মা, বোন, বন্ধুদের পাশে দাঁড়ান আপনারা

0
ফারিহা ইসলাম মুনিয়া:
বাংলাদেশের ছেলেরা জীবনের একটা বিশাল অংশ পার করে নারীদের সাথে। বাসায় মা, বোন, বিয়ের পর স্ত্রীর সাথে একটা জীবন। বাইরে ক্লাসমেট, প্রিয় মানুষের সাথে ক্যাম্পাস জীবন। কিন্তু কী অদ্ভুত ব্যাপার, এরা সারাটা জীবন নারীদের স্পেশাল মুহুর্তের কষ্টগুলির কথা না জেনেই লাইফ পার করে দেয়!
যাদের ঘরে পঞ্চাশ পেরুনো মা আছেন, তাদের কি আইডিয়া আছে মেনোপজ হয়ে যাওয়া তার মা কী পরিমাণ শারীরিক ও মানসিক কষ্টের ভিতর দিয়ে যাচ্ছেন? হ্যাঁ, এগুলা স্বাভাবিক, তারা এগুলা নিয়ে কথা বলেন না, কিন্তু তার মানে এই না তারা কষ্টের ভিতর দিয়ে যাচ্ছেন না। তারা অনেক কষ্ট করছেন যেটি আপনি জানেন না।
মেনোপজ হয়ে যাওয়া মায়েদের নানা রকম শারীরিক কষ্ট হয়। তার মাঝে একটি হলো হট ফ্ল্যাশ! গা দিয়ে প্রচণ্ড গরম ভাঁপ বের হতে থাকে, জ্বালা পোড়া করে, পায়ের তালু জ্বলে। গা ম্যাজম্যাজ করে। ব্যথা করে। কিছুতেই শান্তি পাওয়া যায় না। হাঁসফাঁস লাগে। নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে মাঝে মাঝেই ঘুম থেকে জেগে।
হরমোনাল কিছু চেঞ্জ এর কারণে এমনটা হয়। এর আরেকটি সাইড ইফেক্ট হলো অকারণে বিষন্নতা ভর করা। অকারণে মনের ভিতর কষ্ট হয়। তখন পরিবারের মানুষগুলো তাকে সংসারের পুরা দায়িত্ব তার ঘাড়ে দিয়ে একাকি ফেলে রাখলে সেটি আরও ডিপ্রেশনে ফেলে দেয়। আপনার মা’টি একাকি হয়তো কান্নাও করেন, আপনি জানেন না। এর কারণ আপনার মা অসুখী তা নয়, পুরা কারণটাই হলো হরমোনাল চেঞ্জ। কিন্তু যে কষ্টটা তিনি ফিল করেন, সেটিই আসল।
আপনার বোনদের বা ক্লাসমেটদের প্রতি মাসে যে পিরিয়ড হয়, সেটির কষ্ট কি জানেন? আমি বলি তাহলে কেমন লাগে। সারাক্ষণ তলপেটে একটা অসহ্য ব্যথা বয়ে বেড়াতে হয়, চিনচিন করে ভোঁতা একটা ব্যথা নিয়ে ফ্লুইড নেমে আসছে সেটি সারাক্ষণ টের পাওয়া যায়! সাতদিন সেটি সহ্য করতে হয়, সেই সাথে ভয়াবহ মাসল ক্র‍্যাম্প হয়। হাত পা খুব চিবুতে থাকে। কিচ্ছু করতে ইচ্ছে হয় না তখন।
সবচে বড় ব্যপার হলো মেয়েদের সেই কষ্টটি হাসিমুখে নিয়ে কাজ করতে হয়, স্কুল কলেজ চাকরি বাকরি বা অফিসে যেতে হয়। আশে পাশে কেউ না থাকলে পেটে হাত চেপে অসহ্য ব্যথাটা কমানোর ট্রাই করতে হয়। আপনারা কখনো টের পাননি, কারণ শুরু থেকেই মেয়েরা এই অভিনয়টুকু খুব ভালো করে জানে।
গ্রামে অসচেতনতার জন্য অসংখ্য নারী সারভিক্যাল ইনফেকশন (মেডিকেলের ভাষায় সার্ভিসাইটিস) এ ভুগেন। একবার কাপড় ব্যবহার করে একটি গ্রামের মেয়ে মারা গিয়েছিল। কারণ জংলা জায়গায় শুকাতে দেয়া পিরিয়ডের কাপড়ে সাপের বাচ্চা ঢুকে ছিল। খেয়াল না করে সেই কাপড়ই সে ব্যবহার করেছিল, ফলে তার জরায়ুতে সাপের বাচ্চা ঢুকে মেয়েটি মারা যায়। ঘটনাটি কত বছর প্রথম আলোতে এসেছিল। বানানো ঘটনা নয়। গ্রামে অহরহ এভাবে জোঁক ঢোকার কথা শোনা যায়। একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো!
এগুলো না হয় আনইউজুয়াল কেস। কিন্তু সারভিক্যাল ইনফেকশন বা সার্ভিসাইটিস খুব কমন একটা কেস। সেটি আমাদের দেশের অনেক অনেক মেয়েদের মৃত্যুর মুখেও ঠেলে দিচ্ছে।
কাজেই ভ্রাতাগণ, আপনারা আপনাদের অপজিট জেন্ডারের প্রতি আরও বেশি কেয়ারিং হোন ও পিরিয়ড মেনোপজ নিয়ে কথা বলে ট্যাবু ভাঙান, কারণ এটি ট্যাবুর কিছু না এবং তারা আপনাদের লাইফের অর্ধেক। আর এই লেখা পড়ে আল্লাহর ওয়াস্তে কেউ ভেবে নিয়েন না মেয়ে মানুষরা প্রকৃতিজনিত কারণে শারীরিকভাবে দুর্বল। আপনার আমার সকলের জন্ম উনাদের এই শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপের মাধ্যমেই হয়েছে। With great power comes great responsibility (in this particular  case I’d like to use the term “pain “rather than “responsibility”)
আর আজকে আমরা বুদ্ধিমান প্রাণী সব প্রাণীকূল থেকে সেটা শারীরিক শক্তির বলে না, মানসিকতা ও বুদ্ধির বলে। শারীরিক শক্তির কথা ভাবলে একজন পুরুষ মানুষের চে উপরে থাকবে একজন মেয়ে শিম্পাঞ্জি। শিম্পাঞ্জিরা মানুষের চে মারাত্মক রকম শক্তিশালী ও ক্ষিপ্র এবং নেহায়েত ডোয়াইন জনসন দ্যা রক বা রেসলার জন সিনা টাইপ মানুষ না হলে কয়েক সেকেন্ডের মাথায় একজন মেয়ে শিম্পাঞ্জি একটা ছেলের চোয়াল ভেঙে দিতে সক্ষম!
আমরা মানুষ, শিম্পাঞ্জি না। আমাদের উন্মেষ হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক এভলুশন দ্বারা, তার আগে মানুষ শিম্পাঞ্জির মাঝে খুব একটা তফাত ছিল না। কাজেই একবিংশ শতাব্দীতে এসে দয়া করে শিম্পাঞ্জির মত চিন্তা কইরেন না। এটি সভ্য সমাজে মানায় না।
কথা বলুন। আওয়াজ তুলুন। নিজের মা, বোন, বন্ধুদের পাশে দাঁড়ান।
লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 57
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    57
    Shares

লেখাটি ২৪০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.