়ে দিলে? তুমি জানো আমার বয়স কত?

মামা বললো, জানবো না কেন, ৩২ বছর ১১ মাস, কিছুদিনের মধ্যে ৩৩ হয়ে যাবি। তবে বিজ্ঞাপনে আমি ৩২-ই লিখবো তুই চিন্তা করিস না।

রতন বললো, বিজ্ঞাপনের চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো। বিজ্ঞাপন দিয়ে বিয়ে হয় না মামা। আর তোমার ৩৩ বছরের বাঁদর সদৃশ ভাগিনার জন্য বলিউড-হলিউড কেন, ঢালিউড-টালিউডের হিরোইনও আসবে না। পাঁচ বছর তো খুব দেখলে। পাত্র-পাত্রীর মুখোমুখি দেখা হবার পরই মেয়ের পক্ষ পিছিয়ে পড়ে। বাবা-মা লোকজনকে বলে তারাই পাত্রী পছন্দ করেনি। কিন্তু সত্যটা হলো, পাত্রী পক্ষই পাত্র পছন্দ করে না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। দুই একজন যদিও বা পছন্দ করে আমার মা-বাবার ডিমান্ড শুনে পালায়। আমার বাপের এতো ধন সম্পত্তি তখন আর কোন কাজে আসে না। কেন কাজে আসে না জানো? কারণ আমার মায়ের চাই রুপসী বউ আর আমার বাপের চাই ধনীর দুলালি শিক্ষিতা। যাতে বউ বিয়ের পর কোটি কোটি টাকাও নিয়ে আসতে পারে আবার শিক্ষিতা-সুন্দরী মেয়েকে ছেলের বউ করে এনেছে সেই দাপটও দেখাতে পারে। কিন্তু একটা কথা ভেবে দেখো মামা, তুমি যখন নিখুঁত পাত্রী খুঁজবে, কী করে ভাবলে পাত্রী পক্ষ নিখুঁত পাত্র খুঁজবে না? শুধু বাপের ব্যাংক ব্যালেন্স দেখেই রাজি হয়ে যাবে? ভালো করে তাকিয়ে দেখো তো আমার দিকে? গায়ের রঙ কালো, লেখাপড়ায় কোনমতে গড়িয়ে গড়িয়ে ইন্টার পাশ, লম্বায় খাটোই বলা চলে, আর মায়ের আদরে ওজন বেড়ে গোলআলুর দশা, বন্ধুবান্ধব গোলআলু বলেই ডাকে। কার ঠ্যাকা পড়েছে গোলআলুর বউ হতে? আর তার জন্য তোমরা খুঁজে বেড়াচ্ছো ক্যাটরিনা কাইফ। অদ্ভুত মামা!

এবার মামা সিগারেটটা হাতে নিয়ে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাগিনার পাশে বসলেন। ভাগিনার পিঠে দুইটা চাপড় দিয়ে বললেন, আই অ্যাম প্রাউড অফ ইউ মাই চাইল্ড! নিজের সম্পর্কে এতোটা স্পষ্ট ধারণা অনেক ছেলেরই থাকে না। তাহলে তুই-ই বল কী করা যায়?

এবার রতন মামার উপর ভরসা ফিরে পেলো, শোনো মামা, প্রায় তিন বছর আগের কথা। বাবা-মা আমাকে এক পাত্রী দেখাতে বাসাবো নিয়ে গিয়েছিল। দেখাদেখির আগে দুইপক্ষ মোটামুটি রাজি-ই ছিল। কিন্তু পাত্রীকে সামনা সামনি দেখে মা বেঁকে বসলো কারণ পাত্রীর গায়ের রঙ নাকি ছবির গায়ের রঙের সাথে মিলে না। মা চায় দুধে আলতা গায়ের রঙ। তা না হলে নাকি বাচ্চা কাচ্চা সব কালা হবে। আমার কিন্তু ওকে বেশ লেগেছিল। আমাদের মধ্যে ফোন নাম্বারও আদান-প্রদান হয়েছিল, ফেইসবুকেও যোগাযোগ ছিল এতো দিন। ওকে আমার খুবই পছন্দ। সেও আমাকে পছন্দ করে, কিন্তু আমরা কেউ-ই বাড়িতে সে কথা জানাতে পারছি না। কারণ, একবার যে বিয়ের কথাবার্তা মা ভেঙ্গে দিয়েছে সে বিয়ের কথা আবার শুরু করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে ওর বাড়ি থেকেও আরো ভাল পাত্রের সন্ধান নিয়ে এসেছে। তাই তারাও আর আমার প্রতি আর আগ্রহী নয়। বুঝতেই পারছো।

মামা ছোট একটা চিৎকার দিয়ে বললেন, আরে আমার বাঘের বাচ্চা। তা সে কথা আগে বলবি তো। এটা কোনো সমস্যা হলো? তোর মা-কে আমি ম্যানেজ করবো। মেয়ের সাথে তুই কথা বল। তাকে জানা, হাতে একদম সময় নাই। আসছে বুধবার তোদের বিয়ে।
রতন বললো, মানে?
মামা বললো, আরে আমার বলদের বাচ্চা বলদ, বসে বসে দিবা স্বপন দেখো? তুই ভেবেছিস আমি যেয়ে আপাকে বলবো, অমনি আপা হাততালি দিয়ে শ্যামা বর্ণের বউ মেনে নেবে! না রে গাধা, তা হবে না। আপা আমাকে বটি দিয়ে দৌড়ানি দিবে ।

আগামী বুধবার বাসাবো কাজী অফিসে তোদের বিয়ে। বিয়ে করে বউ নিয়ে সোজা বাসায় আসবি। বিয়ে হয়ে গেলে তখন আর কে কারে দৌড়ানি দেয়? বিয়ের অন্যান্য ব্যবস্থা আমি করছি, তুই শুধু মেয়েকে সামলা।

রতনের মুখে ১০০ ওয়াটের বাতি জ্বলে উঠলো। সেও মনে মনে সেরকমই ভেবেছিল, কিন্তু সাহস পাচ্ছিল না। নীরা তো আগেই রাজি। হ্যাঁ, পাত্রীর নাম নীরা। যার সাথে রতন প্রায় তিন বছর ধরে গোপনে প্রেম করে যাচ্ছে।
মা হাততালি দিক আর না দিক, রতনের মামা ছাদের কোনায় গিয়ে দু’হাত মেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, আজ থেকে আমার ভাগিনায় পাত্রী খোঁজার সমাপ্তি।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 206
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    206
    Shares

লেখাটি ১,৪০৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.