‘নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস’এলেই কতগুলো চেহারা ভেসে উঠে

0

ডা.ফাহমিদা শিরীন নীলা:

অ্যাডমিশন ডে, এন্টিন্যাটাল ওয়ার্ডে পা ফেলার জায়গা নেই, অনেকগুলো যন্ত্রণাকাতর মায়ের মধ্যে একজনকে দেখলাম গোগ্রাসে ভাত খাচ্ছে। খাচ্ছে বললে ভুল হবে বোধ হয়, রীতিমতো বড় বড় লোকমা মুখে পুরছে আর গিলছে। ভাত গেলার ফাঁকে ফাঁকে তার চোখ দুটো গোল গোল হয়ে যাচ্ছে, বুঝতে পারলাম তার ব্যথা তীব্র। কিছুক্ষণ পরেই সে তার সন্তান প্রসবের সাথে সাথে লেবার টেবিলেই মারা গেল।
জানলাম, তার হার্টের প্রবলেম ছিল, তথাপি সে কোন ডাক্তারের পরামর্শ তো দূরে থাকুক, লেবার পেইন নিয়ে ভর্তি হবার পরেও ডাক্তারকে জানানোর প্রয়োজন অনুভব করেনি। আমি এখনো স্পষ্ট তার ভাত খাওয়ার দৃশ্যটি দেখতে পাই…।

সন্ধ্যাবেলা ওয়ার্ডে রাউন্ড শেষ করে রোগীকে ওটিতে নিয়ে যাবো বলে দাঁড়িয়ে আছি। এইমাত্র ডেলিভারি হওয়া মাকে আয়ারা বেডে নামিয়ে রাখছে। আমি দূর থেকে দেখছি। মহিলা কিছুক্ষণ পূর্বেই মৃত বাচ্চা প্রসব করেছে। বেডে নামানোর সাথে সাথেই মহিলা একটা ঝাঁকুনি দিল। দৌড়ে গিয়ে আমরা সাত-আটজন প্রাণপন চেষ্টা করেও তাকে ফিরিয়ে আনতে পারলাম না। তার সেই শেষ ঝাঁকুনির দৃশ্য আজও চোখে ভাসে…।

মেয়েটা লেবারের ফার্স্ট স্টেজে ছিল। ডেলিভারি দেরি আছে দেখে অন্য কাজে আমরা ব্যস্ত ছিলাম। সঠিক সময়ের পূর্বেই শাশুড়ী ‘চাপ দাও’,’শূল দাও’ করে নিজেরাই ডেলিভারি করিয়ে ফেলে, যখন রক্তক্ষরণ দেখে আমাদের খবর দিল, গিয়ে দেখলাম প্রায় এক বালতি রক্ত চলে গেছে। খুব দ্রুতই জরায়ুর মুখটা রিপেয়ার করেছিলাম। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে শকে চলে গিয়েছিল বলে হাতে পায়ে দুটো চ্যানেল ওপেন করে রানিং ফ্লুইড দেয়ার পরেও রক্ত আনতে আনতে মেয়েটি চলে গেল না ফেরার দেশে।
মৃত্যুশয্যায় তার পাশে তার জন্য দু’ফোঁটা চোখের পানি ফেলার কেউ ছিল না। সে ছিল এতিম। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা সবাই বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আমি মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি আটকিয়ে রাখতে পারছিলাম না বলে দ্রুত সরে এলাম। মেয়েটির অভিমানি চেহারা আজও ভুলতে পারিনি।

কিছুতেই ভুলতে পারি না এমন অনেক নিষ্পাপ মায়ের চেহারা। আঠারো বছরের মেয়েটির খিঁচুনি হতে হতে বাচ্চা পেটে নিয়েই মারা যাওয়ার দৃশ্যটি অসহায়ভাবে দেখার স্মৃতিটা কী করে ভুলে যাই? চল্লিশ বছরের যে মহিলাটি পঞ্চম সন্তান প্রসবের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের জন্য শক নিয়ে ভর্তি হয়েছিল, শত চেষ্টার পরেও তার মারা যাওয়ার দৃশ্যটি কীভাবে ভুলে যাই?

এমন অনেক মায়ের জীবন আজও বাঁচাতে পারি না বলেই নিরাপদ মাতৃত্ব দিবসে যখন কোম্পানির লোকেরা উপহার দিতে আসে, আমার খুব লজ্জা লাগে। মা হয়েও সকল মাকে সন্তান সুখ দিতে পারি না বলে, ডাক্তার হিসেবে সকল মাকে নিরাপদ মাতৃত্ব দিতে পারি না বলে, এ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়েও সমাজের সকলকে মাতৃত্বের সঠিক হিসাবটা বোঝাতে পারিনি বলে আমার কষ্ট হয়। যেদিন সমাজের প্রতিটি স্তর মাতৃত্বের গুরুত্ব সঠিকভাবে জানবে, বুঝবে, সেদিনই আমাদের দেশে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত হবে।

‘কমাতে হলে মাতৃ মৃত্যুহার, মিডওয়াইফ পাশে থাকা একান্ত দরকার।’

ডা.ফাহমিদা শিরীন নীলা
এমবিবিএস, এফসিপিএস(অবস এন্ড গাইনী)
ফিগো ফেলো (ইটালী)
গাইনী বিশেষজ্ঞ,

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 77
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    77
    Shares

লেখাটি ২৭৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.