আশ্রয়ার্থীর ক্যাম্প থেকে

0

ফাহমি ইলা:

রূপকথা নয়-১

রোমেলা ও জমিলা, দু’বোন। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসার সময় তারা বাবা-মা’কে হারায়। রাতের অন্ধকারে তাড়াহুড়া করে নৌকায় উঠছিলো সবাই, দুই বোন কখন যেনো পরিবার থেকে সরে পড়ে। দূরে আরেক নৌকায় বাবা-মা আর ছোটভাইকে উঠতে দেখে। অত্যধিক ভারে সামনের নৌকা কাত হয়ে ডুবে যায়, চোখের সামনে দেখে বাবা-মার মৃত্যু। পরবর্তীতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জায়গা হয় একজন কম্যুনিটি লিডারের বাড়িতে।

রোমেলা ও জমিলার থাকবার ঘরটিতে বড়সড় দুটো সাউন্ডবক্স, প্রসাধন সামগ্রী, জমকালো পোশাক তাক করে সাজানো। ওদের সাথে কথা বলতে যতবার ঢুকেছি, ওরা কেমন যেনো ভয়ে মিইয়ে যেত, মিনমিন করে বলতো খুব ভালো আছে এখানে, ওদের কিছুই দরকার নেই।

ফস্টার কেয়ারার বাবা-মা ঘরে ঢুকলে রাজ্যের ভয় বাসা বাঁধতো ওদের চোখে, চঞ্চল কথাবার্তা হারিয়ে যেত। গৃহকর্ত্রী এক মিনিটের জন্য চোখের আড়াল হতো না কোনো বাঙালি এলে, ঠায় বসে থাকে পাশে। বুঝিয়ে-শুনিয়ে পাশের ঘরে পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করা হলো, তারা ভালো আছে কিনা, স্কুলে যেতে চায় কিনা, তাদের কী প্রয়োজন।

হয়তো বহুদিন কিশোরী দুটো ভালো কথা শোনেনি, হয়তো ওদের অনেকদিন কেউ স্নেহের পরশ বুলিয়ে দেয়নি। গাঢ় কাজল দেয়া ডাগর চোখ গড়িয়ে পানি পড়তে থাকে, গালের পাউডার ধুয়ে যেতে থাকে সেই পানিতে, আড়চোখে জমকালো পোশাকের দিকে তাকায়, সাউন্ডবক্সের দিকে তাকায়। বুঝে উঠেও যেনো বুঝতে পারি না অনেককিছু। শুধুই পর্যবেক্ষণ দিয়ে কী করা সম্ভব?

ওদের নির্ভয়ে শিশুবান্ধব কেন্দ্রে আসতে বলি, ওখানে পড়াশোনার ব্যবস্থা আছে, খেলাধুলার ব্যবস্থা আছে। মেয়ে দুটোর চোখ ক্ষণিকের জন্য চকচক করে ওঠে। মেয়ে দুটোর সাথে দেখা হয়েছিলো তিন কি চারবার। এরপর সপ্তাহখানেক যেতে পারিনি আরো অনেক কেইস হাতে থাকবার জন্য। একদিন গিয়ে দেখি মেয়ে দুটো নেই। আশ্রয়দাতা জানায়, ওরা কোথায় পালিয়ে গেছে কেউ জানে না।

রূপকথা নয়-২

সুফিয়া ছয় মাসের গর্ভবতী। মিয়ানমার ছেড়ে এদেশে যখন ঢোকে তখনো ছয়মাসের গর্ভবতী ছিলো। একটি ছেলে সন্তান জন্মেছিলো গত নভেম্বরে। সুফিয়ার বয়স চব্বিশ অথবা পঁচিশ, সন্তান পাঁচটি। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করছে গত এক বছরের কাছাকাছি সময় ধরে। গত দুদিন যাবৎ তীব্র পেটের ব্যথায় অস্থির। স্বামী আজ সাতদিন বাড়ি ফিরেনি। ভলান্টিয়ার মারফত খবর পেয়ে ছুটে গেলাম সুফিয়ার ছোট ঘরে। দশহাত বাই দশহাতের ছোট ঘরে পাঁচটি শিশুসন্তান সমেত ছয়মাসের গর্ভবতী সুফিয়া কাতরাচ্ছে। দুদিন আগে রাতের অন্ধকারে বাথরুমে যেতে গিয়ে আছাড় খেয়েছিলো। এ অবস্থায় দুদিন সন্তানদের রান্না করে খাইয়েছে, পাহাড়ের নিচ থেকে পানি এনেছে। ওর চোখমুখ দেখে আতংকে নিজের শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়ের স্রোত বয়ে যায়। দ্রুত একটি বিদেশী সংস্থায় রেফার করি। এম্বুলেন্স এলো, সুফিয়াকে তোলা হলো। অস্থির কিন্তু কিছুটা শান্ত মনে অফিসে ফেরত এলাম। কিছুক্ষণ পর জানতে পারলাম পথের মধ্যেই মৃত শিশুর জন্ম দিয়েছে সুফিয়া।

এর ঠিক তিনদিন পর তাকে দেখতে গেলাম। সুফিয়া রান্না করছে সন্তানদের জন্য, পানি তুলে এনেছে পাহাড়ের নিচ থেকে কিছুক্ষণ আগে। সে ক্লান্ত চোখে হাসিমুখে ভাত খাওয়ার অনুরোধ করে, তার স্বামী তখনো বাড়ি ফেরেনি।

রূপকথা নয়-৩

জান্নাতের বয়স চার বছর। শিশুটি একমাত্র তার পালক বাবা-মা এবং তার ঘরের আশপাশের পরিচিত কয়েকজন ছাড়া কাউকে দেখলেই চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। ছলিম উদ্দিন-হাফসা বেগম নিঃসন্তান। রাতের আধারে মিয়ানমার পার হবার সময় জঙ্গলে হঠাৎ শিশুর কান্না শুনতে পায়, কাছে গিয়ে দেখে আহত অবস্থায় তিন বছরের জান্নাত পড়ে আছে গাছের গোড়ায়। শিশুটিকে বুকে চেপে সে রাতে বাংলাদেশে ঢোকে তারা। এরপর থেকে শিশুটি তাদের কাছে আছে, নিজের সন্তানের মত আদরযত্নে রেখেছে।

হাফসা বেগমের কাছে জানতে চাইলে একদিন কান্নায় ভেঙে পড়েন। শিশুটিকে নিয়ে ক্যাম্পে আসার কয়দিন পর ত্রাণ নিতে গেলে শিশুটির বাবা কোত্থেকে এগিয়ে এসে কথা বলে, শিশুটিও তার বাবাকে চিনতে পারে। হাফসা জানায়, শিশুটির বাবা শিশুটিকে ফেলে বাংলাদেশে আসে, সে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে, প্রথম স্ত্রী সন্তান জন্মের পর মারা গেছে। এখন সে জান্নাতকে ফেরত চায় কেননা জান্নাতের খাদ্যবস্ত্রের যোগান দিচ্ছে বেশকিছু এনজিও।

হাফসা বেগমের কান্নার বেগ থামে না, ফুঁপিয়ে চলেছে। ছলিম উদ্দিন জানায়, মাসে এক-দুইশ টাকা দিলে জান্নাতের ‘আসল বাবা’ এসে ফেরত চলে যায়, শিশুটি এখন হয়ে উঠেছে তাদের ‘আসল সন্তান’। এই প্রাপ্তির জন্য এক-দুশ টাকা গচ্চা দেয়া তাদের কাছে কোন ব্যাপারই না।

রূপকথা নয়-৪

আমজাদ বড় ভাইয়ের সাথে মিয়ানমার থেকে এদেশে এসেছে। আমজাদের বয়স নয় বছর। বিদেশি এনজিওর দেয়া তেরপলের নিচে তাদের বসবাস। ঘরে ঢুকে দেখা গেলো ত্রাণের চালডাল ধুয়ে খিচুড়ি বসিয়েছে চুলোয়। আমজাদের বড় ভাই সপ্তাহে একবার আসে, কোথায় কাজ করে আমজাদ জানে না। প্রতি সপ্তাহে এসে কিছু টাকা তার হাতে গুঁজে দিয়ে সকাল হলেই চলে যায়। আমজাদ সারাদিন ঘরের সামনে অন্যান্য সমবয়সীদের সাথে খেলে, নিজেই রান্না করে খায়, পাহাড়ের মাঝ বরাবর বসানো নলকুপ থেকে পানি তুলে আনে, ঘরদোর পরিষ্কার করে। তার বাবা-মা সে ছোট থাকতেই মারা যায়, সে এখন অনেক বড়! পুরো সংসারের দায়িত্ব তার ওপর। আমজাদ দূরে পাহাড়ে যায় মাঝে-মধ্যে, রান্নার জন্য লাকড়ি জোগাড় করে, সেই ভারী বোঝা মাথায় বয়ে নিয়ে আসে। ত্রাণের ভারী বস্তাও সে একাই বইতে পারে। কাছেই শিশুবান্ধব কেন্দ্রে যায় প্রায় প্রতিদিন। ওদের শেখানো ছড়া আওড়ে যায় মুখস্ত। ঘরের বেড়ায় A4 সাইজের একটা পৃষ্ঠায় ঝুলছে অনেকগুলো গাছ, গাছের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে নদী, নদীর পাশ দিয়ে অনেক মানুষ হেঁটে চলেছে, ওদের মাথায় পিঠে বোঝা।

আমজাদ স্মৃতি আওড়ে এঁকেছে ছবিটা। শিশুবান্ধব কেন্দ্রের রংপেন্সিলের ছোঁয়ায় ছবিটা কেমন জীবন্ত দেখায়। আকাশে দিনের সূর্য আর নদীতে বিপদের বন্ধু নৌকা আঁকতে ভোলেনি সে! ছবিটির দিকে ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম সরু কালো লম্বা কী যেনো আঁকার চেষ্টা করেছে সে, গাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে। জিজ্ঞেস করতেই বললো বন্দুক। শিশুর মনঃস্তত্বে বন্দুকের নল শুধু দেখা যাচ্ছে, যে নল থেকে মুক্তি পেতে সে ভাইয়ের হাত ধরে চলে এসেছিলো ছবিতে আঁকা নদীর এপাড়ে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 233
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    233
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.