ঊনিশ বছর আগের ও ঊনিশ বছর পরের গল্প

ফারিহা ইসলাম মুনিয়া:

ঊনিশ বছর বয়সী মেয়েটি হঠাৎ একদিন গভীর রাতে তার মায়ের বিছানার পাশে গিয়ে ডাকলো- আম্মু।

আম্মু লাইট নিভিয়ে শুয়ে ছিলেন। ঘুম আসেনি তখনও। আম্মু উঠে বললো- কী রে! ঘুমাসনি এখনো?

না আম্মু! মেয়েটি কান্না আটকানির প্রাণপণ চেষ্টা করেও পারলো না। মায়ের কাছে ধরা পড়ে গেল। হাউ মাউ করে কেঁদে ফেললো সে। বোবা কন্ঠে বললো- আম্মু, আম্মু গো! আমার অনেক কষ্ট লাগছে।
আম্মু দ্রুত বিছানা থেকে উঠে মেয়েকে ধরে ফেললেন। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললেন- কী হইছে রে?
কষ্টের তোড়ে মেয়েটির শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছিল। কথা বলতে পারছিল না সে। অস্ফুট কন্ঠে বলল- ওর কথা খুব মনে পড়ছে আমার, আম্মু!

আম্মু আরও শক্ত করে মেয়েকে নিজের বুকে টেনে ধরলেন। আস্তে আস্তে বললেন- মা রে, যে গেছে সে তো আসবে না।তার জন্য কষ্ট পাওয়া বৃথা।

মেয়েটি তার আম্মুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললো- আম্মু, তুমি জানো সব। আমার ও ছাড়া কেউ ছিল না, আমি ইন্ট্রোভার্ট মানুষ। আমার খুব বেশি বন্ধু বান্ধব ও ছিল না। ফেসবুকে আমার হাজার হাজার ফলোয়ার হলে কী হবে? আমি কি কাউকে চিনি আম্মু?

আম্মু মেয়ের মুখ তুলে বললেন- এই! তুই আমাকে চিনিস না? আমিও তো তোর ফলোয়ার। গত সপ্তাহে মেয়েদের হ্যারেসমেন্ট নিয়ে কি জানি লিখলি। সবার প্রথমে লাইকটা আমি দিছি না?

মেয়ে অস্ফুট স্বরে বললো- ধুর আম্মু! তুমি ফলোয়ার না। তুমি আমার একমাত্র বন্ধু মা, আমার আর কেউ নেই এ জগতে।

আম্মু একটা নি:শ্বাস ফেলে বললো- তোর কপাল কত ভালো জানিস?

মেয়ে তার মার বুকে মাথা রেখেই বললো- কেন আম্মু? কেন ভালো?

আম্মু বললো- কপাল ভালো, কারণ বেশির ভাগ বাংলাদেশী মায়েদের সাথে মেয়েদের এমন সম্পর্ক না। অনেক দূরের সম্পর্ক তাদের। তারা তাদের মায়েদের এভাবে জড়িয়ে ধরে ধরে কাঁদতে পারে না, প্রিয় মানুষের বিচ্ছেদের গল্প করতে পারে না, গভীর রাতে হাউ মাউ খাউ বলে এইভাবে জড়ায় ধরে কাঁদতে পারে না। বিছানায় বালিশ চেপে একলা একলা কাঁদে সারা রাত। জানিস এটা?

মেয়েটি এভাবে কখনো চিন্তা করেনি। তাই তো। তার আম্মু তার সবচে প্রিয় বন্ধু। আম্মু তার সবচে ভালো গাইড, ফিলোসোফার, জ্ঞানী, বুদ্ধিমতী এবং অনেক পড়াশুনা জানা ব্রিলিয়ান্ট একটা মানুষ। আম্মুর কাছে কখনো কিছু লুকাতেও হয়নি। বরং ডেটে গেলেও হাসি মুখেই আম্মুকে বলে গেছে। তবে বলে যেতে হয়েছে কোথায় যাবে, কতক্ষন থাকবে,ওর নাম্বারও দিয়ে যেতে হয়েছে। যাবার সময় বলেছে পাবলিক প্লেস ছাড়া কোথাও না যেতে এবং কখনো কখনো এ ও বলেছে- এমন ছাগলের মত ড্রেস পড়ে যাচ্ছিস কেন? মেরুন বা নীল ড্রেসটা পড়ে যা।

তারও আগে আম্মু ওকে চায়ের দাওয়াতও দিয়েছিল বাসায়। বসে গল্প করেছে, ফ্যামিলি সম্পর্কে জেনেছে। পড়াশুনা, ক্যারিয়ার নিয়ে অনেক কিছু বলেছে। পরদিন ও বলেছিল- তোমার আম্মু ভারি অসাধারণ মানুষ তো! এমন শাশুড়ি পাওয়া মানে সাত পুরুষের ভাগ্য!

আজকে সব কেমন ধূসর মলিন স্মৃতি হয়ে গেল..এত অসাধারণ আম্মুর মেয়েটিও তার জন্য যথেষ্ট ছিল না.. গলাটা আবার ভারী হয়ে আসে মেয়েটির। মায়ের গলা জড়িয়ে ভারী গলায় বললো- হ্যাঁ আম্মু, আমি আসলেই লাকি।

আম্মু মেয়েটাকে উঠিয়ে দিয়ে বললো- যা, বালিশ নিয়ে আয়। আমার সাথে ঘুমা। একা একা ঘুমালে আবার হ্যানা বেকারের মতো সুইসাইডাল চিন্তা মাথায় ঘুরবে। যা!

13 reasons why বইটা আম্মুও পড়েছে। আম্মু অনেক অনেক বই পড়ে। মেয়েটি চোখ মুছে মৃদু হেসে বললো- তুমি না বললেও আমি আজকে তোমার সাথে থাকতাম। নাইলে ওই শালা বজ্জাত চিটারের বাচ্চা রাক্ষস হয়ে আজকে স্বপ্নে ধরা দিত। আচ্ছা আম্মু, তোমার সন্তান আমি না হয়ে অন্য কেউ হলেও কি তুমি এমনই হতা?

আম্মু ভ্রু কুঁচকে বললো- এই চিটারের বাচ্চা গালিটা কি কাজী মারুফ দ্বারা ইন্সপায়ারড?

মেয়েটা খিল খিল করে হেসে দিল..তার আম্মু সকল বিষয়ে আপডেটেড! সকল মিম ও ট্রল পেজ আম্মু সবার আগে দেখে। কিছু না বুঝলে আবার জিজ্ঞেসও করে। আসলেই, কী কুল একটা আম্মু তার!

মেয়েটা খুশি মনে তার রুম থেকে বালিশ আনতে গেল।

আম্মুর বুক থেকে একটা ভারী নি:শ্বাস বের হয়ে গেল। মেয়ের শেষ প্রশ্নটা কাকতালীয় হলেও সেটি ঊনিশ বছর ধরে লালন করা একটি ভয়ংকর সত্য। “কুল” আম্মুর এই বাচ্চাটিকে জন্মের পর কেউ একজন রাস্তায় ফেলে গেছিল! তিন মাস ছিল সে একটা শিশু এতিমখানায়! একলা একটা কাঠের বিছানায় বালিশ নিয়ে ঘুমাতো। মেয়ে বাচ্চা আর কালচে শ্যামলা গায়ের রঙ বলে কেউ তাকে নিতে চায়নি। তারপর এই কুল আম্মু তাকে নিয়ে আসে তার কোলে করে, তার ঘরে। ঘরটি খুব শূন্য ছিল যে তার। তার ভালবাসার মানুষটিও আর ছিল না সেই ঘরে। কুল আম্মুটি তার সমস্ত হৃদয় উজাড় করে দিয়েছিল ভালবাসা দিয়ে, বড় করেছে এই মেয়েটিকে।

স্কুলে পড়ার সময়ে তার মেয়েটি মুখ ব্যাজার করে মার কাছে এসে বলতো- আম্মু, আব্বু এত ফর্সা ছিল, তুমিও টকটকা ফর্সা, আমি এমন কাইলানী কেন??? আমাকে কি রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছিলে?

আম্মু চশমা সরিয়ে বিরক্ত হয়ে বলতো- আজকাল স্কুলে তোদের পড়ায়টা কী? রিসেসিভ জিন বলে যে একটা ব্যাপার আছে, সেইটা জানিস না? স্টাডি করে আয় নেটে সার্চ দিয়ে! মূর্খই থেকে যাবি দেখছি! পিএইচডি করা মায়ের মেয়ে এমন মূর্খ হলে কেমনে হবে?

মেয়েটি নেট সার্চ করে কিছুক্ষণ পর খুশি মনে দাঁত বের করে হেসে বলতো- আম্মু! পাইছি রিসেসিভ জিন কী! সাদা ধবধবে বাবা মার কাইলা বাচ্চা হইতে পারে, আমার মতো! ইন্দুর দিয়ে ক্রস করে বের করছে বিজ্ঞানী মেন্ডেল!

হ! এখন ইন্দুরের মতো হাসা অফ কর। বইটা শান্তিমত পড়তে দে আমাকে..

মেয়েটি খিলখিল করে হাসতো…..

………………………………..

ডায়েরিটা কথা বলছে। তবে সেটা আজ থেকে ত্রিশ বছর পরের কথা বলছিল.. এখনকার কথা না।

মেয়েটির মায়ের বয়সই তখন ঊনিশ। প্রচণ্ড একটা ঝড়ে আজকে তার জীবন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে! এ ভয়ানক ঝড়ের ঘটনাটি শোনার মতো আজকে কেউ নেই! কাউকে বলার মতো কেউ নেই। কোনো ফ্রেন্ড নেই, কেউ নেই। মায়ের কাছে গিয়েছিল একবার, মা ফোনে কথা বলায় ব্যস্ত ছিল, বিরক্ত হয়ে বলেছে- কাজের সময় এতো ডাকিস কেন?

মেয়েটি তখন ডায়েরি লিখতে বসেছে.. সে কী কী করবে.. অনেক পড়াশুনা করবে জীবনে, অনেক বড় হবে.. একটি অনাথ বাচ্চাকে আম্মুর মতো বড় করবে.. মেয়েটি কখনো একা একা বালিশ চেপে বা আয়না ধরে তার মতো করে কাঁদবে না.. কক্ষণও না… সে হবে সবচে কুল বন্ধু, সবচে কুল একজন মানুষ, অনেক জ্ঞানী, অন্য রকম একটা মানুষ, আর নিজের পেটে না ধরেও সবচে কুল একটা আম্মু..

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.