ধর্ষকের প্রতি ‘তাৎক্ষণিক করণীয়’ নিয়ে চলমান বিতর্ক-২

0

ইমতিয়াজ মাহমুদ:

আপনারা যারা ধর্ষকের প্রতি ‘শূন্য সহানুভূতি’ দেখানোর পক্ষে, আপনারা ঠিকই আছেন। ধর্ষকের প্রতি আপনি সহানুভূতি দেখাবেন কেন! সেই জায়গায় আপনার সাথে সম্ভবত খুব বেশী লোকের মতবিরোধ হবে না। কিন্তু প্রশ্নটা ধর্ষক বা ড্রাগ ডিলারের প্রতি সহানুভিত দেখানোর প্রশ্ন না। প্রশ্নটা হচ্ছে সন্দেহের বশে মানুষকে মারার প্রশ্ন। সন্দেহের বশে মানুষ মারা অন্যায়। এমনকি প্রহার করাও অন্যায়। লাঞ্ছিত করা সেটাও অন্যায়। ‘শূন্য সহানুভূতি’ বা ‘পূর্ণ বিরাগ’ দেখাবেন অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর।

এখন প্রশ্ন করতে পারেন যে সন্দেহের বশে মানে কি? সন্দেহের বশে মানে যেটা বুঝাতে চাচ্ছি সেটা হচ্ছে যে কেবলমাত্র একজন অভিযোগ করলো বলেই তাকে শাস্তি দেওয়া। অভিযোগটা প্রমাণিত হওয়ার আগেই অভিযুক্তকে শাস্তি দেওয়া। এটা অন্যায় এটা ভুল এটা আরেকটা অপরাধ।

এখন আপনি বলতে পারেন যে আপনি নিজের চোখে এমন ঘটনা দেখলেন যেটা দেখে আপনার মনে হয়েছে যে লোকটা সম্ভবত ধর্ষণ করছে বা ধর্ষণের চেষ্টা করছে। তাইলেও কি আপনি ঐ সম্ভাব্য অপরাধীটিকে মারবেন না? না, কেবল মাত্র মারার জন্যে মারবেন না। বাধা দেবেন, পুলিশে দেওয়ার চেষ্টা করবেন, ধরতে চেষ্টা করেন। এইসব করতে গিয়ে যদি বল প্রয়োগ করতে হয়, করবেন। কিন্তু ‘পাইছি ধর্ষক’ বলে যে মারপিট করা, সেটা অপরাধ।

আপনি যদি নিজের চোখে এম ঘটনা দেখে যেটাকে অপরাধ মনে হয়, আপনার তখন দায়িত্ব হয় আদালতে গিয়ে স্বাক্ষি দেওয়া, যা দেখেছেন সেটা সৎভাবে কোর্টের সামনে বলা।

এই যে নিজের চোখে দেখার ব্যাপারটা, এটা যে কতোটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে নিয়ে আসতে পারে তার অনেক ঘটনা আমি দেখেছি। একটা ঘটনার কথা বলি। ঘটনাটা দুইজন শিশু অধিকার কর্মীর জীবন তছনছ করে দিয়েছে। ওরা দুইজন কাজ করতেন একটা মানবাধিকার সংস্থায়- বেশ পরিচিত সংস্থা। কাজ করতেন শিশু অধিকার ইত্যাদি নিয়ে।

কাজের অংশ হিসাবেই বস্তিতে আর অপেক্ষাকৃত অস্বচ্ছল মানুষদের বাস যেখানে সেইসব এলাকায় গিয়ে স্কুলে যায়না এরকম শিশুদের নিয়ে নানারকম কর্মকাণ্ড করতেন। একদিন এইরকম কাজ করতে গেছে ওরা একখানে সেখানে কিছু লোক ওদেরকে ধরেছে শিশু পাচারকারী হিসাবে। যারা ধরেছে ওদের ‘নিজের চোখে দেখা’ ঘটনার বর্ণনা মুহূর্তের মধ্যে কয়েকশ লোক জড়ো করে ফেলে আর ওরা সকলেই নির্দয়ভাবে মেয়ে দুটিকে প্রহার করতে থাকে।

এখানেই শেষ না, মেয়ে দুটিকে আহত অবস্থায় পুলিশে সোপর্দ করা হয়, থানায় নিয়ে পুলিশ কয়েক দফা ওদেরকে মারধোর করে। খবর পেয়ে ওদের সংস্থা থেকে উকিল সাহেবরা যায়, বড় কর্মকর্তারা যায়, ওদেরকে বাঁচাতে চেষ্টা করে। কিন্তু ঐ যে লোকজন ‘নিজের চোখে’ ঘটনা দেখেছে সেই কারণে মেয়ে দুটিকে বের করে আনতে বেশ অনেকদিন সময় লেগে যায়। যারা নিজের চোখে ঘটনা দেখেছিল ওরা কিন্তু ঠিকই দেখেছিল যে ওরা কয়েকটা শিশুকে নিয়ে যাচ্ছে।

এই দুইজনের একজনের কথা আমার মনে আছে। আমি সর্বশেষ যখন তাঁকে দেখেছি তখনো তিনি মানসিক ধকল কাটাতে পারেননি, যদিও ঘটনার পর ইতিমধ্যে বহুদিন পার হয়ে গিয়েছিল।

না, বিশেষ ঐ ঘটনায় মার খাওয়া লোকটি অপরাধী হ্যাঁ কি না সেটা নিয়ে তর্ক হচ্ছে না। তর্ক হচ্ছে আপনি সম্ভাব্য অপরাধীকে আদালতে দোষী প্রমাণিত হবার আগেই গণধোলাই দিবেন সেটা ঠিক কিনা। সেটা ঠিক না। সেটা অন্যায়।

কুঙ্গ থাং যে স্যাটায়ার লিখেছেন, তিনি তো ভালো লেখনই, ঈর্ষণীয়- কিন্তু এই স্যাটায়ারটা ভ্রান্তিমূলক।

কেন ভ্রান্তিমূলক? বলছি।

বিনাবিচারে হত্যা বা অন্য প্রকার শাস্তি দেওয়ার যারা বিরোধিতা করেন, তারা কেউই কিন্তু আত্মরক্ষার অধিকারের বিরুদ্ধে বলেন না। আত্মরক্ষার অধিকার একটা স্বীকৃত অধিকার। সেজন্যে যে মুল দৃশ্যপট নিয়ে কুঙ্গ স্যাটায়ারটা ফেনিয়েছেন, সেই মুল প্রেমিসটাই তো ভ্রান্ত।

আমার ধারণা ছিল কুঙ্গ থাং নিজেও বিনা বিচারে শাস্তির বিরোধী। বুদ্ধিমান লোক মাত্রই তাই।

লেখা সংশ্লিষ্ট কিছু লিংক:

https://womenchapter.com/views/27272

https://womenchapter.com/views/27266

https://womenchapter.com/views/27262

 

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 51
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    51
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.