একজন সঞ্চিতা ও পরকীয়ার জের

0

ইসাবেল রোজ:

আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন এরকম নারীর সাথে আমার অনেকবারই পরিচয় হয়েছে। শুধু পরিচয় নয়, কথা হয়েছে। তাদের সুখ-দু:খের গল্প শুনেছি। যতদূর সম্ভব তাদের ঘুরে দাঁড়াবার জন্য সাহায্য করেছি। তারাও ঘুরে দাঁড়াতে চেয়েছে।

এবারের গল্পটা একটু ভিন্ন। আমার খুব পছন্দের একটি মেয়ে এবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল বেশ কয়েকবার। কিন্তু
সাহসে কুলায়নি বলে আজও বেঁচে আছে এবং আমার সাথে যোগাযোগ করেছে। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো মেয়েটি এই কথাগুলো বলার মতো কাউকেই খুঁজে পায়নি। এতো বড় পৃথিবীতে এই মেয়েটির কথা শোনার মতো কেউ নেই।

মেয়েটির নাম ধরে নেই সঞ্চিতা। সময়টা ২০১৩/১৪। সঞ্চিতা ব্যাংকে চাকরি করে। ওর স্বামী একটি এনজিওতে কর্মরত। একটি তিন বছরের মেয়ে আছে ওদের। সঞ্চিতার স্বামীর সাথে তেমন কোনো মিল ছিল না, আবার খুব ঝগড়াও হতো না। দুজন দুজনের মতো করে থাকতো। সঞ্চিতার সাথে ব্যাংকে পরিচয় হয় মারুফ ভাইয়ের। মারুফ ভাই দীর্ঘদিন
ব্রিটেনে ছিলেন। এখন দেশে এসে বিভিন্ন ব্যবসা বাণিজ্য করে দেশেই স্থায়ী হয়েছেন। তার স্ত্রী এবং দুটি সন্তান আছেন। তার স্ত্রী হাই সোসাইটি মেইন্টেইনকারী একজন নারী। সমাজের উচ্চপদস্থ প্রভাবশালীদের সাথে তার উঠাবসা। ধরে নেই তার নাম সুমনা। সুমনা-মারুফ জুটি শুধু লোকদেখানো স্বামী-স্ত্রী। তাদের মধ্যে টাকা-পয়সা লেনদেন ব্যতীত আর কোনো সম্পর্ক নেই।

ফিরে আসি সঞ্চিতা প্রসংগে। মারুফের সাথে সঞ্চিতার টুকটাক কথাবার্তা হয় ব্যাংকে। ক্রমশ ফোন নাম্বার আদান প্রদান হয়। মারুফ প্রায়ই সঞ্চিতাকে কল দেন। সঞ্চিতাও কথা বলে। এক প্রকার ভালো লাগা জন্ম নেয় দুজন দুজনের প্রতি।
এভাবেই চলতে থাকে। কখনও তারা দুপুরে লাঞ্চ করতে যায়। কখনও বেড়াতে। এদিকে সুমনার সন্দেহ হয় মারুফের নিশ্চয়ই কোনো এফেয়ার আছে। সে সঞ্চিতার ব্যাপারটি জেনে যায়।

ঢাকা খুব ছোট শহর। এসব খবর চাপা থাকে না। সুমনা মারুফের ফোন থেকে সঞ্চিতার নাম্বার বের করে এবং সঞ্চিতাকে গভীর রাতে ফোন দিয়ে অকথ্য ভাষায় গালাগালি শুরু করে। এতে সঞ্চিতার স্বামী সন্দিহান হয়ে পড়ে। কেন একজন অপরিচিত মহিলা গভীর রাতে এতোবার করে কল করছে, এবং গালি দিচ্ছে? প্রশ্ন জাগে তার মনে। সঞ্চিতার স্বামী জোর করেই ফোনটা কানে নেয়। তখন সে যা জানতে পারে, তাতে তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। সে এটা মেনে নিতে পারে না তার স্ত্রী অন্য কারও সাথে সম্পর্ক করতে পারে। সঞ্চিতা তখন নিজের দোষ স্বীকার করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। মেয়েটিকে রেখে যায় তার শাশুড়ির কাছে।

এইভাবে শুরু হয় সঞ্চিতার জীবনের পরবর্তি অধ্যায়। সঞ্চিতা একটি বাসা ভাড়া নেয়। ব্যাংকের চাকরি অব্যাহত থাকে। মারুফ ভাইও যোগাযোগ অব্যাহত রাখে। যেহেতু তার স্ত্রীর কারণে সঞ্চিতার সংসার ভেংগে যায়, তাই সে নিজেকে গিল্টি ফিল করে। তার অসাবধানতার কারণে সুমনা ফোন নাম্বারটা জোগাড় করেছে, এই ভেবে তার মধ্যে একটা দায়িত্ববোধ জন্মায় সঞ্চিতাকে সাপোর্ট করার জন্য।

এভাবে একমাসও যেতে পারে না। একদিন মারুফ ভাই সঞ্চিতার বাসা থেকে বের হবার সময় ডিবি পুলিশ দ্বারা গ্রেফতার হয়। তাদের বিরুদ্ধে চার্জ আনা হয় তারা আন্তর্জাতিক নারী পাচারের সাথে জড়িত বলে। ২০১৪ সালে ১৪ই ফেব্রুয়ারিতে মারুফ এবং সঞ্চিতা দুজনেই থানা হাজতে বন্দী অবস্থায় কাটায়। মারুফ ভাই তার বন্ধুদের মারফত খবর পায় সুমনা যেহেতু উচ্চপদস্থ লোকদের সাথে উঠাবসা করে, ওর একজন বন্ধু যিনি গুলবাহার (কল্পিত) থানার ডিসি ছিলেন তাকে দিয়ে এই কাজ করানো হয়েছে সঞ্চিতা আর মারুফকে উপযুক্ত শাস্তি দেয়ার জন্য।

মারুফ ভাই যেহেতু ব্যবসায়ী মানুষ, তিনিও প্রভাবশালী বন্ধুদের সহায়তায় সঞ্চিতাকে নিয়ে মুক্ত হোন এবং এক বছরের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করতে সমর্থ হোন। এদিকে সঞ্চিতার বাবা-মা যখন জানতে পারেন সঞ্চিতার পরকীয়া এবং গ্রেফতার হওয়ার কাহিনী, সাথে সাথে ওর বাবা স্ট্রোক করেন। পরিবারের সবাই সঞ্চিতাকে ত্যাজ্য ঘোষণা করে। বাবা-মায়ের কাছে ওর ফিরে যাওয়া আর সম্ভব হয়ে উঠে না।

সুমনা তার পুলিশ বন্ধু দিয়ে সঞ্চিতার কললিস্ট থেকে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সকলের নাম্বার জোগাড় করে এবং সবাইকে ফোন করে জানিয়ে দেয়, সঞ্চিতা একজন ব্যাসায়ীর সাথে গ্রেফতার হয়েছে। এই খবর খুব দ্রুত রাষ্ট্র হয়ে যাওয়ায় সঞ্চিতা আর কাউকে মুখ দেখাতে পারে না। সাথে সাথে ব্যাংকের চাকরিও চলে যায়।

২০১৫ সালে ঠিক এই ঘটনাগুলো ঘটার পর আমার সাথে সঞ্চিতার পরিচয় হয়। আমি ওর এইটুকুন ৩০ বছরের জীবনে ঘটে যাওয়া কাহিনী শুনে থ হয়ে গিয়েছিলাম। আমার সবচেয়ে কষ্ট লাগতো ওর বাচ্চা মেয়েটির জন্য। ছোট্ট ফুটফুটে পরীর বয়স তখন ৬। যাই হোক সঞ্চিতা তখন ঢাকার একটু দূরে একটা বাসা নিয়ে একাই থাকতো। রাত হলেই আতংকে তার ঘুম আসতো না। কখন যেন পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যায়। সুমনা সামহাউ ওর নতুন ফোন নাম্বার বের করে ফেলে। শুধু তাই না সঞ্চিতাকে গ্যাং রেইপ করানোর ক্ষমতা আছে বলে হুমকি দেয়। সঞ্চিতার এবার দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়। সে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। অনেকগুলো ঘুমের অষুধ খেয়ে নেয়। কিন্তু বেঁচে ওঠে সময় মতো মারুফ ভাই উপস্থিত হওয়াতে।

একটি নারী যে কিনা একজন মা। এমনভাবে তার কৃতকর্মের জন্য শাস্তি পেতে থাকে যার কোনো শেষ নেই। যেহেতু মারুফ ভাইকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম, তার বদৌলতে সঞ্চিতার সাথে আমার পরিচয় হয়।
সঞ্চিতা ধীরে ধীরে আবার বাঁচার স্বপ্ন দেখে। আবারও সে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চায়।

বাংগালী মেয়েরা চায় সংসার করতে। তাদের চাওয়ার আর কিছু নেই। যতই তাকে আমি বুদ্ধি দেই, আর বিয়ে নয়, এবার নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সময়, ততই সে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। মারুফ ভাই এর পক্ষে তার সাথে থাকা সম্ভব না। তিনি যদিও এতো বড় ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর নিজ বাসা ছেড়ে অন্য জায়গায় থাকা শুরু করেছিলেন। কারণ সুমনার চেহারা তাকে আতংকিত করে তুলতো।

মারুফ ভাই থানা হাজত থেকে ছাড়া পেয়েই বাসায় গিয়ে দেখে তার কারামুক্তি উপলক্ষে সুমনা বাসায় মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে। মারুফ ভাইয়ের বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল একটাই। তার কিছু কাপড় প্রয়োজনীয় জিনিষ সংগ্রহ করা। কিন্তু বাসায় গিয়েই এই নাটক তাকে বাকরুদ্ধ করে দেয়। সুমনা মারুফ ভাইয়ের সামনে কোরান হাতে নিয়ে বলে তার গ্রেফতারের পেছনে সুমনার কোনো হাত ছিল না। মারুফ ভাই বিনা বাক্য ব্যয়ে ঘর ছেড়ে একটি গেস্ট হাউসে ওঠে।

চলবে……..

(প্রতিটি বাক্য সত্য, শুধু নাম এবং স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে)

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1K
    Shares

লেখাটি ৭,৪৫৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.