দেশে মেয়েরা কেন ভালো নেই!

0

সোমা দত্ত:

দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে আজকের এই লেখাটা লিখছি সম্প্রতি দুইটি অভিজ্ঞতা নিজের মনের ভিতর যে আলোড়ন তুলেছে, তার সমাধান কি আদৌ সম্ভব! জানি না, কেননা বর্তমানেও যেসব ঘটনা ঘটেই চলেছে তাতে আমি আশাবাদী হতে পারি না

কয়েকমাস হলো আমি মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত একটি অর্গানাইজেশনে শিক্ষানবিশ হিসেবে স্বেচ্ছাসেবা দিচ্ছি। সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন, কালেভদ্রে তিন-চার দিনও যেতে হয় (গত দুইমাসে দুটো ট্রেনিং ছিল বিধায়) আমার বাসা থেকে অফিসটার দূরত্ব খুব বেশি না। বাসে যেতে সব মিলিয়ে সতের থেকে আঠারো মিনিট লাগে। এক্ষেত্রে একটু বলি, আমি থাকি স্কারবোরো এলাকার ইস্ট ভাগের প্রায় শেষ অংশে। আর অফিসটি তার চাইতেও শেষ প্রান্তে এবং একটি সম্পূর্ণ আবাসিক এলাকায় অবস্থিত

বাসের সার্ভিস এখানে এক কথায় অদ্বিতীয়। দশ থেকে পনের মিনিটের ব্যবধানে একটির পর একটি বাস আসে। আগেই বলেছি অফিসটি একেবারেই নিরিবিলি একটি আবাসিক এলাকার ভিতর। আমার নির্দ্দিষ্ট স্টপেজ থেকে উঠার পর পুরো বাসে সব মিলিয়ে /১০ জন মানুষ থাকে (কখনো এর ব্যত্যয় ঘটে, এর চাইতেও কম বা একটু বেশি হয়) যাই হোক, আমার গন্ত্যবের স্টপেজ আসতে আসতে এই লোকসংখ্যা আমাকে নিয়ে / এসেও দাঁড়ায় কখনো। এর মাঝে অনেক স্টপেজেই লোকজন ওঠানামা করে

প্রথমদিকের একদিনের কথা বলছি, সেদিন আমি অফিসের উদ্দেশ্যে যখন বাসে উঠি, ভিড় কম বেশ ফাঁকাফাঁকা বাসের ভিতর দেখে খানিক স্বস্তি বোধই করছিলাম। কয়েক স্টপেজ পার হতেই খেয়াল করলাম বাসে ড্রাইভারসহ আমরা তিনজন। কেমন যেন একটু অস্বস্তি লাগছিল। দুই স্টপেজ পরে বাস থামতে দেখে মনে মনে একটু খুশি হচ্ছিলাম এই ভেবে যে একজন লোক বাড়বে বলে। হলোও তাই। যাচ্ছি আমরা, আর তিন স্টপেজ পরেই আমাকে নামতে হবে। এরই মধ্যে পর পর দুটো স্টপেজে আমাকে একা করে দিয়ে বাকি দুজন সহযাত্রী নির্বিকার চিত্তে বাস ছেড়ে চলে গেলেন!

আমার ঠিক কেমন লাগছিল, তা বোঝানো খুব কষ্টসাধ্য না যেমন, ঠিক তেমনি দুষ্কর না বুঝে নেয়াটা! দুটো স্টপেজ বাকি থাকতে বাসটা এক জায়গায় সিগন্যালের জন্য মিনিট চারেক অপেক্ষা করে তা আমি জানতাম। আর যেখানে বাসটি দাঁড়ায়, তার এক পাশে ধু ধু মাঠ, আর আরেকপাশে সারি সারি বাড়ির পিছন দিক। আগে আসা-যাওয়া করার দিনগুলোতে একটা পুরো বাসে একা এভাবে বসে থাকতে হয়নি দেখে হয়তো, আশেপাশের পরিবেশ নিয়ে এতোটা ভাবিনি। কিন্তু সেদিন পরিস্থিতির কারণেই হয়তো অমন অস্থিরতা কাজ করছিল। অপেক্ষা শেষে ড্রাইভার নিয়ম অনুযায়ী বাস চালিয়ে দিল। আমিও আমার কাংক্ষিত স্টপেজে নেমে বেশ হালকা বোধ করলাম

চার/পাঁচ মিনিটের বিরতি আর একা একটা বাসে থাকার সময়টুকুতে আমার ভিতরটা যে কেঁপে উঠেছিল তা কিন্তু একেবারেই বেমানান এই ভিনদেশের মাটিতে বসে। বুকের ঢিপঢিপ শব্দের আওয়াজ যে আমার কানে বাজছিল তা কোনভাবেই নিয়মানুবর্তিতার এই উন্নত দেশে মেনে নেয়া যায় না! ক্ষণিকের যে অস্থিরতা আর হিম হিম ভয় আমাকে গ্রাস করেছিল, তা প্রবাসী হিসেবে আমাকে একেবারেই মানায় না!  আমি কি করে ভুলে গেলাম যে, এসব দেশে বাসেট্রামে, রাস্তাঘাটে একা হোক আর সংগীসহ হোক একটা মেয়ে/মহিলা কখনোই অনিরাপদ নয়। কখনোই কেউ এভাবে বা কোনভাবেই একটা মেয়েকে কিছু করার বা বলার কথা ভাববেও না

হ্যাঁ, একটু সময়ের জন্য হলেও আমি ভুলে গিয়েছিলাম এসব কিছু। কারণ আমি যেখান থেকে এসেছি, যেথায় আমার জন্ম, যেখানে আমি আমার সর্বোচ্চ সময় পার করেছি সেইখান থেকেই আমি এইসব অনিরাপত্তা, ভয়ভীতি নিয়ে এসেছি। কেননা এগুলো নিয়েই আমি বেড়ে উঠেছি। যেখানে আজও মেয়েরা অনিরাপদ। ঘরেবাইরে, বাসেট্রামে, রাস্তাঘাটে সবখানেই যেখানে বাসে থাকা একটা মেয়ের দিকে ড্রাইভার থেকে কন্ডাক্টার, এমনকি প্যাসেঞ্জারও চোখ বুলায়। যেখানে চলন্ত বাসেট্রামে একা থাকা একটা মেয়েকে সবচেয়ে ঘৃণিত কাজ ধর্ষণ পর্যন্ত করতে ইতরদের দ্বিধা হয় না, সেখান থেকে নিরাপদ জায়গায় এসেও আমার এমন বোধ নিশ্চয়ই অযৌক্তিক নয়, তাই না?

সাম্প্রতিক কালে দেশে প্রতিদিন ঘটে চলা অজস্র ঘটনা আমাকে এসবই ভাবাতে বাধ্য করে। আমি নিশ্চিত, দেশের প্রতিটি মেয়ে মনের অবস্থা বর্তমানে এমনি। অবশ্য মনের অবস্থা নিয়ে মাথা ঘামাইবা কয়জন!

এবারে বলছি অন্য একটা দিক। চলতি মাস থেকে আমি ব্যক্তিগত একটা কাজে সপ্তাহে একদিন আমার বসবাসের জায়গা থেকে একেবারে বিপরীত দিকে যাই। অর্থাৎ, ইস্ট থেকে ওয়েস্ট হয়ে অল্প একটু নর্থের দিকে। এবং এই এলাকা একদম লোকজনে ভরপুর। যাওয়া আসার মাধ্যম বাস, ট্রেন আর সাবওয়ে। এবার কিন্তু খালি বাস ট্রেন পাওয়ার কোন সুযোগ নেই। সবসময় বেশ ভরাভরা। এই যে বাসট্রেনে এতো ভরপুর, জানেন আমার কখনো ধাক্কা লাগেনি! কোন ঠেলাঠেলি বা গুঁতোগুঁতি সইতে হয়নি! কোন অসভ্য লোকের হাতের স্পর্শও পেতে হয়নি! এমনকি আতংকে অস্থির হয়ে শক্ত হয়ে স্টপেজের অপেক্ষা করতে হয়নি!

ছেলেমেয়ে, নারীপুরুষ, শিশুবুড়ো কারুর চোখ কারুর দিকেই আটকাতে দেখেনি। দেখিনি কোন মেয়ের দিকে লোলুপ দৃষ্টি দিতে। মাল্টিকালচারাল এইসব দেশে তো হরেকরকম মানুষের বাস। পোশাক কম না বেশী তা দেখার জন্য আপাদমস্তক কাউকে মাপতে তো দেখিনি। যে যার প্রিয় পোশাকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বা বসে যাত্রা সংগী হচ্ছে, কই আড়চোখে বা সরাসরি কামুকতার চোখে তো কাউকে তাকাতে দেখিনি। সিটে বসা পুরুষলোকের সামনে মহিলা যাত্রীকে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অস্বস্তিতে ভুগতে দেখিনি। অথবা বসে থাকা মহিলার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে তার উন্মুক্ত পা বা খোলা পিঠ অথবা বুকের দিকে উঁকি দিতে দেখিনি। সাবওয়ের দীর্ঘপথে বসে আমি শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলি। ভাবি, আহারে আমার দেশের বাসেট্রামে চড়া সব মেয়েরা যদি এই শান্তিটুকু পেত! আচ্ছা খুব কি ক্ষতি হতো?

আমার সোনার দেশের, সোনার মানুষদের ভেজালটা আসলে কোথায়? মনে, মাথায় না মানসিকতায় নাকি শিক্ষায়? নিয়ম আর শৃঙ্খলার এমন বৈষম্য একই বিশ্বের দুই প্রান্তের মানুষদের বৈপরীত্যকে যে দিন দিন বাড়িয়ে দিচ্ছে, তার দায় কার? তার জন্য দায়ীই কে বা কারা? পৃথিবীর সবাই তো মানুষ! তবে আমার দেশের মানুষদের নামের আগেবসছে কেন এতো!

কেউ কেউ ভাবতে পারেন আমি একটা সম্পূর্ণ উন্নত দেশের সাথে একেবারেই অনুন্নত দেশের তুলনা করছি
অনেকেই ভেবে নিবেন, বিদেশে থেকে আমি আজ নিজের দেশ নিয়ে কীসব বলছি। ধরে নিবেন, নিজে সুখে থেকে এমন বড় বড় কথা, সবাই বলতে পারে। এও বলতে পারেন যে আমি নিজেকে ভুলে গেছি প্রবাসী হয়ে।

হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। প্রবাসী হয়েই আমি বুঝতে পেরেছি, কোনটা নিয়ম, কোনটা অনাচার। বড় বড় কথা আর নিরাপত্তার বুলি আওড়াচ্ছি, কারণ জেনে গেছি সব দেশেই ওটা অধিকার। নিজের দেশ নিয়ে বলতে পারছি, কারণ আমি জানি কাকে বলছি।

আর তুলনা! তুলনা করছি, কারণ সবাই তো মানুষ। ওরা পারলে, আমার দেশের মানুষেরা নয় কেন! ওরা সব কিছু জয় করতে পারলে, আমরা শুধুটাকে হারাতে পারি না কেন!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 474
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    474
    Shares

লেখাটি ১,৯১৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.