মব জাস্টিস-মব লিঞ্চিং এর সংস্কৃতি ও কিছু সমাজ-মনোবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

0

সুমিত রায়:

মব লিঞ্চিং এর ব্যাপারটা এখন আমরা প্রায়ই শুনি। পাকিস্তানে ব্লাসফেমির অপরাধে মাশাল খানকে মব লিঞ্চিং এর মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছিল। সাথে গোমাংশ থাকার সন্দেহে বা গোহত্যার জন্য মানুষকে মব লিঞ্চিং এর মাধ্যমে হত্যা করা হয়। অবশ্য মব ক্ষেপলেই যে সবসময় লিঞ্চিং বা হত্যা হবে, তা বলা যায় না।

অনেক সময়ই শুধু গণপিটুনি দেয়া হয় বা ভাংচুর করা হয়। মবরাই সব করে। এগুলোর প্রতি মানুষের রিয়েকশন অনেকরকম দেখা যায়, ধর্ষক, চোর, অপরাধীদের গণপিটুনি দেয়াতে, বা অনেক সময় লিঞ্চিং করাতে অনেকে সমর্থন জানান, এক্ষেত্রে এসব মব জাস্টিসে সমর্থন অনেক বেশি দেখা যায়, আবার ব্লাসফেমির কারণে, গোহত্যার কারণে, গরুর মাংস বহন করার কারণে, পাবলিক প্লেসে কিস করার কারণে, কোন মেয়ে ইভটিজিং এর প্রতিবাদ করার কারণে (হ্যাঁ, ঢাকায় এটাও হয়েছে) যখন গণপিটুনি দেয়া হয়, মব লিঞ্চিং করা হয়, তখন এটা নিয়ে অনেক প্রতিবাদ তৈরি হয়। তো, মব জাস্টিসের এরকম নৈতিক-অনৈতিক বিষয়ে পরে আলোচনা করা যাবে। আগে এটার সাইকোলজিক্যাল বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করে এর প্রকৃতি জেনে নেয়াটা হয়তো জরুরি।

সমাজ মনোবিজ্ঞানে জনতা (Crowd) একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ৷ বলা যায় মনোবিজ্ঞান চর্চার গোড়ার দিক থেকে এই বিষয়ের উপর পর্যালোচনা চলে আসছে৷ ফরাসি মনোবিজ্ঞানী লে বোঁ (Le Bon) ১৮৯৫ সালে Crowd নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করলে অনেকেই এই বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

জনতা কতকগুলো ব্যক্তির সমাবেশ এবং সম্বিলিত আচরণ৷ তবে ব্যক্তির এ সমাবেশ ও আচরণ আকস্মিকভাবেই ঘটে থাকে৷ জনতার সৃষ্টি যেমন আকস্মিক, এর অন্তর্ধানও তেমনি দ্রুত৷ (“It is quickly created and quickly dissolved”- Maclver and Pagi: Society)। তবে জনতার সৃষ্টি আকস্মিকভাবে ঘটলেও সেখানে ব্যক্তির একটি সাময়িক লক্ষ্য থাকে৷ এ লক্ষ্যও ঘটনার পরিস্থিতি হতেই তৈরি হয়, আর এটা কখনই আগে থেকে ঠিক করে দেয়া থাকে না৷ ফলে জনতার আচরণ এক্ষেত্রে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সুসংগঠিত হয় না। এখানেই শ্রোতৃবর্গ বা অডিয়েন্সের সাথে জনতার পার্থক্য৷ অডিয়েন্স সবসময় পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্য অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে জমায়েত হয়৷ তাদের মনোযোগ বিশেষ লক্ষ্যে কেন্দ্রীভূত হলেও একের সাথে অন্যের ভাবের আদান প্রদান নাও থাকতে পারে৷ তবুও পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্য থাকার জন্য তারা শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকে৷

আকার ও প্রকৃতি বিচারে জনতা কয়েক রকমের হতে পারে৷ ব্লুমার (Blumer) জনতাকে চার ভাগে ভাগ করেছেন: আকস্মিক জনতা (casual crowd), রীতিগত জনতা (conventional crowd), সক্রিয় জনতা (active crowd) ও অভিব্যক্তিপূর্ণ জনতা (expressive crowd)। ব্রাউন (Brown) জনতাকে ‘সক্রিয় জনতা’ ও ‘নিষ্ক্রিয় জনতা’ এই দুই ভাগে ভাগ করেন। ব্রাউন সক্রিয় জনতা বলতে উচ্ছৃঙ্খল জনতা (mob) এবং নিষ্ক্রিয় জনতা বলতে শ্রোতৃবর্গ (audience) বুঝিয়েছেন।

কতকগুলো ব্যক্তি যখন সড়ক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে জমায়েত হয় তখন তা জনতায় রূপ নেয়৷ এই অবস্থায় দেখা যায় অনেকে মোটর গাড়ির চালককে ঘেরাও করে জটলা করেছে, কেউ তাকে লক্ষ্য করে অশ্লীল মন্তব্য ও গালাগালি করছে, কেউবা মারমুখো হয়ে তার দিকে ছুটে যাচ্ছে৷ আবার কেউবা দুর্ঘটনায় আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে পাঠানোর তোড়জোড় করছে৷ এমন সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ হস্তক্ষেপ করতে এলে মারমুখো জনতার অনেকেই সুর সুর করে কেটে পড়ে৷ এই হলো জনতা৷ জনতা অতিরিক্ত উচ্ছৃঙ্খল ও মারমুখো হয়ে ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হলে তাকে দাঙ্গাকারী জনতা (mob) বলে।

আবার যখন কতকগুলো ব্যক্তি খেলা দেখার উদ্দেশ্য নিয়ে স্টেডিয়ামে পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী জমায়েত হয় বা বক্তৃতা শোনার জন্য নির্দিষ্ট সময়ে বক্তৃতা-মঞ্চের সামনে সারিবদ্ধ ভাবে আসন গ্রহণ করে তখন তারা শ্রোতৃবর্গ বা অডিয়েন্স হিসেবে আখ্যায়িত হন৷

*জনতার আচরণের স্বরূপ

জনতার স্বরূপ উদথাটনের জনা এটি কাল্পনিক পরিস্থিতির আশ্রয় নিয়ে জনতারস আচরণের বিভিন্ন দিকগুলো আলোচনা করা যেতে পারে৷ কোন সুইমিংপুলে ওয়াটার পোলো খেলার কথাই ধরা যাক৷

কোন সুইমিংপুলে নির্দিষ্ট দিনে একটি বিখ্যাত ওয়াটার পোলো থেলা দেখার জন্য দর্শকবৃন্দ দলে দলে এসে পুলে ঢুকে নিজ নিজ স্থান দখল করতে লাগল৷ দর্শকবৃন্দ অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে কখন খেলা শুরু হবে৷ সন্ধ্যার কিছু পূর্বে লেখা শুরু হল৷ একদিকে ‘ক’ দল ও অন্যদিকে ‘খ’ দল খেলছে। খেলা বেশ জমে উঠেছে ৷ দর্শকবৃন্দ শৃঙ্খলাবদ্ধ ছিল এবং তাদের সবারই লক্ষ্য ছিল
খেলার দিকে ৷ তখন পর্যন্ত তারা দর্শক (audience)।

হঠাৎ খেলা পরিচালকের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে কিছু সংখ্যক লোক প্রশ্ন উত্থাপন করে ও হৈ চৈ শুরু করে। এরপরে দর্শকবৃন্দ আস্তে আস্তে দুটো দলে বিভক্ত হয়ে তাদের নিজ নিজ দলের সমর্থন জোগাতে থাকে, আবার কিছু লোক উস্কানিমূলক অঙ্গ-ভঙ্গী করতে থাকে। এক পর্যায়ে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে পরিচালক খেলা বন্ধ করতে বাধ্য হন। লোকজন নিজ নিজ জায়গা ছেড়ে উঠে পড়ে ও নিজ নিজ দলের হয়ে যুক্তি তর্ক পেশ করতে থাকে| তখন দর্শকবৃন্দ জনতায় রূপ নিয়েছে৷ এরপরে আরও উত্তেজনার সৃষ্টি হয় ও জনতা উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়ে৷ হঠাৎ করে শোনা যায় চেয়ারের হাতল ভাঙ্গার শব্দ৷ ইট-পাটকেলের বর্ষণ শুরু হয় ও রীতিমত মারামারি বেঁধে যায়৷ এ অবস্থা বেশ কিছুক্ষণ ধরে টলতে থাকে। ইতিমধ্যে পুলের বাইরে কয়েকটি মোটরগাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷ ঘটনা আয়ত্বে আনার জন্য কর্তব্যরত পুলিশ আকাশে গুলি ছুড়লে জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাতে থাকে৷

এ ঘটনায় আমরা দেখছি দর্শকমণ্ডলী কিভাবে বিশৃঙ্খল হয়ে জনতায় রূপান্তরিত হয় এবং পরে আরও ক্ষিপ্ত ও উত্তেজিত হয়ে হিংসাত্মক কাজে লিপ্ত হয় ও দাঙ্গাকারী জনতার সৃষ্টি করে ৷

লে বঁ, মার্টিন, আলপোর্ট, মুজাফফর শেরীফ, সার্জেন্ট উইলিয়ামসন প্রমুখ মনোবিজ্ঞানীগণ জনতার উপর বিস্তারিত আলোচনা করেছেন৷ তাদের আলোচনায় জনতার কতকগুলো বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। এগুলো নিয়ে একটু লেখা যাক…

১. মানসিক সমরূপতা বোধ (Mental homogenity):
জনতায় অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিরা চিন্তা ও আচরণের ক্ষেত্রে সমরূপ, অর্থাৎ এরা একইরকম চিন্তা ও আচরণ করে। শিক্ষা, বুদ্ধি অথবা পেশার ক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও যেহেতু জনতার এক অভিন্ন লক্ষ্যবস্তু থাকে সে কারণে জনতার অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিবর্গের প্রতিক্রিয়াও সমরূপ হয় | জনতায় ব্যক্তিদের এরূপ মানসিক সমরূপতা লক্ষ্য করে লে বঁ গোষ্ঠীমন ধারণা (Group mind) উপস্থাপিত করেছেন ৷ ‘গোষ্ঠীমন ধারণা’ অনুযায়ী ব্যক্তি জনতায় মাঝে তার নিজস্ব সত্ত্বা হারিয়ে ফেলে৷ গোষ্ঠীমনের অন্তিত্ব সম্পর্কে সন্দেহ থাকলেও জনতায় অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিরা যে চিন্তা ও বিশ্বাসের সাথে সাথে অনুভূতি ও আচরণের ক্ষেত্রেও সমরূপতা বজায় রাখে তা স্বীকার করতে দ্বিধা থাকার কথা নয়।

২. আবেগ প্রবণতা (Emotionality):
জনতার আচরণ খুব বেশি আবেগ তাড়িত৷ মানুষের আদিম প্রবৃত্তি ও আবেগ জনতার মাঝে প্রকাশ পায়৷ এই অতিরিক্ত আবেগের জন্য জনতা সহজেই হিংসাত্মক কাজে লিপ্ত হয়। জনতার মাঝে ব্যক্তি অন্যান্য সদস্যের আবেগ-আপ্লুত আচরণ দেখে নিজেও আবেগদীপ্ত হয়ে পড়ে৷ অভিভাবন (Suggestion) ও অনুকরণ (Imitation) এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ৷

৩. বিচারশক্তিহীনতা (Irrationatlity):
জনতার মাঝে ব্যক্তি বিচার-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে৷ ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, সম্ভব-অসম্ভব প্রভৃতি বোধ লোপ পায়। তখন ব্যক্তি যা শোনে তাই বিশ্বাস করে। যুক্তিতর্কের নিরিখে শ্রুত তথ্যের যাচাই করার ক্ষমতা ব্যক্তির থাকেনা। ব্যক্তি অপরিণামদর্শী হয়ে পড়ে এবং ফলাফলের কথা না ভেবেই যে কোন
প্রকার কার্যে লিপ্ত হয় ৷ কোন কোন মনোবিজ্ঞানীর মতে জনতার মাঝে সৃষ্ট ‘সম্মিলিত মন’,’ব্যক্তি মন’ অপেক্ষা হীনতর৷ তাই ব্যক্তি জনতাভুক্ত হওয়ার পরস বিচার-বুদ্ধির ক্ষেত্রে হীনতর আচরণের পরিচয় দেয়৷

৪. দায়িত্ববোধের অবনতি (Diminished sense of responsibility):
জনতা ব্যক্তিরা এরূপ আচরণ করে যে তাদের কোন প্রকার দায়িত্ববোধ আছে বলে মনে হয় না। দায়িত্ববোধের অভাব থাকায় জনতাভুক্ত ব্যক্তিরা অন্যের সুবিধা-অসুবিধা, অধিকার, অনুভূতি প্রভৃতি কোন কিছুর তোয়াক্কা করে না৷ এজন্য জনতা মারপিট, ভাঙচুর, লুটতরাজ, অগ্নি-সংযোগ প্রভৃতি অসামাজিক কাজে সহজেই লিপ্ত হয়৷ হিংসা ও ধ্বংসবৃত্তি অনেক মানব চরিত্রের একটা বিশেষ দিক৷ কিন্তু সাধারণ ক্ষেত্রে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ফলে ঐ সমস্ত প্রবৃত্তি অবদমিত থাকে৷ জনতার মাঝে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বলে কিছু না থাকায় ব্যক্তি তার আচরণে কাণ্ডজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়ে থাকে৷

৫. ক্ষমতাবোধ (Sense of power):
জনতাভুক্ত ব্যক্তিরা নিজেদেরকে অসীম ক্ষমতার অধিকারী মনে করে | তারা মনে করে তাদের অসাধ্য কিছু নেই ৷ তাদের বাঁধা দিতে পারে এমন কোন শক্তিও তারা স্বীকার করে না ৷ তাই অনেক সময় দেখা যায় জনতা নিরস্ত্র হয়েও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে ৷

৬. অনামিত্ব বোধ (Sense of anonymity):
জনতার যে সমস্ত বৈশিষ্ট্য আলোচিত হল (মানসিক সমরূপতা, আবেগপ্রবণতা, বিচারশক্তিহীনতা, দায়িত্ববোধের অবনতি, ক্ষমতাবাধ প্রভৃতি) তার মূলে যে উপাদান কাজ করে তা হল অনামিত্ববোধ৷ জনতার মাঝে প্রতিটি ব্যক্তিই ভাবে সে যে আচরণ করছে তার জন্য সে একা দায়ী নয়, বরং গোটা জনতারূপ গোষ্ঠীই দায়ী| ব্যক্তি মনে করে সে তো একা করছে না। সবাই যে কাজটি করেছে তাতে সে অংশ নিচ্ছে মাত্র৷ কাজেই সে বিশ্বাস করে কৃতকর্মের জন্য তাকে কোন ঝুঁকি বহন করতে হবে না৷ তাছাড়া সে মনে করে ভিড়ের মধ্যে তাকে চিনবেই বা কে! নাম-ধাম, পরিচয় গোপন থাকার সুযোগ যেখানে রয়েছে সেখানে উচ্ছৃঙ্খল হতে বাধা কোথায়?

*জনতার আচরণের ব্যাখ্যা

জনতার আচরণের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে লে বোঁ (Le Bon) বলেন, জনতার মাঝে ব্যক্তিসত্ত্বার বিলুপ্তি ঘটে এবং বাক্তি জনতার মাঝে হারিয়ে যায়। এভাবে জনতার একটি ‘সম্মিলিত মন’ গড়ে ওঠে যা ‘বাক্তি মন’ হতে সম্পূর্ণ আলাদা। জনতার আর একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, জনতা অতিরিক্ত অভিভাবনের (Suggestion) দ্বারা চালিত হয়। ফলে জনতার মাঝে আর ব্যক্তি সংযম থাকে না। এমতাবস্থায় ব্যক্তি এমন সব কাজ করতে পারে যা অন্য অবস্থায় তার একার পক্ষে কখনই করা সম্ভব নয় ৷ মার্টিন (E. D. Martin) তার Crowd Behaviour নামক গ্রন্থে জনতার ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেন ৷ তার মতে জনতা অভিভাবনের দ্বারা এতো বেশি পরিচালিত হয় যে, সেখানে সংযমের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। তখন অতিঅহম (Super ego) কিছুটা শিথিল হয়ে পড়ে এবং মানুষের আদিসত্ত্বা প্রাধান্য লাভ করে। মার্টিন জনতার আচরণকে পাগলামির সামিল করে দেখেছেন৷

আলপোর্ট (F. H. Allport) জনতার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ব্যক্তির ভূমিকার উল্লেখ করেছেন৷ আলপোর্ট ‘সম্মিলিত মন’ এর বিরোধিতা করেন৷ তার মতে, জনতার আচরণের জন্য ব্যক্তির ভূমিকা মোটেও গৌণ নয়, এবং জনতার মাঝে ব্যক্তি তার সত্ত্বাচ্যুত হয় না ৷ জনতার’ জন্য সামাজিক উত্তেজনা ও ব্যক্তি পারস্পরিক উদ্দীপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আলপোর্টের মতে, ব্যক্তিগত অসন্তোষ, হতাশা, নিরাপত্তাহীনতা প্রভৃতি জনতার আচরণ ব্যাখ্যার জন্য প্রয়োজনীয় বিবেচনা৷

মুজাফফর শেরীফের (M. Sherif) মতে, জনতার আচরণের মধ্যেও একটা স্বমিতি (norm) তৈরি হয় এবং ব্যক্তি ঐ স্বমিতির অনুরূপ আচরণ করার জন্য একটা চাপ অনুভব করে৷ তার মতে, জনতার আচরণ যেমন ধ্বংসাত্মক হতে পারে, আবার তেমনি গঠনমূলক ও প্রশংসনীয়ও হতে পারে৷ জনতার মাঝে ব্যক্তি তার নিজস্ব সত্ত্বায় থাকে না৷ ফলে সে এমন মহান কাজ করে বসে, যা সমাজের জন্য আত্মত্যাগের এক বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে স্বীকৃত হতে পারে৷

সার্জেন্ট ও উইলিয়ামসন (Sargent and Williamson) জনতার আচরণ আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন জনতার আচরণের সুষ্ঠু পর্যালোচনার জন্য তিনটি উপাদানের বিশেষ বিবেচনা করা প্রয়োজন:

১. সাধারণ ক্ষেত্র: জনতা সৃষ্টির জন্য একটি উপযুক্ত ক্ষেত্র চাই৷ একটি সড়ক দুর্ঘটনা, পুলিশ কর্তৃক জুয়ারি গ্রেফতার, মিষ্টির দোকানে ভ্রাম্যমান আদালতের উপস্থিতি, প্রভৃতি ঘটনা জনতার জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্র প্রস্তুত করে৷ আবার অনেক সময় গুজব এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যা বিকৃত ও ভ্রান্ত প্রত্যক্ষণের জন্ম দেয় ৷ পরে এই ভ্রান্ত প্রত্যক্ষণই জনতা সৃষ্টির উপযুক্ত ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে।

২. ব্যক্তির প্রেষণাজনিত তাগিদ: একটি জটিল পরিস্থিতি ব্যক্তি কিভাবে প্রত্যক্ষ করবে তা অনেকখানি নির্ভর করে তার প্রেষণা ও আবেগজনিত চাহিদার উপর ৷ যখন একজন কৃষ্ণাঙ্গ কর্তৃক কোন স্বেতাঙ্গ মহিলার ধর্ষিতা হওয়ার খবর রটে তখন এর পেছনে যে প্রেষণাজনিত চাহিদা কাজ করে তাহল শ্বেতাঙ্গদের কৃষ্ণাঙ্গের প্রতি আগ্রাসন ও কৃষ্ণাঙ্গভীতি ৷ অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যদা অর্জন খুব কঠিন প্রতিযোগিতামূলক হলে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি এই আগ্রাসন আরও প্রকট হতে
পারে। এ সকল ক্ষেত্রে একটা গুজবকে কেন্দ্র করে জনতা সৃষ্টির ব্যাপারে ব্যক্তি যথেষ্ট উৎসাহ পায়৷ এছাড়াও কোন যহিলা পথচারী দুর্ঘটনা কবলিত হলে তাকে সাহায্য করার জন্য লোকের অভাব হবে না৷ তার দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে একট জনতার সৃষ্টি হতে পারে এবং হয়ত এমনও দেখা যাবে যে একজন নারীবিদ্বেষী ব্যক্তিও ঐ মহিলার সাহায্যার্থে এমন সব বীরত্বপূর্ণ ও দুঃসাহসিক কাজ করবে যা তার মত লোকের কাছে অন্য পরিবেশে আশা করা যেত না৷ এরকম মহানুভবতাও জনতার যাঝে সম্ভব হয়।

৩. অনুরূপী আচরণের প্রবণতা ও অভিভাব্যতা: জনতার আচরণ হতে একটি স্বমিতি (Norm) উদ্ভুত হয়। ব্যক্তিবর্গ উদ্ভূত লক্ষ্যের সাথে একাত্ম হয় ও নতুন স্বমিতি অনুযায়ী আচরণ করে৷ ফলে দেখা যায় জনতার মাঝে ব্যক্তি গণপিটুনিতে অংশ নিচ্ছে, পথের ধারে পড়ে থাকা লাশকে ঘিরে সম্ভাব্য তথ্য উদঘাটনের চেষ্টা করছে অথবা দুর্ঘটনা কবলিত ব্যক্তির ত্রাণ কার্যে এগিয়ে
আসার জন্য অনুপাণিত হচ্ছে ৷

সম্মিলিত জনতার মতের চাপে প্রভাবিত হয়ে মানুষের নিজের মতের পরিবর্তন, নিজের বিচারবুদ্ধির পরিবর্তনও খুব সাধারণ একটি প্রপঞ্চ যাকে নরমেটিভ সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্স এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়। এটা ঘটে মানুষের মধ্যে একটি বিশেষ বায়াজের কারণে, যার নাম কনফারমেশন বায়াজ। অন্যের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে মানুষ যে খুব সহজ নিশ্চিত ব্যাপারেও সন্দেহ পোষণ করে ভুল সিদ্ধান্তের দিকে যেতে পারে সেটা নিয়ে মনোবিজ্ঞানী সলোমন এশ এর একটি বিখ্যাত এক্সপেরিমেন্ট আছে। ভবিষ্যতে সেটা নিয়ে বলার চেষ্টা করব।

তো আমরা দেখছি, মব যে সবসময় ডেসট্রাকটিভ তা নয়, কখনও কখনও এটা উপকারী হতে পারে। কিন্তু মব সবসময়ই অনেক বেশি আবেগী, ইর‍্যাশনাল, দায়িত্বহীন ইত্যাদি, মানে উপরে এদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে যেগুলো লিখলাম আরকি -এগুলোকে অস্বীকার করা যায় না, তা তারা যতই ভাল কাজ করুক না কেন। যেকোন অপরাধকার্যে মব তেড়ে আসতে পারে, চোর, ধর্ষক, ইভটিজার, মানুষকে গাড়ি চাপা দেয়া ড্রাইভার, এদের কোন কাজে জনতা উত্তেজিত হয়ে অপরাধীকে মারধোর করতে পারে, কিন্তু যদি এতে অপরাধী মারা যায় তাহলে তা মব লিঞ্চিং হবে যা অবশ্যই বিচারবহির্ভূত হত্যা। মবের হাতে দুচার ঘা খাওয়া তেমন কোন সমস্যাই না বলতে পারেন, কিন্তু আপনার দেয়া দুচার ঘা দেখার পর আরও কুড়ি পঁচিশজন দু চার ঘা করে বসিয়ে দেবে তখন মৃত্যু খুবই স্বাভাবিক। আর মব ভায়োলেন্স এর বেলায় মানুষের বিচার বুদ্ধি লোপ পায়, ভাল মন্দ বিচার করার ক্ষমতা কমে, জাস্টিসের জন্য তাই মবের উপর ভরসা করা কখনই চলে না।

আপনার কাছে চুরি, ধর্ষণ অপরাধ, কিন্তু আপনার পাশে দাঁড়িয়ে যে লোকটি চেচাচ্ছে তার কাছে হয়তো শুধু এগুলোই অপরাধ নয়, পাবলিক প্লেসে কিস করা তার কাছে অপরাধ, গোমাংস বহন করা অপরাধ, ধর্মের সাধারণ সমালোচনা করা অপরাধ, মুক্তচিন্তা করা অপরাধ। তারা কিন্তু এই অপরাধগুলোর জন্যই উত্তেজিত হয়ে মব লিঞ্চিং-এ অবদান রাখতে পারে। কাজেই অপরাধ যেরকমই হোক, মব জাস্টিসকে যতই ইতিবাচক বলে মনে হোক, এটা বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও জনতার বিচারের সংস্কৃতিকেই প্রমোট করে, আর এই সংস্কৃতির কিছু কাজ আপাতভাবে ইতিবাচক মনে হলেও এটা শেষপর্যন্ত সমাজের জন্য ক্ষতিই বয়ে আনে। তাই বলে চোর, ধর্ষক, গুন্ডা, ইভটিজার, হত্যাকারীদেরকে ছেড়ে দিতে বলছি না। তাদেরকে ধরুন, পুলিসে দিন, থানায় নিয়ে যান, কিন্তু দয়া করে এটাও খেয়াল রাখুন যাতে এই অপরাধের বিচার মবের হাতেই চলে না যায়।

উপরে প্রেষণা ও আবেগজনিত চাহিদার সাথে এর সম্পর্ক আছে সেটাও উল্লেখ করেছি। শ্বেতাঙ্গদের মাঝে কৃষ্ণাঙ্গবিদ্বেষ তৈরি করা হলে এদের বিরুদ্ধে মব ভায়োলেন্সের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। ঠিক এভাবেই অনেকে যে ভারতে মব লিঞ্চিং এর সংস্কৃতির উদ্ভব হয়েছে বলে দাবী করেন, এর মূল নিহিত থাকতে পারে গোহত্যা ও গোভক্ষকদের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানোয়। আমরা জানি বিভিন্ন সভা সমাবেশে, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বক্তৃতায় অনেক সময়ই হেট স্পিচ দেয়া হয়, পরিকল্পিতভাবে বিদ্বেষ ছড়ানো হয়। এগুলোর ফলাফল শেষে এই মব লিঞ্চিং-এ গিয়ে দাঁড়ায়। যদি মব লিঞ্চিং এর সংস্কৃতির অবসানের আশা করা হয় তাহলে এরকম হেট স্পিচ দেয়া বন্ধ করতে হবে, কোন ইথনিক বা রেলিজিয়াস গ্রুপকে ডিমনাইজিং বন্ধ করতে হবে। যে কোন জনসমাবেশেই অডিয়েন্স খুব সহজেই মবে পরিণত হয়ে যেতে পারে, তাই এসব ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, এরকম মবকে কিকরে আধুনিক পদ্ধতিতে কন্ট্রোল করা যায় সেবিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

আমার এইসব কথা বলার একটা উদ্দেশ্য আছে।

আমরা সবাই মানুষ, যিনি এটা পড়ছেন তিনিও মানুষ। আর মব জাস্টিস, নরমেটিভ সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্স- এসব ন্যাচারাল ফেনোমেনা। যে কারও এমন ক্ষেত্রে ক্ষেপে গিয়ে কাজ করার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু কেউ যদি এই ফেনোমেনা বা প্রপঞ্চ সম্পর্কে আগে থেকেই জেনে থাকেন, তাহলে হয়তো তার পক্ষে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। বায়াজ স্বীকার করলে বায়াজে আক্রান্ত হওয়া অনেকটাই কমে যায়, তখন মানুষ সচেতনভাবে এর ঊর্ধ্বে ওঠার চেষ্টা করে। আর তাই এই বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিও গুরুত্বপূর্ণ।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 62
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    62
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.