কেবল গায়ে হাত তোলাটাই কি নির্যাতন!

0

অনন্যা নন্দী:

ঘটনা ১: কান্তা শুভ’র বাগদত্তা। শুভ খুব ব্রিলিয়ান্ট, সাহিত্যপ্রেমী একটা ছেলে। সুপ্রিম কোর্টে প্র্যাকটিস করে। সমাজে বেশ নাম আছে। কিন্তু কান্তা ছিল তার বিপরীত। লেখাপড়ায় মোটামুটি, দেখতেও সাধারণ, মধ্যবিত্ত পরিবারের একটা মেয়ে। দুর্ঘটনাবশত তাদের এনগেজমেন্ট হয়ে গেলেও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা কান্তার জন্য দিন দিন মানসিক চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণটা ছিল শুভ’র অহংকার এবং অবহেলা।

প্রতিনিয়ত শুভ নিজের এবং কান্তার যোগ্যতা-অযোগ্যতাগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ করতো। কান্তাকে বন্ধুমহলে পরিচয় করিয়ে দিলেও কান্তার খুঁতগুলো নিয়ে অালোচনা করা ছিলো তার প্রিয় টপিক। তার বন্ধুর বৌদের সাথে কান্তাকে তুলনা করাটাও ছিল শুভ’র নিত্যদিনের বিনোদন। এমনকি কান্তাকে ভালো একটা গিফট কিনে দেয়ার সময়েও শুভ কান্তার পরিবার থেকে কী পেয়েছে তা হিসাব করতো। অবশেষে একদিন কান্তার ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেলো। অাংটিটা শুভ’র মুখের উপর ছুঁড়ে মেরে কান্তা বেরিয়ে এসেছে সকল অবহেলা এবং নির্যাতন থেকে।

ঘটনা ২:
পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছিল নিশু এবং রাসেলের। রাসেল স্বামী হিসেবে অনেক বেশি ভালো ছিল। কিন্তু নিশু ছিল বেকার। গ্র্যাজুয়েশান শেষ করে চাকরির জন্য এপ্লাই করছিলো। চাকরি খু্ঁজতে রাসেল নিশুকে সাপোর্ট দিলেও দিন দিন সেই সাপোর্ট রূপান্তরিত হচ্ছিল মানসিক চাপে। প্রথমত: রাসেলের মা চাইতো নিশু যেন এমন একটা চাকরি করে যে চাকরি করার পর বাসায় এসে রান্নাবাড়াও করা যাবে, দ্বিতীয়ত: রাসেলের বাবা চাইতো বৌমা যেন সরকারি চাকরি করে, তৃতীয়ত:রাসেল চাইতো বাচ্চা নিতে।

এতোগুলো শর্ত পূরণ করে কীভাবে একটা ভালো চাকরি ম্যানেজ করবে, সেই চিন্তায় নিশু পাগল হয়ে যাচ্ছিল। তাছাড়া সংসারের সব কাজ সেরে চাকরির জন্য পড়াশোনা করাটাও তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। অন্যদিকে নিশু এক একটা চাকরির পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়, অার রাসেলের মৌখিক অবমাননার শিকার হতে হয়। রাসেলের কেবল একটাই শর্ত ছিলো নিশুকে যে করেই হোক দ্রুত ভালো চাকরি যোগাড় করতেই হবে, কারণ রাসেলের পরিবারের অন্য বৌগুলোও খুব ভালো চাকরি করে। অবশেষে নিশু বাধ্য হয়ে তার মায়ের বাসায় ফিরে এলো। রাতদিন পড়াশুনা করে জুটিয়ে ফেললো একটা ভালো চাকরি। তবে রাসেলের ঘরে অার সে ফেরত যায়নি। কারণ যে সংসারে কেবল চাকরি দিয়ে মানুষের মূল্যায়ন হয়, সেই সংসারকে তার সংসার মনে হয় না।

কোর্টে প্র্যাকটিস করার দিনগুলোতে অামি যতগুলো ডিভোর্স মামলা ফাইল হতে কিংবা ডিভোর্স হতে দেখেছি তার মধ্যে ৯০ শতাংশ ডিভোর্সের কারণ দেখেছি স্বামী অথবা স্বামীর পরিবারের অন্য সদস্যদের দ্বারা শারীরিক নির্যাতন। তাও শারীরিক নির্যাতন যতোদিন কেবল দু’একটা চড়-থাপ্পরে সীমাবদ্ধ ছিল ততোদিন কোনো মেয়ে কোর্টের দ্বারস্থ হয় না। যতোদিন না দু’একটা চড়, থাপ্পর, পিঠে গরম খুন্তি কিংবা জ্বলন্ত সিগারেটের ছ্যাঁকায় রূপান্তর হচ্ছে, বাঙ্গালী মেয়েরা সেই অাদিম যুগের “মানিয়ে নাও, মেনে নাও” নীতিতে বিশ্বাসী। অবশিষ্ট ১০ শতাংশ মামলা দায়ের হয় স্বামী ভরণ-পোষণ না দেয়ার কারণে। তার মানে অামরা যদি একটু গভীরে যেয়ে ব্যাপারটা অনুধাবন করি, তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়ায় এরকম যে, বাঙ্গালী মেয়েরা গায়ে নির্মমভাবে হাত তোলা কিংবা ভরণ-পোষণ না দেয়াটাকেই নির্যাতন হিসেবে মনে করে।

সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, এই মানসিকতা কেবল অশিক্ষিত কিংবা স্বল্পশিক্ষিত মেয়েদের মধ্যেই না, সমাজের সর্বোচ্চ পেশায় কর্মরত নারীদের মধ্যেও দেখা যায়।

জোর করে সংসারের বিভিন্ন অনৈতিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া, স্বাধীনভাবে পেশা বাছাই করতে না দেয়া, যোগ্যতাকে খাটো করে দেখা, সংসারে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অংশ নিতে না দেয়া কিংবা মত প্রকাশে বাধা দেয়া, ছেলে বন্ধুদের সাথে বেড়াতে যেতে না দেওয়া, কিংবা সংসারের দোহাই দিয়ে ফ্রেন্ডদের সাথে কোথাও যেতে নিষেধ করা ইত্যাদি ঘটনাকে মেয়েরা কখনও নির্যাতন মানতে রাজি না।

এককথায় বলতে গেলে মানসিক কোনো নির্যাতনই বাঙ্গালী মেয়েদের কাছে নির্যাতনের ক্যাটাগরিতে পড়ে না।

উপরোক্ত দু’টো ঘটনা বিবেচনা করে অামার কাছে তো মনে হয় শারীরিক নির্যাতনের চাইতে মানসিক নির্যাতন অনেক বেশি ভয়াবহ। কারণ এই সমাজটা একটা মেয়ের শরীরের কালো দাগগুলো দেখে তার প্রতি যতোটা সহানুভূতি দেখায়, মনে জমে থাকা কষ্টগুলোকে কোনো গুরুত্বই দেয় না। “মেনে নেয়া, মানিয়ে নেয়া” যদি সংসারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়, এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটা স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই কেন করে না!!

অামার মতে যে কোনো ঘটনা যেটা একজন মেয়ের ডিগনিটি কিংবা সেল্ফ রেসপেক্টকে অাঘাত করবে, অথবা তার স্বাভাবিক জীবন-যাপনে বাধা দিবে সেটাই নির্যাতন। একটা কথা সকলের মনে রাখতে হবে যে, স্যাক্রিফাইস, কম্প্রোমাইজ অবশ্যই জরুরি, তবে যখন এসবের মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, তখন সেটা নির্যাতন। তাই এসব নির্যাতন সহ্য করে কখন নিজেদের উপর সিগারেটের ছ্যাঁকা পড়বে কিংবা ঘাড় ধাক্কা দিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে বের করে দিবে তার জন্য অপেক্ষা না করে কান্তা এবং নিশুর মতো নিজে থেকেই সেই সম্পর্ক ভেঙ্গে বেরিয়ে অাসার পথ খুঁজতে হবে।

শিক্ষানবীশ অাইনজীবী
চট্টগ্রাম জজ কোর্ট

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.2K
    Shares

লেখাটি ৩,৬৭৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.