একজন সিঙ্গেল মায়ের পড়ন্ত বিকেল

0

ঈশিতা বিনতে শিরিন নজরুল:

মেয়েটি প্রতিটি মুহুর্তেই কাঁদে। প্রতি রাতে যখন তার স্বামী পাশের ঘরে হস্তমৈথুন করে, অথচ মেয়েটিকে ছোঁয় না; তখনও কাঁদে মেয়েটি। কাঁদে অপমানে, যন্ত্রণায়, কাঁদে প্রাপ্য ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হওয়ার দুঃখে। মেয়েটি যখন কথা বলতে যায়, স্বামী বিরক্তিতে ভুরু কুচকিয়ে থাকে! মেয়েটি তখনও কাঁদে, ভেতরে ভেতরে… প্রচণ্ড যন্ত্রণায় সে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যায়। সদ্য জবাই করা গরুর মতো ছটফট করতে থাকে।
না, স্বামী সেটি দেখে না। সে স্বামীকে প্রচণ্ড ভালবাসে, স্বামীও ভালবাসতো; এখন বাসে না।

এখনও পড়ে আছো তুমি? কেন চলে যাচ্ছো না? – বলে মেয়েটির স্বামী

তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারবো না যে!! এ তো আমারও সংসার। নিজের সংসার ফেলে কেন মায়ের সংসারে চলে যাবো? মেয়েটি এই একই কথা বলেই যায়…….

মেয়েটিও ইগো দেখিয়ে, রাগ দেখিয়ে চলে যেতেই পারতো। ভেঙ্গে যাবে সংসার। গড়া কঠিন, ভাঙ্গা তো চোখের পলকেই সম্ভব। কিন্তু গড়তে লাগে শতশত মুহুর্ত। একটি ভুল বোঝাবোঝি যখন নিমেষেই সব নষ্ট করে দেয়, তখন দায় তো শুধু মেয়েটিরই। ক্ষমা চাইতে চাইতেও মেয়েটির ক্লান্তি নেই, তাও কিছুতেই মন গলে না, ভালো, কিন্তু হঠাৎ পাষাণ হয়ে যাওয়া স্বামীটির! কিন্তু মেয়েটি জানে এটিই ভালবাসার জায়গা। হয় তার সাথে থাকো, নইলে একা থাকো। এটিই বাস্তবতা। এই বয়সে মায়ের সংসারে গিয়ে থাকতে কার ভালো লাগে? হ্যাঁ, মা-বাবা,ভাই-বোন অাপন। কিন্তু একটা সময়ের পর মানুষ চায় নিজের মতো করে থাকতে।

তোমাকে সহ্য করতে পারি না আমি!! মেয়েটি তার সমস্ত আত্মসম্মান বাদ দিয়ে পা ধরে বসে থাকে স্বামীর দিনের পর দিন। কিন্তু হায়, পাষাণের হৃদয় তো গলে না।

মেয়েটির কথা বলার কেউ নেই। মেয়েটি এখন বোবা হয়ে গিয়েছে। সেই উচ্ছ্বল, হাসিখুশি মেয়েটি বেঁচে থেকেও যেন আজ মরে গেছে। নরকের বর্ণনা শুনেছে মেয়েটি। এই পৃথিবীই যে নরক হতে পারে, সেটি মেয়েটি প্রতিদিন বুঝতে পারে। মেয়েটি অসহায় হয়ে কাঁদে, সে যেতে চায় না তার স্বামীকে ছেড়ে। কিন্তু যদি যাকে ভালবাসা হয়, সেই তাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে, তখন অার কীসের ভরসায় বেঁচে থাকা মেয়েটির??

মেয়েটি স্বামীকে ছেড়ে যেতে চায় না, স্বামী মেয়েটিকে রাখতে চায় না! এ রকম জটিল বাস্তবতায় একেক মানুষ মেয়েটিকে একেকভাবে বোঝায়, কেউ কটাক্ষ করে, কেউ নানা নারীবাদী দর্শন আওড়ায়। কিন্তু তার মনের কথা, তার ইচ্ছার কথা আদৌ কেউ বুঝতে পারবে কি? স্বামীর অনেক ভুলেও কিন্তু একজন স্ত্রী সাধারণত তাকে ছেড়ে যেতে চায় না। নিজের আলাদা পরিচয় এবং অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হবার পরেও শুধু স্বামীকে ভালবাসার কারণে অনেকেই কিন্তু ছেড়ে যেতে চায় না প্রিয় মানুষটিকে। কিন্তু যখন সে যায় তখন বাধ্য হয়েই যেতে হয়। কিন্তু স্ত্রীর ভুল বোধকরি পৃথিবীর কোন পুরুষই ক্ষমা করতে পারে না, হোক সেটা ছোট কিংবা বড়; সেটা হোক বাংলাদেশে কিংবা জার্মানির মতো প্রথম বিশ্বের দেশে! মেয়েটির স্বামী প্রতিদিন চাপ দেয় তাকে সংসার ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য। কী ভাবছেন, মারধোর করে? নাহ্, শিক্ষা মানুষকে কৌশলী হতে শেখায়, মানসিকভাবে প্রতিনিয়ত আঘাত করার শিল্পকে রপ্ত করা শেখায়।

কী করবে এখন মেয়েটি?? সে কি সারাজীবন অপেক্ষা করবে স্বামীর ক্ষমা পাবার জন্য? স্বামীর ভালবাসা আর বন্ধুত্ব ফিরে পাবার জন্য? নাকি ফিরে যাবে তার মায়ের সংসারে? নাকি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে? নাকি তাকে স্বপ্ন দেখতে হবে একটি ছোট্ট সংসারের যেখানে সে সিঙ্গেল মা হিসেবে সন্তানকে নিয়ে নতুনভাবে বাঁচবে? পারবে সে সিঙ্গেল মায়ের কঠিন লড়াই এ জয়ী হতে?

বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে সিঙ্গেল মাদার বা একক মায়েদের সন্তানকে বড় করে তোলার ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয় বলে সবাই মনে করে। কিন্তু আমি বলি, পৃথিবীর যেকোনো দেশেই এটা একজন মায়ের জন্য চ্যালেঞ্জ। বিদেশে হয়তো এতো মানুষের কথা শোনার বালাই নেই। কিন্তু একা মায়ের নিজের সন্তানকে নিয়ে লড়াইটা তো আছে। এই লড়াই সব দেশেই একই রকম কষ্টের। তাই সেই মেয়েটিকে কিছু বলতে আমি পারি না। আমি সেই মেয়েটির ভুল করেও স্বামীর কাছে ক্ষমা চাওয়াকে যেমন সম্মান করেছি, তার স্বামীর প্রতি ভালবাসাকেও সম্মান করছি; আবার পাশাপাশি এও মনে করছি যে, তাদের সন্তান কি মায়ের প্রতি বাবার অবহেলা বড় হয়েও মেনে নিবে? বড় হয়ে তার মা অথবা বাবা কিংবা দুজনের প্রতিই কি ক্ষোভ জন্মাবে না? অথবা যে স্বামীটি তার সাথে থাকতে চায় না, সেই স্বামীটিও তো নিজের জীবন নির্বাচন করার অধিকার রয়েছে, যে থাকতে চায় না তাকে কি জোর করে আটকানো যায়? এরকম হাজারও প্রশ্ন আমার মনে ভীড় করে। আমিও আশা করতে থাকি যে, নিশ্চয়ই মেয়েটির ভালবাসার ও ধৈর্য্যের জয় হবে।

হ্যাঁ, মেয়েটি তার প্রিয় স্বামীর স্বস্তির কথা ভেবেই জার্মানির ছোট্ট একটি শহরে ছোট্ট একটি বাসাতে সন্তানকে নিয়ে থাকতে শুরু করে। প্রতি মুহুর্তে মা আর তাদের ছোট্ট সন্তানটি প্রিয় মানুষটিকে কাছে না পাবার শূন্যতা অনুভব করে। সে এক অবর্ণনীয় হাহাকার তাদের জন্য।

অন্যদিকে, সেই বাবাটিও কি সন্তান কাছে পাবার, একটু ছুঁয়ে আদর করার, গায়ের গন্ধ নেবার জন্য আকুল হয়ে ওঠে না? মা আর ছেলের ছোট্ট সংসার। ছোট্ট ছেলেটিকে বড় করতে মা হিমশিম খেয়ে যায়। না, অন্য কাউকে মেয়েটি ভালবাসতে পারে না। সকালে স্কুলে দিয়ে মায়ের কাজে যাওয়া, ফিরতি পথে ছোট্ট ছেলের হাত ধরে শূন্য ঘরে ফিরে আসা। নিজের ক্যারিয়ারের স্বপ্ন তো মাটিচাপা, শুধু সন্তানকে মানুষ করার চিন্তায় মগ্ন। স্বামীর সাহায্য সে নিতে চায় না। হয়তো সেটি তার অধিকার, কিন্তু যে মানুষটির জীবনেই তার স্থান হলো না, তার কাছ থেকে হাত পেতে সে কেন নিবে?

আমি ভাবছি, বাংলাদেশের মতো জায়গাতে এটি আরও কত কঠিন হতো! ভালবাসাহীন মানিয়ে চলায় আমার আপত্তি আছে, হোক সেটা মেয়ে অথবা ছেলের ক্ষেত্রে। তাই স্বামীকেও আমি কীভাবে দোষ দিই? শুধু মানিয়ে চলে জীবনটা পার করে দেয়ার নাম তো বেঁচে থাকা নয়। আবার সত্যিকারের ভালবাসাকে অবহেলা করে ভুল বুঝে দূরে সরিয়ে দিয়ে জীবন পার করার নামও বেঁচে থাকা নয়।

আজ প্রায় ৩০ বছর পরের পড়ন্ত বিকেলের আলোয় বারান্দায় একা বসে সেই মেয়েটির চায়ের কাপ হাতে ছেলের প্রতীক্ষায় থাকার সময়। আজ তাকে বার্ধক্যে ধরেছে, মুখের চামড়া কুঁচকে গিয়েছে, চুলগুলোতেও পাক ধরেছে। সেই ছোট্ট ছেলেটিও আজ অনেক বড় হয়েছে, তার নিজের জগৎ হয়েছে। এটিই প্রকৃতির নিয়ম।

আমি শুনছি আর ভাবছি, গল্পটা তো অন্য রকমও হতে পারতো। ভুল বোঝাবুঝি অাঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার গল্প এটা। চায়ের কাপ হাতে বুড়ো-বুড়ি দুজনে একসাথে বারান্দায় বসে পুরোনো দিনের গল্প নিয়ে খুনসুটির, হাত ধরাধরি করে দুজন রাস্তা পার হওয়া, একজন অসুস্থ হলে অন্যজনের উৎকন্ঠা নিয়ে পাশে থাকার গল্পটাও হতে পারতো, যদি না ভুল বোঝাবুঝি অাকঁড়ে না থাকতেন তারা।

আমার কাছে পরেরটাই ভালো লাগছে। কিন্তু বাস্তবতা তো সেই ৩০ বছর আগের মেয়েটিকে আজ এই পড়ন্ত বিকেলে একাকি ক্লান্ত হয়ে বসে থাকাকেই সমর্থন করছে! অাহারে জীবন…।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 692
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    692
    Shares

লেখাটি ৩,১৬৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.