ধর্ষকের প্রতি ‘তাৎক্ষণিক করণীয়’ নিয়ে চলমান বিতর্ক-১

0

বৈশালী রহমান:

ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত কাউকে বিনা বিচারে শাস্তি দেওয়া বা মব জাস্টিসের হাতে তুলে দেওয়ার প্রতি আমার সমর্থন নাই। ইন ফ্যাক্ট, অন্য অনেকেরই হয়তো নাই। কিন্তু যে ঘটনা প্রসঙ্গে কুঙ্গ থাঙদা একটি স্যাটায়ার করেছেন, তার সাথে প্রাসঙ্গিক বিষয় হচ্ছে একটা ধর্ষণের ঘটনা চাক্ষুষ দেখলে কী করতে হবে সেটা।

চোখের সামনে একটা ধর্ষণের ঘটনা দেখলে ধর্ষককে পুলিশে দিতে হবে বুঝলাম। কিন্তু সেই সাথে ধর্ষককে যে ধরেছে সে দুইটা থাপ্পড় লাগিয়ে দিলে কেন অসভ্য, বর্বর, অমানুষ হয়ে যাবে, এইটা আমি বুঝলাম না। আমার কমনসেন্স বলে, চোখের সামনে যদি একটা ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, আমার প্রথম কর্তব্য ধর্ষককে থামানো। এই জন্য ধর্ষকের শরীরের যে স্থানে আঘাত করার দরকার, আমি সেই স্থানেই করবো। পুলিশে ফোন করে ভ্যাটকায়ে দাঁড়ায়ে থাকবো না যাতে করে ধর্ষক পালিয়ে যেতে পারে।

এক ভাই একবার একটা উদাহরণ দিয়েছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার এক লোক বাসা থেকে বের হয়ে দেখে তার দশ বছরের মেয়েরে এক ব্যাটা রেপ করতেছে। সে ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে রেপিস্টরে আঘাত করে। এতে করে কিন্তু ওই লোককে কেউ অসভ্য বর্বর হিংস্রও বলে নাই, আদালতে ওই লোকের কোনো শাস্তিও হয় নাই। স্ট্যানফোর্ড রেপ কেইসের কথা হয়তো অনেকের মনে আছে। সেখানেও কিন্তু ধর্ষককে ধর্ষণ করার সময় দুইজন ছাত্র হাতেনাতে ধরে ফেলে এবং পিছনে দৌড়ায়ে ধর্ষককে নিজেদের সমস্ত শরীরের ওজন দিয়ে চেপে ধরে রাখে যতোক্ষণ পর্যন্ত না পুলিশ এসে পৌঁছায়। তাদের এই চেপে ধরার কারণে ধর্ষক ব্যথা পেয়ে মানবতায় কোনো ফাঁক থেকে গেছিল কিনা এই প্রশ্ন কিন্তু কেউ করেনি। ধর্ষক রনির ক্ষেত্রেও এরকম একটি বিষয় ঘটার সম্ভাবনা আছে। সে যখন গাড়িতে ধর্ষণ করছিল, তখন গাড়ি ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়ে যাওয়ায় বহু লোক ঘটনাটি দেখে ফেলে এবং ধর্ষককে টেনে হিঁচড়ে গাড়ি থেকে নামায় বলে বিভিন্ন পোস্টে এবং খবরের কাগজে রনির স্বীকারোক্তি হিসেবেই এসেছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী জানা যায়, রনিকে কেউ পিটিয়ে আধমরা বানায় নাই, মেরেও ফেলে নাই। চড় থাপ্পড় দিয়ে তাকে পুলিশের হাতেই তুলে দেওয়া হয়েছে।

এখন এই ঘটনার সুবাদে “ধর্ষক মনে করে নিরীহ লোককে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেললে কী হবে” এই নাকি কান্নারও কোনো মানে আমি বুঝলাম না। বাংলাদেশে একটা মেয়ে “আমাকে ধর্ষণ করছে” বলে চিল্লালে লোকজন এসে ধর্ষককে পিটিয়ে মেরে ফেলে এই যাদের ধারণা, গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায় যে বাংলাদেশের সামাজিক পরিস্থিতি সম্পর্কে এদের ন্যূনতম আইডিয়া নাই। বাংলাদেশে হ্যারাসমেন্টের প্রতিবাদ করার কারণে বখাটেরা মেরে ফেলছে এরকম উদাহরণ আছে, কিন্তু একটা মেয়েকে হ্যারাস করার কারণে লোকজন ধরে কাউকে পিটাইছে, এরকম কিছু কখনো চোখে পড়ে নাই।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যদি এতো ধর্ষণ এবং যৌন নির্যাতন বিরোধী হইতো, তাহলে বখাটেদের হাত থেকে বাঁচতে একটা দশ বছরের মেয়েরে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে হতো না। হাজার হাজার লোকের চোখের সামনে একটা মেয়েকে কুপিয়ে মেরে ফেলতে পারতো না কেউ। পহেলা বৈশাখে রাস্তায় দল বেঁধে নারীদের শাড়ি খুলে নেওয়া দলটি আস্ত শরীরে ঘরে ফিরতে পারতো না। বাংলাদেশে বিষয়টা প্রকৃতপক্ষে উল্টা হয়।

অর্থাৎ, একটা মেয়েরে রাস্তায় হেনস্থা করা হলে সে যখন চিৎকার করে, তখন তাকেই উল্টা ব্লেইম করে আশেপাশের লোকজন। বলে, “আপনি মেয়েমানুষ হয়ে গালি দিচ্ছেন কেন, বা মারছেন কেন”। ঠিক এই কারণেই আমি মনে করি যে, ওইদিন গাড়িতে ধর্ষণ একেবারে চোখের সামনে দেখে ফেলাতেই ধর্ষককে ধরে পিটানোর মতো ঘটনা ঘটেছে। ঠিক যেটা ছাত্রলিগ নেত্রী এশার ক্ষেত্রে ঘটেছিল। অর্থাৎ, বহুদিনের জমানো ক্ষোভ একটা ঘটনার কারণে ফেটে পড়ার ফলে গণরোষ। অথচ মজার ব্যাপার হলো, ছাত্রলিগ নেত্রী এশার ক্ষেত্রে যারা গলায় জুতার মালা পরানো সমর্থন করেছেন, সেই একই মানুষজন রাস্তায় ধরা পড়া ধর্ষককে লোকে ধরে মাইর দিলে গোস্বা করেন।

এখন এই কথাগুলো বলার জন্য “মানবিক” নারীবাদী তালিকা হতে খারিজ হইয়া যাই কিনা জানি না, তবে এটা জানি, কোনো দিগ্ভ্রান্ত অনলাইন পীর এবং তাঁদের মুরিদকুল আমাকে নারীবাদ বা মানবতাবাদের সার্টিফিকেট দেওয়ার যোগ্যতা রাখেন না।

এ সংক্রান্ত কিছু লেখার লিংক:

https://womenchapter.com/views/27266

https://womenchapter.com/views/27262

 

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 63
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    63
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.