বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, মনটাকে ভালোবাসুন

0

তনয়া দেওয়ান:

কদিন আগে গেলাম এক সুপার শপে সানস্ক্রিন লোশন আর লিপস্টিক কেনার জন্য। বেশ কয়েকটা লিপস্টিকের কালার পছন্দ করতে গিয়ে একটু সময় নিয়ে চিন্তা করছিলাম। হঠাৎ শপের এক মেয়ে বললো, এতো টেনশন করছেন কেন আপু, “আপনি তো ফর্সা, দেখতেও ভালো। যেকোনো কালারেই মানাবে (বলে রাখা ভালো আমি কিন্তু মোটেই ধবধবে ফর্সা নই এবং দেখতে আহামরি সুন্দরও নই)।

তারপর একটু নিচু স্বরে মন খারাপ করে বললো, আমি তো দেখতে কালো, আমাদের মতো কালো মেয়েদেরই না কতকিছু ভাবতে হয়। কথাটা শুনেই মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, কী মিষ্টি মুখ! নাক-চোখ সবই ঠিক আছে, কোন অঙ্গহানীও নেই। তাও সে কি এক অদ্ভুত মানসিক ব্যাধীতে আক্রান্ত। বুঝলাম, কালো বলে কি পরিমান হীনমন্যতায় ভুগছে! (ভুগছে বললে ভুল হবে, এই সমাজ বাধ্য করছে তাকে হীনমন্যতায় ভুগতে)। মেয়েটাকে প্রতি উত্তরে বললাম, কালোরা সুন্দর হতে পারে না বুঝি! তারপর সে বললো, “আমি কালো বলে কত কথা শুনতে হয়। কালোদের এই কালারে মানায় না, ওই কালারে মানায় না। মেকাপ করলেও শুনতে হয় মেকাপ সুন্দরী।”

মেয়েটাকে বললাম, দেখেন, সৃষ্টিকর্তার প্রতিটা সৃষ্টিই সুন্দর। কালোও সুন্দর হতে পারে, ফর্সাও সুন্দর হতে পারে। আপনাকে নিয়ে কে কি ভাবছে, তাতে কি আসে যায়, নিজেকে নিয়ে আপনি কি ভাবছেন সেটাই তো বড় বিষয়।

এবার আসি বহুল আলোচিত সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ফেসবুক এ, শুধু যোগাযোগ না, মাঝে মাঝে মনে হয় এটা পাত্র-পাত্রী নির্বাচন মাধ্যমও! কিছুদিন আগে আমার এক মধ্য বয়স্ক আত্মীয় এসে ফেসবুকের একটা মেয়ের আইডি ও ছবি দেখিয়ে বললো, “দেখো তো, এই মেয়েটা দেখতে কেমন? চাল-চলন,চরিত্র সম্পর্কে একটু খোঁজ নিও তো!” যাই হোক, মেয়েটা আমার ফ্রেন্ড লিস্টে দীর্ঘদিন ধরে থাকায় এবং ছোট বোনের বান্ধবী হওয়ায় মেয়েটাকে কিছুটা হলেও জানি। তবে সেই বয়স্ক আত্মীয়কে বলতে পারলাম না যে, এই মেয়ে আপনার ছেলের জন্য ওভার কোয়ালিফাইড।

আরেকটা কাহিনী বলি, এক বাঙালি বন্ধু সুদূর রাশিয়া থেকে শুধুমাত্র ফেসবুকে দেখে এক মেয়ের উপর ক্রাশিত হয়েছে,দেশে এসে সামনাসামনি মেয়েটাকে দেখে তার হৃদয় চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল, কারণ মেয়েটা নাকি “কুচকুইচ্চা কালা” (বন্ধুর ভাষায়)। এ রকম আরেকটা কাহিনী, এক ছেলে সম্প্রতি ছ্যাঁকা খেয়েছে, তাই তার গার্ল ফ্রেন্ড লাগবে, তাও তার এক্স গার্ল ফ্রেন্ড থেকে বেশি সুন্দর হতে হবে, তাই সে সুন্দরী রমনীর খোঁজে ফেসবুকে নামলো কোমর বেধেঁ।

আপনাদেরকেই বলছি, এবার একটু থামুন। ফেসবুক কখনো কাউকে পরিমাপের মাপকাঠি হতে পারে না। সবাই নিজের ভালোটাকেই সবার সামনে তুলে ধরতে চাই, এটাই মানুষের বৈশিষ্ট্য। শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য না, মানুষ তার ভালো চারিত্রিক গুণাবলিও সবার সামনে তুলে ধরতে চায়, কাজেই ভার্চুয়াল লাইফ বা রিয়েল লাইফে দূর থেকে কাউকে বোঝা যায় না।

আর মানুষ নিজেকে কিভাবে অন্যের সামনে উপস্থাপন করবে এটা তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার, এটা একটা মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা। ফিল্মের নায়িকাদের মতো বাস্তব জীবনের মেয়েরা এতো গোছানো হয় না, খুঁত ছাড়া এতো সুন্দর কেউ হয় না, যে ঐশ্বরিয়ার রুপ সকলের চোখ ধাঁধায় ফেলে দেয় সেই ঐশ্বরিয়াও সকালবেলা উষ্ক-খুসকো চোখে ঘুম থেকে উঠে, ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর আগে তাকেও ঘন্টারও অধিক সময় নিয়ে মেকাপ নিতে হয়। তাই আগে ভাবুন, আপনি কী চান?

একজন সুন্দর, মেকাপধারী, স্মার্ট, অহংকারী ললনা যে সর্বদা আয় থেকে ব্যয় বেশি করে এমন একটা মেয়ে চান? নাকি যার মন সুন্দর, উদার, যে সবার সাথে মিলেমিশে থাকতে ভালোবাসে, যে সর্বদাই অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ায় এবং যে আগামীর সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে, এমন একটা মেয়ে চান?

এক্ষেত্রে অবশ্য মেয়েরাও কম যায় না, ইউ ক্যাম, বিউটি ক্যাম, ডিএসএলআর দিয়ে ছবি তোলার পরও আরো এডিট করে নিজেকে সম্পূর্ণ অন্য রুপ দিয়ে ফেসবুকে ছবি আপলোড করে, সে বাস্তবে যা না। শুধু কি তাই, একেকটা মেয়ে সুন্দর স্ট্রেইট চুল পেতে পার্লারে দিয়ে আসে হাজার হাজার টাকা। কোন বিয়ে বা জন্মদিনের পার্টিতে চলে একেকজনের মেকআপ ভর্তি এক্সট্রা ওভার লুক।

মেয়েদেরকে বলছি, শুধুমাত্র আপনার বাহ্যিক রূপ দেখে কেউ আপনাকে পছন্দ করুক আপনারা নিশ্চয়ই তা চান না! যদি তাই না চান, তাহলে এই রুপ দেখিয়ে ছেলে পটানোর ইচ্ছাটা আগে বন্ধ করুন, নিজের জ্ঞান বুদ্ধি দিয়ে নিজের প্রতিভাকে বিকশিত করুন, দেখবেন, আপনার সুন্দর সরল মন, আপনার গুণ, আপনার প্রতিভা, আপনার বিদ্যা-বুদ্ধি দেখে কেউ না কেউ ঠিকই ভালোবেসে সারাজীবন আপনার পাশে থাকবে।
আর যদি আপনার যোগ্য সেরকম কোন ছেলেকে না পান, তাহলে গাধা, বলদ, বেকুব একটার সাথে ঝুলে যাওয়ার কী দরকার, আপনিই বলুন! যে আপনার মনের সৌন্দর্যই কখনো বুঝতে পারেনি, সে কীভাবে আপনার যোগ্য হতে পারে? বাচঁতে হলে জীবনসঙ্গী নিয়ে বাচঁতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই। বিয়ে না করেও একলা অনেক মানুষ দিব্যি সুখে বেচেঁ আছে। বিশ্বাস না হলে আপনার আশেপাশেই তাকিয়ে দেখুন। শুনেছেন নিশ্চয়ই, “দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো”।

যাই হোক, আপনার যদি মেকাপ করতে ভালো লাগে তাহলে দশজনে যাই বলুক, আপনি মেকাপ করবেন, তাতে কে কী বললো কি এসে যায়! কিন্তু শুধুমাত্র নিজের দুর্বলতা ঢাকার জন্য যদি মেকাপ করেন, তাহলে বলবো আপনার নিজের উপড় বিশ্বাসটাই নেই। মনে রাখবেন দিনশেষে আপনি আপনারই। বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়েও মনের সৌন্দর্যই বেশি প্রয়োজন। নিজেকে বিশ্বাস করতে শিখুন যে আপনিও সুন্দর, আপনারও যোগ্যতা আছে নিজের বিদ্যা-বুদ্ধি দিয়ে নিজের পায়ে দাড়াঁনোর, নিজের সৌন্দর্যকে নিজের প্রতিভাকে যদি নিজেই না বুঝেন, না চিনেন, তাহলে একবার ভাবুন তো, অন্যরা কীভাবে বুঝবে?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.7K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.7K
    Shares

লেখাটি ১,৭০৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.