অপরাধীর চিকিৎসা, মৌলবাদ ও মানবিক দায়

0

সৈকত আমীন:

মেহের আফরোজ শাওন এবং তোফাজ্জেল হোসেন চ্যালেঞ্জার অভিনীত হুমায়ূন আহমেদ এর একটা নাটক আছে। পাপ। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত।

তো, সেই নাটকের মূল গল্প হচ্ছে – একজন পাকিস্তানি সৈনিক মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যুদ্ধরত অবস্থায় আহত হয়ে দলবিচ্ছিন্ন পড়ে আশ্রয় ন্যায় মুক্তিযোদ্ধাদের একজন পৃষ্ঠপোষকের বাড়িতে। সেই বাড়ির বউ ঘটনাক্রমে যে কিনা সন্তান সম্ভবা, সে তাকে আশ্রয় দেয়, সেবাযত্ন করে ধীরে ধীরে সুস্থ করে তোলে এবং বলে রাখা ভালো শাওন নিজেও জয় বাংলার লোক।

তো, একসময় তাদের মাঝে ইশারা ইঙ্গিতে কথোপকথন শুরু হয়, যেহেতু কেউই কারো ভাষা বোঝে না। পাকিস্তানি সৈনিক তাকে জানায় পাকিস্তানে তার সংসার আছে, তার বাচ্চার ছবি দেখায় শাওনকে। শাওন জানায় সে সন্তান সম্ভবা। এবং পাকিস্তানি সৈনিক তাকে “মা” বলে সম্বোধন করে। এরপর একদিন পাকিস্তানি সৈনিক সুস্থ হয়ে ক্যাম্পে ফিরে যায়, কিন্তু পরে আবার ফিরে আসে, তবে একা নয়, দলবল নিয়ে।

চ্যালেঞ্জারের বাড়িতে তল্লাশি চালায় মুক্তিযোদ্ধাদের রেখে যাওয়া অস্ত্রের সন্ধানে, অস্ত্র পায় এবং শাওন, যাকে সে মা বলে ডেকেছিল, তার সামনেই স্বামী চ্যালেঞ্জার এবং তার বড়পুত্রকে গুলি করে হত্যা করে চলে যায়। গল্প সেখানেই শেষ।

এই গল্পের মোরাল অব দ্য স্টোরি আরেকটু পরে বলছি।

আমার রক্তের গ্রুপ “বি নেগেটিভ”, যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ওয়ান অব দ্যা রেয়ার ব্লাড গ্রুপ।

আমি জীবনে সচেতনভাবে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে একবারই ঢুকেছি, রক্ত দিতে। রোগীকে যতদূর চিনি সে আগাগোড়া মৌলবাদী একজন লোক। অভিজিৎ রায় হত্যার পর সে স্ট্যাটাস দিয়েছিলো “আরেক উইকেট পতন”।
যাই হোক, রক্ত দেওয়ার অপেক্ষায় ভিজিটরস রুমে বসে ছিলাম, তখন আসরের ওয়াক্ত, রোগীর ভাই আমাকে বললেন, “চলেন ভাই নামাজটা একসাথে পড়ে আসি”

জানালাম আমি নামাজ পড়ি না, তখন সে উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলো আমার পুরো নাম কী? এবং নাম শুনে জিজ্ঞেস করলো, মুসলিম না খ্রিস্টান! জানালাম ‘নাস্তিক’।
এবং আমার রক্ত নিবে কি নিবে না এ নিয়েও সে দ্বিধায় পড়ে গেল, শেষমেশ যদিও রক্ত নিলো।

এমন একজনকে রক্ত দিলাম, যার পুরো বংশসুদ্ধ মানুষ প্রকাশ্যে আমার মৃত্যু কামনা করে।

কিন্তু ঘটনা সেইটাও নয়, এবার আসল ঘটনায় আসি।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এর সাবেক শিক্ষক রাজীব মীর, যার নামে একাধিক যৌন নিপীড়ন এর অভিযোগ। তিনি এখন অসুস্থ, গুরুতর পর্যায়ে। তার চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন, যা তার পরিবারের নেই। সেই টাকা সংগ্রহের জন্য শেষমেশ পাবলিক ফান্ডিং শুরু হলো। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণও করছিলো সেখানে। কিন্তু বাগড়া বাঁধলো গিয়ে পরে, যখন বাজারে পুরাতন ফতোয়ায় নতুন তত্ত্ব প্রয়োগ করা হলো।
অপরাধীর জান বাঁচানোও নাকি অপরাধ!

তো, ব্যাপারটা তেমন হতেও পারে, বুদ্ধের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার দরুণ আমিই হয়তো তা বুঝতে পারছি না।

কিন্তু একটা জিনিস খেয়াল করে দেখছেন!
রাজাকার শিরোমণি অধ্যাপক গোলাম আযমের মতো হারামি যখন অসুস্থ ছিলো, তখনো এই রাষ্ট্র তারে চিকিৎসা করিয়েছে, প্রতিবেলায় বেলায় বাহারি খাবার খাইয়েছে, এবং সেটা আমার এবং আপনার টাকায়’ই।
আমরা সেটা নিয়ে হাউকাউ করি নাই, বরং চেয়েছি, শালা সুস্থ হোক, অসুস্থ মানুষকে যেহেতু ফাঁসি দেওয়ার নিয়ম নেই (যদিও তার ৯০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল বিচারে)।

তো, এই যে রাজীব মীর, যে কিনা অসুস্থ, সে কি গোলাম আযমের থেকেও অধম? আর যদি হয়ও, তাতে কি তার চিকিৎসা না পেয়ে মরার ব্যাপারটা জায়েজ হয়ে যায়?
তাহলে আপনার আর একজন মৌলবাদীর চিন্তায় পার্থক্যটা কোথায়?

সেই পাকিস্তানি সৈনিকের কথা বলি এবার,
সে যখন সাহায্য চাইতে আসছিলো তখন পাকিস্তানি সৈনিক হিসেবে আসে নাই, আসছিলো অসহায় হিসেবে, অসহায়কে হত্যা করা তখন পাকিস্তানি সৈনিকের সংস্কৃতি হয়ে গেছিল, কিন্তু একজন মায়ের সংস্কৃতি চিরকাল অসহায়কে সাহায্য করা। এমনকি সে যখন জানে যে পরে এই লোকই তাকে হত্যা করতে পারে, তখনও।

যেই ব্যক্তিকে আমি রক্ত দিয়ে বাঁচালাম, সে এখনও আমার মৃত্যুই কামনা করে। এবং হত্যার সুযোগ পেলে সে পিছপা হবে না স্বাভাবিকভাবেই। তার ধর্ম তাকে শিক্ষা দেয় আমায় হত্যা করতে, আমার কোনো ধর্ম নাই, আমার বিবেক বলে আমাদের শত্রুতার চেয়েও একটা মানুষের জীবনের মূল্য অনেক অনেক বেশি, এবং সংকটে যদি তার পাশে না দাঁড়াই, তবে তার আর আমার মাঝে মৌলিক কোনো পার্থক্য আসলে থাকে না।

রাজীব মীর অসুস্থ, সে যৌন নিপীড়ন এর দায়ে অভিযুক্ত।
যৌন নিপীড়ক রাজীব মীরকে বাঁচানোর কোনো প্রয়োজন নেই।
কিন্তু আপনার কাছে সাহায্য চাইছে একজন অসহায় মানুষ রাজীব মীর।
একজন মানুষকে বাঁচান।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 80
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    80
    Shares

লেখাটি ৮৫০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.