বীরাঙ্গনা, আমরা তোমাদের প্রণতি করি

0

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী:

নীলিমা ইব্রাহীমের “আমি বীরাঙ্গনা বলছি” বইটি যতবার পড়েছি, আমি কিছু সময়ের জন্য সবার মাঝে থেকেও একাকি হয়ে পড়েছি। নিয়মের কাজ ভুলেছি, বাড়ির কারো সাথে ঠিকভাবে কথা বলতে পারিনি। আর একই দিনে একজনের বেশি বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা মায়ের আর্তনাদ আমি পড়তে পারিনি, মানসিকভাবে নিতে পারিনি সে কষ্টের ভার। তাই বিরতি নিয়ে পড়তে হয়েছে।

এই বীরাঙ্গনাদের বেশিরভাগই তো রয়ে গেছেন লোকচক্ষুর আড়ালে। অনেকেই অভিমানে দেশ ছেড়েছিলেন। আবার দেশে থেকেও বেছে নিতে হয়েছে স্বেচ্ছা নির্বাসন। ইতোমধ্যে হয়তো অনেকেই ধনধান্য পুষ্প ভরা এ বসুন্ধরার মায়া ত্যাগ করেছেন জমানো অভিমান বুকে নিয়ে।

স্বাধীনতার সাতচল্লিশ বছর পর স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে অথবা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের মানচিত্রে কেমন আছেন, কেমন জীবন কাটিয়ে গেলেন আমাদের বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা বীরমাতারা?

শুধু এবছরের কথাই যদি বলি –
গত ৬ মার্চ, ২০১৮ চলে গেলেন অনন্য সাহসী মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী।

২১শে মার্চ, ২০১৮ আমরা হারালাম বীর প্রতীক শতবর্ষী কাঁকন বিবিকে।

জীবন সায়াহ্নে হাসপাতালে কঠিন সময় পার করছেন মুক্তিযোদ্ধা, বীরমাতা রমা চৌধুরী।

১৯৭১ সালে খুলনা ক্রিসেন্ট জুট মিলে কর্মরত অবস্থায় পাকিস্তানী সেনা অফিসারদের হাতে জিম্মি হতে হয় ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকে। এরপর তার ওপরে চলে পৈশাচিক নির্যাতন, গণধর্ষণ। টানা আটাশ ঘণ্টা সংজ্ঞাহীন ছিলেন তিনি। খুনের আসামী বানিয়ে মিথ্যে মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টাও করা হয় এক পর্যায়ে।

দেশ স্বাধীন হলেও সামাজিকভাবে নিগ্রহের শিকার হোন প্রতিপদে। শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিকভাবে অমানুষিক ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাওয়া এই বীরাঙ্গনাদের অনেককে পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠালেও সবার সে সু্যোগ ঘটেনি।

প্রিয়ভাষিণীর মতো অসংখ্য বীরাঙ্গনাকে নিজের পুনর্বাসন করতে হয়েছে নিজেকেই। স্বাধীন দেশে যুদ্ধাহত, কংকালসার, মৃতপ্রায় মেয়েগুলোর জীবনে নেমে এসেছিলো অন্য এক যুদ্ধ। বহু পরিবার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো, বীরাঙ্গনা মেয়েদের তারা বাড়ির চৌকাঠে পা রাখতে দেয়নি।

প্রকৃত অর্থে, তাঁরা সবাই কী পেরেছিলেন ঘুরে দাঁড়াতে? নিজেকে ভালোবাসতে? নিজেকে সম্মান করতে?

পরিবার পরিজন যাঁদেরকে পর করে দিয়েছিলো, সেই বীরাঙ্গনাদের আশ্রয় মিলেছিলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর মহান পিতৃহৃদয়ে। তিনি তাঁদের কন্যারূপে আপন করে নিয়েছিলেন, পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।
বীরাঙ্গনারা কোনোদিন এ মহান পিতাকে ভুলে যাননি। চিরশ্রদ্ধায় স্মরণ করেছেন তাঁকে।

মুক্তিযুদ্ধ আমি দেখিনি। কিন্তু বীরাঙ্গনা মায়ের সন্তান হিসেবে আমার সৌভাগ্য হয়েছে একজন প্রিয়ভাষিণীর নিজেকে নিজে পুনর্বাসিত করার যুদ্ধটা কাছ থেকে দেখার। পরিবার এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট যখন বীরাঙ্গনাদের প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করলো, প্রিয়ভাষিণী তখন প্রকৃতির মরা গাছ, ফেলে দেয়া শুকনো ডালপালার মাঝে খুঁজে পেলেন নিজেকে।
মানুষের কাছে অবহেলা পেলেও প্রকৃতি তাঁকে ভালোবেসে গ্রহণ করেছে বুক পেতে। নিসর্গের সাথে যেন তাঁর চিরসখ্যতা। একে অন্যের সংস্পর্শে, সাহচর্যে, সখ্যতায় সৃষ্টি হতে থাকে একের পর এক নান্দনিক ভাস্কর্য। তাঁর মুক্তি ছড়িয়ে যেতে থাকে আলোয় আলোয়, এই আকাশে। ধুলায় ধুলায়, ঘাসে ঘাসে।

নিগৃহীত হতে হতে, নিজেকে আড়াল করতে করতে একসময় তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন যে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর জীবনে যে বিভীষিকা নেমে এসেছিলো, এজন্য তিনি কোনোভাবেই দায়ী নন। কোনো বীরাঙ্গনাই দায়ী নন। ধর্ষণের শিকার হলে একজন নারীর কিছুতেই সম্ভ্রমহানি হয় না। তাঁর কোনো লজ্জা বা অপরাধবোধ হওয়ার কিছু থাকতে পারে না। তাই সমাজের রক্তচক্ষু আর লোকলজ্জার মিথ্যে পর্দা সরিয়ে স্বাধীনতার ছাব্বিশ বছর পর গর্বিত চিত্তে নিজের বীরাঙ্গনা পরিচয় তিনি জনসম্মুখে তুলে ধরেন। বুকে জমে থাকা একাত্তর যেন বরফ গলা এক নদীর মতো বইতে থাকে তাঁর জবানবন্দিতে। উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকার আলবদর, শান্তি কমিটির সদস্যদের নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা, যা হাজার বছর পরেও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অকাট্য দলিল হিসেবে সাক্ষ্য দিয়ে যাবে।

প্রিয়ভাষিণী আমৃত্যু স্বাধীনতার স্বপক্ষে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে, বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতিদানের দাবিতে, মানবতা প্রতিষ্ঠায়, নারী-পুরুষের সমতায়, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করে গেছেন। জীবদ্দশায় একটি স্থায়ী ঠিকানা তাঁর হয়নি।
আমি গর্বিত, মৃত্যুর পর তাঁর সেই ঠিকানা মিলেছে সর্বজনশ্রদ্ধেয় “আম্মা” শহীদ জননী জাহানারা ইমামের সমাধির পাশে।

বীরপ্রতীক কাঁকনবিবি।
আদিবাসী (খাসিয়া) এই মুক্তিযোদ্ধার আসল নাম কাঁকাত হেনিনচিতা। মানুষ তাঁকে একাত্তরের “মুক্তিবেটি” বলেও চেনে। কোলের সন্তান রেখে ১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন ৫ নং সেক্টর থেকে। কমান্ডার মীর শওকত তাঁকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। শত্রু ক্যাম্পের খবরাখবর নিয়ে আসা ছিল তাঁর কাজ। পাঁচবার সফল হলেও পরে ধরা পড়ে যান পাক সেনাবাহিনীর হাতে। বর্বর নির্যাতনের শিকার হোন। অদম্য সাহসী মানুষটি থেমে থাকেননি তবু। তিনটি সম্মুখযুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই করেন। গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্রিজকে উড়িয়ে দেবার জন্য কাঁকন বিবি কলার ভেলায় করে ডিনামাইট নিয়ে ব্রিজের কাছে যান এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে ব্রিজটি উড়িয়ে দিতে সক্ষম হোন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের গুপ্তচর হিসেবে খবর আদানপ্রদান করেছিলেন সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলে।

লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা কাঁকনবিবিকে খুঁজে পেয়ে সংবাদপত্রে খবর ছাপা হলে ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন এবং এই “মুক্তিবেটি”কে বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত করেন। যদিও শেষ পর্যন্ত তা গেজেটে প্রকাশ পায়নি।
জীবনের শেষদিন পর্যন্ত পাক বাহিনীর বর্বরতার চিহ্ন শরীরে বহন করে গেছেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।

মুক্তিযুদ্ধের বীরমাতা রমা চৌধুরী।

চট্টগ্রামের এই মহীয়সী কন্যাকে বলা হয় দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম স্নাতকোত্তর (এমএ) নারী। তিনি ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। দীর্ঘ ষোলো বছর তিনি বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। কক্সবাজার বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন রমা চৌধুরী।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি তিন পুত্রসন্তানের জননী। সন্তানদের নিয়ে পৈতৃক ভিটা পোপাদিয়ায় থাকতেন। তার স্বামী ভারতে চলে যান। ১৩ মে সকালবেলা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাঁকে নিজের ঘর থেকে জোর করে নিয়ে যায় পাশের নির্জন ঘরে। সেখানেই তাঁর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে নরপিশাচগুলো। আত্মহত্যা থেকে সরে আসেন সন্তানের মুখ চেয়ে। কোনোরকমে পালিয়ে পুকুরে নেমে আত্মরক্ষার জন্য লুকিয়েছিলেন। পাকবাহিনী জ্বালিয়ে দেয় তাঁর ভিটেমাটি, সহায়-সম্পদ। গৃহহীন বাকি আটটি মাস তাঁকে তিনটি শিশুসন্তান আর বৃদ্ধ মাকে নিয়ে বন-জঙ্গলে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। দেশ স্বাধীনের মুহূর্তে এসে তিনি দুই সন্তানকে হারান, ওরা মারা যায় অসুস্থ হয়ে ভুল ওষুধ খেয়ে।

স্বাধীনতার বিশ বছর পর লেখালেখিকে পেশা হিসেবে বেছে নেন রমা চৌধুরী।
পরবর্তীতে রোদে পুড়ে, খালি পায়ে নিজের লেখা বই ফেরি করে বেড়াতেন। এ মাটিতে তাঁর সন্তানদের সমাধি, তাই পায়ে জুতো পরতেন না তিনি।

একাত্তরের জননী রমা চৌধুরী এখন জীবন সায়াহ্নে। চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন পঁচাত্তর বছর বয়সী আলোর পথযাত্রী। চট্টগ্রাম শহরে একটি বাড়িভাড়া করার মতো অবস্থা নেই, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর বীরাঙ্গনা পরিচয় জেনে বাড়িওয়ালারা বাড়িভাড়া দিতে চায় না।

খবরটা পড়ে আমি ব্যথিত হলেও অবাক হইনি। অসুস্থ প্রিয়ভাষিণীকে নিয়ে এমন অনেক অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়েই আমাদেরকে যেতে হয়েছে। বেশিরভাগ বাড়িওয়ালা বীরাঙ্গনা, মুক্তিযোদ্ধা, শিল্পী, অসাম্প্রদায়িক কারো নাম শুনে বাড়িভাড়া দেন না এই স্বাধীন বাংলাদেশে!

বিদায় নিয়েছেন প্রিয়ভাষিণী, কাঁকন বিবি। রমা চৌধুরী লড়াই করছেন। প্রিয়ভাষিণী তাঁর শিল্পকর্মকে জীবিকা হিসেবে নিয়েছিলেন। রমা চৌধুরী চেয়েছিলেন তাঁর লেখা বই মানুষ কিনুক। তিনি কখনও হাত পেতে দান নেননি। কাঁকন বিবিও নিভৃতে চলে গেছেন।

এই মানুষগুলো মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন। তাঁদের জীবন- মৃত্যুর লড়াইয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁদের জন্য সহযোগিতা চাওয়া কতোটা বিব্রতকর তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। রাষ্ট্র কী তা আদৌ অনুধাবন করতে পারে?

এঁরা সাধারণ নন, সাধারণ ছিলেন না। এঁরা আমাদের আলোকবর্তিকা। আমাদের বাতিঘর।
আজো যখন লেখা দেখি – ‘মুক্তিযুদ্ধে সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন আমাদের বীর মায়েরা! ‘
আমি শতবার লজ্জিত হই। কারণ এতোদিনে আমার এই বোধটুকু জাগ্রত হয়েছে যে, আমাদের মায়েরা সম্ভ্রম হারাননি, বরং তাঁদের জন্য সম্ভ্রম পেয়েছে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটির মানচিত্র।

একজন বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে আমি জানি, অসীম সাহসী বীরাঙ্গনারা দেশনেত্রী, বঙ্গবন্ধুকন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কতোটা আস্থাশীল। জীবনের অন্তিম লগ্নে পৌঁছেও তাঁরা কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেন না মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি। হয়তো পথ চেয়ে থাকেন তাঁর মমতাময়ী স্পর্শের আশায়।
তাই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রোবট সোফিয়ার পাশে কিংবা দেশসেরা ক্রিকেটারের শিশুকন্যার সাথে সময় কাটাতে দেখলে যতোটা উচ্ছ্বসিত হই, তার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দিত হবো যেদিন একাত্তরের এই জননীদের বিদায়বেলায় তাঁদের শিয়রে প্রিয় বঙ্গবন্ধুকন্যাকে দেখবো।

“একটা জিনিস, একটি মুহূর্তের আকাঙ্ক্ষা মৃত্যু পর্যন্ত রয়ে যাবে। এ প্রজন্মের একটি তরুণ অথবা তরুণী এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলবে, বীরাঙ্গনা, আমরা তোমাকে প্রণতি করি, হাজার সালাম তোমাকে। তুমি বীর মুক্তিযোদ্ধা, ঐ পতাকায় তোমার অংশ আছে। জাতীয় সংগীতে তোমার কণ্ঠ আছে। এদেশের মাটিতে তোমার অগ্রাধিকার। সেই শুভ মুহূর্তের আশায় বিবেকের জাগরণ মুহূর্তে পথ চেয়ে আমি বেঁচে রইবো।”

(নীলিমা ইব্রাহীমের “আমি বীরাঙ্গনা বলছি” থেকে একজন বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার জীবনের শেষ চাওয়া)

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 344
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    344
    Shares

লেখাটি ৭৭১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.