নাক আমার, যন্ত্রণা-ভালবাসাও আমার

শিপা সুলতানা:

অনেকবারই শুনেছি আমার চোখ সুন্দর, হাসির শব্দ সুন্দর, ভ্রু সুন্দর, ঠোঁট খুব সুন্দর, কিন্তু কখনোই শুনি নাই ‘তোমার মুখখানা খুব সুন্দর। কোটি কোটি মানুষ আছে পৃথিবীতে এই কথা শুনে নাই কোনোদিন, সুতরাং আমার বেদনাও নাই এই নিয়া। তবে আগ্রহ আছে, একজনের মুখের সবই সুন্দর, কিন্তু নাক সুন্দর না। সুতরাং তার কিছুই সুন্দর না।

আমার আম্মা এতো সুন্দরী ছিলেন বিয়ের সময় যে আমার ফুফু বলতেন, পাশের দুই-তিন গ্রাম থেকে নারীরা আসতেন তাকে দেখতে। তার চুল দেখতে। বাড়িতে বেশকিছুদিন মেহমান লেগেই ছিলো তার জন্য। সেই আম্মাকে কেউ আঘাত করতে চাইলে সরাসরি বলতো ‘ ওমা, তোমার মেয়ে দেখি একদম মনিপুরী?’
আমাদের আত্মীয়দের তখন সিলেট শহর পর্যন্ত দৌড়। অথবা সিলেট টু লন্ডন/আমেরিকা। তাই আদিবাসী মানেই নাক চাপা, আর চাপা নাকের মানুষ বলতেই সিলেট শহরের মনিপুরী সম্প্রদায়। মনিপুরীদের ঘিয়ের মতো গাঁয়ের বরণ, গোছানো শারীরিক স্ট্রাকচার, ফিনফিনে চায়নিজ রেশমের মতো চুল, ডিমের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা পরিস্কার ত্বক, এসব কিছুই তাদের নজরে পড়তো না। পড়তো তাদের চাপা নাক।

আমার আম্মারও হয়তো কষ্ট হতো ভেতরে ভেতরে, কিন্তু ‘ইংলিশ পুরি’র মতো আমার ছোট বোনের জন্ম হলে মা’কে আর কেউ বিট করতে পারে নাই কোনোদিন। যেখানেই যান, আমার ছোটবোন তার সাথে যেনো মুক্তোর মালায় কোহিনুর হীরা। আমিও বাঁচলাম। শুচিবাই আক্রান্ত আম্মাকে এড়িয়ে তখন আমি বনে-বাদাড়ে, ভূত খুঁজতে, দুধ ফুলের চারা তুলতে, ধর্মান্তরিত হবার প্ল্যান বানাতে, ছেলেদের সাথে ফাইট দিতে, আল্লা বড় না তালগাছ বড় বিতর্কে মন্দিরের পুরোহিতকে সাক্ষী বানাতে ব্যস্ত। ঠাকুর বাড়ির প্রতিটা ইট-পাথর সাক্ষী দিতে পারতো সেইসব কথা, আফসোস, মডার্ন স্হাপনার নতুন টাইলস সেইসব কথা জানে না।

বলতে গেলে পুরো জীবনই যাবে নাক নিয়ে কথা শুনে। আমি ভেবেই পেলাম না যেখানে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক মানুষের নাক চাপা অথবা বোঁচা, সেখানে নাকের প্রশ্ন আসে কী করে! আমাদের এক বন্ধু ছিলো, ধরেন হেমা নাম, সে মাঝে মাঝেই উদাস হয়ে বলতো, সে লন্ডন আসতে পারলে তার বুক ছোট করবে আর আমি যেনো আমার নাক ছোট করি। সেই লন্ডনে এসে নাকের সমঝদার পেলাম। যিনি প্রেমে পড়লেন, নাক নিয়ে আহ্লাদের শেষ নাই আর। বিয়ের আগেই আমিন (সরকার আমিন) ভাইকে ফোন করে বলতে লাগলেন, ‘আমিন ভাই, ঘটনা ঘটাইয়া ফেলছি, চাইনিজ কন্যা পটাইয়া ফেলছি তো!’

সেই লন্ডনেই জনে জনে ঠাট্টাচ্ছলে বলতে লাগলেন, ‘ওমা বউ দেখি জাপানিজ/চায়নিজ? যেনো চীন, জাপানের মানুষ ঠিক মানুষ না অথবা হাফ মানুষ অথবা মাতৃগর্ভে নয়, গরুর পিছন দিয়ে জন্ম হয়েছে তাদের।

বিয়ের পর সংসার পাতবো, একা একটি ঘর ব্যয়বহুল, আমার জা কথা বললেন নেইবারের সাথে। তাদের মায়ের একটি তিন বেডরুমের ঘর আছে। বৃদ্ধা ৫/৬ দিনে একবার ঘরে আসেন। পরিচিত বাঙ্গালীর ঘরে ঘরে ঘুরে ঘুরে দিন চলে যায় তার। তবে একটা সমস্যা আছে, মহিলার সাথে থাকা অসম্ভব।

আমরা দুজন হাসাহাসি করি। আমাদের সাথে থাকতে না পারলে আর কার সাথে থাকতে পারবেন মহিলা! প্রথম প্রথম মহিলার ছায়াই দেখতে পেতাম না। আমরা এতো আদর করতে লাগলাম যে মহিলা আর ঘরের বাইরে যান না। কয়েকদিনের ভেতর আদরের ফল ফলতে লাগলো। মহিলা আমার সামনেই বলতে লাগলেন, আমার বাবার বাড়ি নাকি চীন, আর ইরম যে এতো আহ্লাদ করে বউকে, পরে তো পস্তাতে হবে। বান্দর আর বউকে মাথায় তুলতে নাই।

মহিলার ঘরে যেই আসতো সব আমাদের ভালোবাসার নিন্দা। জামাইরা না হয় বেহায়া টাইপ হয়, মেয়েরা কেনো এতো ঢলাঢলি করবে! আর নাক বোঁচা বউকে এতো আহ্লাদ কেনো বাপু! বিরক্তি এমন পর্যায়ে গেলো যে পেটে আমার চার মাসের বেবি, এসময় পাঁচ বেডরুমের একটি ঘর ভাড়া নিলো ইরম।

আবার আসি আহ্লাদের কথায়, নাক নিয়ে যত ধরনের আহ্লাদ একজন করেই যাচ্ছেন, পেটের তিনি যাই হোন, নাক যেনো আমার মতো হয়। বললাম, কেনো?
তাহলে তোমার মতো ভাল হবে, মায়াবী হবে…

ওটিতে আছি, একজন ডাক্তার টাওয়েল মুড়িয়ে অন্যকে বুকের উপর এনে রাখলো, আমার তাকাতেও ইচ্ছা করছে না এমন ঘুম পাচ্ছে। সেই অবস্থায় দেখি আরেকজন ডাক্তার বেবির নাক আর আমার নাক ইশারায় দেখাচ্ছে ইরমকে। ইরম বললো, ‘এটা আমাদের ট্রেডমার্ক, কপিরাইট আছে’। বড় হতে হতে অন্য’র নাক কিছুটা খাড়া হয়ে গেলো। ইনকার নাক এমনিতেই খাড়া। ঋষির যখন জন্ম হলো, আবার ইরম বললো ‘দেখছো, তুমি তো জন্মের সাথে সাথে বাচ্চাদের কপিরাইট পেয়ে যাচ্ছো?’

নাক চাপা মানুষের প্রতি আমার আপনবোধ হলো সেদিন, যেদিন আমার বাবা বললেন, ‘এই যে যাদের গড়ন চাপা, পাহাড়ে থাকে, বন জঙ্গলে বাঁচে, গুটি কয়েক মঙ্গোলিয়ান বংশোদভূত, বাকিরা সবাই এদেশের আদি মানুষ, বাদবাকি আমরা জুলুমবাজ, লুটেরা, এবং ধর্ম এবং বানিজ্যের উদ্দ্যেশে আসা অন্য দেশের মানুষ’।
আহা আমার নাক, সেদিনই সে ধন্য হলো। যখনই কেউ বলে আমি মনিপুরী বা চীনাদের মতো, আমার বোঁচা নাকে ঘাম জমতে থাকে, বলি যে, আয় ভাই গালে লাগ যা…

সদ্য সদ্য এক বান্ধবী কোনোভাবেই ক্ষেপাতে (যদি জানতো আমি কীসে ক্ষেপি, দিনের পর দিন এতো কুটচাল চালতে হতো না সোনার) না পেরে বললো, তার শাশুড়ি বলছেন, আমার চেহারা মনিপুরীদের মতো! বললাম ‘মতো মানে কী? আমি তো মনিপুরীই! মনিপুরী রাজকুমারীই (স্যরি মনিপুরী রাজা), রাজকুমারী না হলে এমন অহংকার থাকতো এই নাক নিয়ে?’

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.