শ্বশুরালয় ছেলেদের জন্য মধুর, আর মেয়েদের?

0

সাজু রহমান:

এই তো সেদিনের কথা, মা-বাবার ঘর আলো করে জন্ম নিলো ফুটফুটে চেহারার শিশুটি। বাড়ি ভরা মানুষ দাদা, দাদী, নানা, নানী, ফুপু, খালাসহ আশপাশের পড়শি। আদর করে নাম রাখা হলো সোমা। কন্যা সন্তান বলে পরিবারের অনেকেরই একটু মন খারাপ। আকুতি, প্রথম সন্তান ছেলে হলে ভালো হতো। এই ভালো কার হাতে..? সোমার মা..? বাবা..? না অন্য কেউ..?

এই শুরু হলো একটা কন্যা সন্তানের যাত্রা …একটু কঠিনই। যতই সোমা বড় হতে থাকলো, ততই তার ও একটা ছেলে সন্তান আর সমাজের পার্থক্য বুঝতে শুরু করলো.. তারপরও মা-বাবার ঘরে আদর আহ্লাদের তেমন একটা কমতি নেই । নিয়ম করে খাওয়া, পড়ালেখা সবই চলছে ভালোভাবে।

দেখতে দেখতে শৈশব কাটিয়ে কৈশরে পা রাখলো সোমা। শরীরের একটা পরিবর্তন নিজে যেমন টের পাচ্ছে, তেমনি পাড়া পড়শিরাও। ফ্রক ছেড়ে সালোয়ার – কামিজ ও ওড়না বুকে জড়িয়েছে। কাউকে কাউকে দেখলে বুকের মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ একটু কাঁপনও অনুভব করছে। সবকিছু কেমন জানি ভালোও লাগছে তার। কারণে অকারণে নির্জনে বসে কল্পনার সাগরে ডুব দেয়া। এ এক অন্য রকম অনুভূতি।

জীবনে সবচেয়ে সুখের সময়টা পার করছে … এমন সময় সবার আড় চোখ এখন তার দিকে, কিন্তু কেন? কারণ সোমা বড় হয়ে গেছে, পরের ঘরে যাওয়ার সময় হয়েছে। তাকে বিয়ে দিতে হবে। মা-বাবার কান ভারী করতে কেউ দ্বিধা করছে না। বেচারা সোমা, এদেশের লাখ লাখ মেয়ের কপালে যা ঘটে, এই পরিণতি থেকে কীভাবে রেহাই পাবে? এমন কোনো রাজকুমার আছে যে পঙ্খীরাজে চড়ে এসে সোমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে! তার ইচ্ছা অনিচ্ছাকে মূল্যায়ণ করবে? এমনটা ভাবা নিস্ফল আবেদন ছাড়া আর কিছুই না। যাই হোক পরিবারের পছন্দের ছেলের সাথেই তার বিয়ে হলো। কাংখিত সেই শ্বশুরালয়ে পা রাখলো সোমা।

শুরু হলো সোমার জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস। এখানে আসার পর থেকে প্রথম গায়ের রংটা একটু চাপা, আর একটু লম্বা দরকার ছিলো ইত্যাদি ইত্যাদি। সোমার ভাবনার শুরু এভাবে, আগে কেউ তো কিছু বলেনি। এখন কেন সবাই এভাবে বলছে? একটু একটু মন খারাপ হতে শুরু হলো। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-পড়শী বিয়ে বাড়ি বলে কথা, একেবারেই ঘর ভরা।

একটু বাদে শুরু হলো কেন গোমড়া মুখে আছে, নতুন বউ এর শ্বশুরের ঘর কি পছন্দ হয়নি? পরের দিন বিয়ের কিছু আনুষ্ঠানিকতা থাকে, সে সব যথারীতি হচ্ছে, কিন্তু সমস্যা এ সবের তো কিছুই বোঝে না ছেলের বউ। তাকে তো বাপের বাড়ি থেকে কোন ধরনের নিয়ম নীতিই শেখায়নি। না পারলো দুধের বলক ঠেকাতে, না পারলো মাছের মুড়ো কাটতে। কেউ কেউ বলাবলি করছে সকাল দেখলে বোঝা যায় দিনটা কেমন যাবে। এ কথার মানে সোমার জানা নেই কেন বলছে। তবে এটা বুঝতে পারছে তার উদ্দেশ্যে, এভাবে কেটে গেল দু’দিন। এরপর বাপের বাড়ি যাওয়ার পালা।

যথারীতি স্বামী পতিদেবকে নিয়ে বাপের বাড়িতে এলো। সোমার মনে হলো এবার তার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। এই দু’দিনে সে বুঝতে পেরেছে, বাপের বাড়িতে সে যখন যা খুশি বলতে পারে, করতে পারে, হয়তো মায়ের সামান্য বকুনি এটুকুই। আর শ্বশুর বাড়ি, সেটাতো মাত্র দু’দিনে হাড়েহাড়ে টের পেয়েছে।
অন্তত স্বাধীনতা শব্দটার যথার্থ মর্মবাণী তার পক্ষে বোঝা সম্ভব হয়েছে বলে মনে হয়। যাই হোক, সোমা একটু তো অবাক হচ্ছে বাপের বাড়ি আসার পর তার স্বামীকে আদর-আপ্যায়নের কমতি নাই এ বাড়ির লোকেদের। তাকে নিয়ে কেউ কিছু বলছে না। তাকে দেখতে কেমন, সে কী পারে, কী পারে না, আদব -কায়দা কিছু জানে কিনা!

অদ্ভুত লাগছে সোমার। অনেকে আবার কলছেন, সোনার আংটি বাঁকাও ভালো। ছেলেরা হচ্ছে সোনা। তার অনেক দাম, সেটা যাই হোক, এটা মূল্যবান ধাতু। এই ধাতু যতক্ষণ পর্যন্ত জীবিত থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এর দামও অপরিবর্তিত থাকবে। এবং আমাদের সমাজে তাইই বাস্তবতা। মেয়ে তো মেয়েই .. এদের আবার দাম কী?

এভাবে পার হয়ে গেল তিন তিনটে দিন। কিন্তু সোমার দিন ফুরিয়ে আসছে, সুখের দিন শেষ হচ্ছে। যেটুকু সুখ সে অনুভব করলো সে জায়গাটা তার নয়, ছেলের শ্বশুরালয়!

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 691
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    691
    Shares

লেখাটি ২,৩৮৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.