বৌ ও বৃষ্টি

0

ফারজানা নীলা:

কানের কাছে ক্রমাগত কেউ বলেই যাচ্ছে “যাও বৃষ্টিতে ভিজো”। বিরক্ত হয়ে মেঘলা অবশেষে নেমেই পড়লো সিঁড়িতে। ভেঙে ভেঙে তিনতলা পার হয়ে যেই উঠোনে নামলো, একটা সংকোচ, একটা ভয়, একটা লজ্জা ভেতর থেকে ঠেলা দিলো। পিছনে ফিরে দেখলো কেউ তো নেই। দো’তলার বারান্দায় মেঘলার একটা শাড়ি ঝুলছে, পাশে একটি শার্ট, তাঁর পাশে ছোট একটি প্যান্ট।

“তারা কি আমাকে বারণ করলো? বললো নাকি কেউ “মা, তুমি বাইরে যাচ্ছো কেন এই বৃষ্টিতে? যেও না মা”।

নাকি নিচতলার বারান্দার মেঝেতে পড়ে থাকা দু জোড়া বয়স্ক স্যান্ডেল মেঘলাকে শাসাচ্ছে? বলছে নাকি “বাড়ির বৌ যায় না এভাবে বাইরে, ঘরে যাও, ঘরে যাও এখুনি”।

ধরাস করে উঠলো বুকটা। এক পা পিছিয়ে গেল। দুপা পিছিয়ে যেতেই কানের কাছে সেই কণ্ঠস্বর, “যাও বৃষ্টিতে ভিজো”, হাত ধরে টানছে বৃষ্টির প্রতিটি কণা। চুষে নিচ্ছে ভেতরটাকে এই এলোমেলো বাতাস। মেঘলা থমকে যায়, দুরু দুরু বুকে কপাল কুঁচকে নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে “যাবো? ভিজবো?” কোথাও কোনো আওয়াজ পাওয়া যায় না। কোথাও কোনো উত্তর পাওয়া যায় না।

“যাও”

চমকে উঠে মেঘলা। কে বলে? কে কথা বলে? কেউ নেই । কেউ কোথাও নেই। কান পেতে খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতে চায় মেঘলা। শুনে নূপুরের হালকা রুনুঝুনু আওয়াজ। তাঁরই এক পায়ে যেটা সে পরে থাকে সকাল থেকে রাত। শাড়িটা খানিক পায়ের উপরথেকে টেনে তুলে দেখে নূপুরটি নিজেই নড়ছে। কিণ্বর আওয়াজ তুলে তাঁকে বলছে “যাও”।

কোমরের বামপাশে হঠাৎই সুড়সুড়ি লাগে। আঁচলটা খানিক সরিয়ে দেখে কোমর চেইনটা জ্বলজ্বল করছে কেন জানি। সেও যেন বলছে, “যাও, ভিজো বৃষ্টিতে”।

সাদামাটা সুতি শাড়িটা বাতাসে উড়ছে হালকা হালকা। আঁচল খানিক আগেই উড়ে সড়ে গেছে বুক থেকে। সবাই যেন চিৎকার করে বলছে, “যাও ভিজো বৃষ্টিতে”।

মেঘলার ধূসর চোখ আর ক্লান্ত পা তাঁর উত্তেজিত মন আর শরীরকে টেনে নিয়ে চলে গেইটের কাছে। এক ফোঁটা দু ফোঁটা করে অসংখ্য ফোঁটা এসে মেঘলাকে আপাদমস্তক ভেজাতে থাকে। আহ কী আরাম লাগে মেঘলার। শরীরের প্রতিটা কোণায় জল প্রবেশ করে যেন। চুলের সিঁথি বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে মুখে গলায় ঘাড়ে। ঘাড় বেয়ে পিঠে, কোমরে। নাভিমূলে।

গেইট খুলে পা বাড়ায় রাস্তায়। এক অজানা সাহস শক্তি নির্লজ্জতায় ভর করে মেঘলা। হেঁটে চলে নির্ভাবনায় নিঃসংকোচে । তাঁর মনে নেই কোন শঙ্কা নেই কোন “কেউ যদি কিছু বলে”র চিন্তা। তাঁর মনটা ফুরফুরে হয়ে যাচ্ছে যতই সে এগুচ্ছে সামনে। উপরে জল পড়ছে জোর বেগে, আর ভেতরে সুখের বিশুদ্ধ অনুভূতি কলকল করে বয়ে যাচ্ছে।

মেঘলার এমনই আনন্দ লাগে যে সে বুঝে উঠতে পারে না কী করবে এখন। হেঁটে যাবে সামনে আরও? না কি ওই কাছে ফুচকার দোকানে ঢুকে এক প্লেট খেয়ে নিবে? আবাসিক এলাকা এটি, আশেপাশে সব বাসা। কিছু কিছু বাসার বারান্দা, জানলা দিয়ে কিছু সন্দেহজনক এবং উৎসুক চোখ তাকে দেখছে। দেখুক।

ভাবুক যা খুশি। একটি ক্ষুদ্র ইচ্ছে, বৃষ্টিতে স্নান করবো। এ পূরণ করার জন্য এতো কিছু কেন ভাবতে হবে? কেন কাউকে জিজ্ঞেস করতে হবে, “যাবো বাইরে”? বৃষ্টিতে ভেজা কি দণ্ডনীয় অপরাধ? প্রকৃতির সাথে মিশে যাওয়াতে কার কী ক্ষতি? বরং শান্তি, পরম শান্তি। যে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির জলে ডুবে না, সে বুঝে না জলের তৃপ্তি কী জিনিস? শরীরে আর মনের গভীর শান্তি কী জিনিস?

মেঘলা দাঁড়িয়ে পড়ে মাঝ রাস্তায়। চোখ বুজে আকাশের দিকে মুখ করে। “ভিজিয়ে দাও আমায়, আমার মন আমার শরীর। আমার সর্বাঙ্গ”।

মেঘলার নাচতে ইচ্ছে করে। ঠোঁট প্রসারিত হয়ে হাসি লেপটে থাকে তিলের মতো। সে অনেকটা উড়ে উড়েই সামনের ফুচকার দোকানে ঢুকে। ঠিক যেমন ভাবে একটি সদ্য কিশোরী মেয়ে ঢুকে স্কুল শেষে। “এক প্লেট ফুসকা” – দোকানি হা করে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। এরপর ঠিকই তার ব্যবসা করে যায়। আরাম করে পা দুলিয়ে দুলিয়ে মেঘলা প্লেট শেষ করে। “দামটা পরে দিয়ে যাবো”।

বৃষ্টি ধরে আসছে। কমে আসছে এর বেগ। ঘরে ফিরে মেঘলা হাসি মনে। গেইট পার হয়ে যেই সে সিঁড়িতে পা দেয় সামনে দাঁড়ায় তাঁর সাত বছরের ছেলে। হতভম্ব তাকিয়ে থাকে ভেজা মায়ের দিকে। মেঘলা হাসে। হাত বুলিয়ে দেয় ছেলের চুলে। ছেলের পিছনে এসে দাঁড়ায় শ্বশুর। বৌমাকে দেখে মুখে কথা হারায় তাঁর। “এই অবস্থা কেন তোমার, সব ভেজা, এই অবস্থায় বাইরে কোথায় গেছো?”

হাসি যায় না মুখ থেকে মেঘলার। “বাবা বাইরে গিয়েছিলাম, ভিজতে, অনেকদিন ভিজি না। অনেকদিন না অনেক বছর”।

কিছু বলতে পারে না আর মেঘলার শ্বশুর। কিছু যেন তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন না বলার মতোন। যেন কিছু একটা তাঁকে বাধা দিচ্ছে কিছু বলতে। যেন এই আওয়াজের পর কোনো শব্দ করা উচিত না। তিনি চুপ থাকলেন। এবং মেঘলা ঘরে চলে গেল।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 83
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    83
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.