ইচ্ছেডানা

0

সাদিয়া সুলতানা:

তখন আমার বয়স সম্ভবত বারো। হুম সেই বয়সের স্মৃতিও আমার খুব টনটনে। আসলে ছোটবেলা থেকেই আমার পাকামো জ্যাঠামো বড় বেশি। দাদা-দাদী বলে। নানা-নানী বলে। পাড়া-প্রতিবেশী বলে। বন্ধুরা বলে, তুই কী স্মার্টরে! মা অবশ্য বলে, আমি বরাবর ম্যাচিউরড। আসলে মা’ই আমাকে সময়ের সাথে সাথে পরিণত করেছে। অন্যদের চোখে যা পাকামো-জ্যাঠামো লাগে।

আমার শৈশবের স্মৃতিতে যতটুকু ঘাটতি থাকে মায়ের ডায়েরির স্মৃতির ঝাঁপি সেই ঘাটতিটুকু পুষিয়ে দেয়। মায়ের ডায়েরিতে আমার ছেলেবেলার দিনক্ষণের হিসেব দেয়া। তাই আমার স্মৃতির সাথে ডায়েরির স্মৃতি জুড়ে দিলেই গল্পগুলো জুড়ে গিয়ে আস্ত হয়ে যায়।

তখন মায়ের পোস্টিং ছিল নারায়ণগঞ্জ। সেবার ঈদের ছুটিতে নানুবাড়িতে গেলাম, ময়মনসিংহ। আমি, মা আর মায়ের অফিস পিয়ন। পিয়ন ভাইয়ের নাম মনে নেই। সম্ভবত সে আমাদের পৌঁছে দিতে যাচ্ছিল। সাথে বাবা আসেনি। বাবা, দাদা-দাদীর সাথে ঈদ করবে বলে সকালে রাজশাহী চলে গিয়েছিল।

মায়ের সাথে ট্রেনে যেতে যেতে শুনেছিলাম, বিয়ের পর সেবারই নানুবাড়িতে মায়ের প্রথম ঈদ। এর কারণটা রেগে রেগে মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, মা প্রতিউত্তরে কি বলেছিল মনে নেই। তবে এখন বুঝতে পারি। মায়ের ডায়েরিতে পড়েছি বলে শুধু সে কারণেই না। আমি এখন জীবন দেখেই বুঝতে পারি।

সংসার নামটাই বিচ্ছিরি। তার নিয়মগুলো আরো বিচ্ছিরি। ছেলের বউ হলে শ্বশুরবাড়িতে ঈদ করতে হয় বা মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে ঈদ করতে হয়! আমি যেমন বাবা-মার সাথে ঈদ করি তেমনি মায়েরও কি তার বাবা-মার সাথে ঈদ করতে ইচ্ছে হয় না? বাবা যে মাকে এতো ভালোবাসে, কই একবারও তো মাকে জোর করে ঈদ করতে নানুবাড়ি পাঠাতো না! ঈদের আনন্দেও মায়ের মুখটা হঠাৎ হঠাৎ ম্লান হতে দেখেছি। আড়ালে মা হয়তো কাঁদতো। আমাকে বুঝতে দিতো না। কিন্তু মাকে আমি না বুঝলে কে বুঝবে।

মায়ের ওপরেও আমার রাগ হতো। কই এতো কিছু যে মা আদায় করে ছাড়ে, নিজের জিনিস কেনো আদায় করে না। কিন্তু মা যে অত একরোখা, তবু মায়ের ইচ্ছেগুলো খুব কম দামী।

সেবার অবশ্য মায়ের নানুবাড়ি যাবার কারণ ছিল। এ নিয়ে বাবা-মায়ের কথা কাটাকাটি হয়েছিল কি? মনে নেই। মা এসব নিয়ে রাগারাগি করতো না। মায়ের ডায়েরি থেকে জেনেছি, এসবকে মা ছোটলোকি বলে। কিন্তু মা কেনো মাঝে মাঝে ছোটলোকি মেনে নিতো আমি বুঝতাম না। এখন যে বড়ো হয়েছি তবু বুঝি না।

সেই ঈদে নানুবাড়িতে ছোট মামা পনের বছর পর জাপান থেকে এসেছিল। কী যে মজা হলো সেবার ছোট মামা থাকাতে! সন্ধ্যাতে গানের কলি খেলতে খেলতে গানের আসর বসে যেতো। ‘আয় তবে সহচরী হাতে হাতে ধরি ধরি।’ সুরের তালে তালে আনন্দের দিনগুলি একদিন ফুরিয়ে গেল। মা আর আমি বাড়ি ফিরলাম।

বাবাকে ছাড়া সেটাই ছিল অামার প্রথম ঈদ অার বিয়ের পর অামার মায়ের তার বাবার সাথে করা প্রথম অার শেষ ঈদ। কী অদ্ভুত না?

মা বলে মানুষের অনেক ইচ্ছেডানা থাকে। সেই ডানার ছটফটানি নিয়েই বাঁচতে হয়। অাবার মাঝে মাঝে ইচ্ছেমাফিক খানিক উড়তেও হয়। অত কঠিন কথা বুঝি না অামি। শুধু ভাবি, অামি অামার সব ইচ্ছেগুলোতে ডানা লাগিয়েই উড়বো।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 184
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    184
    Shares

লেখাটি ২৪৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.