‘মাকে আমার পড়ে না মনে’ – ৩

0

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী:

মা চলে যাবার আগে তাঁর ৪৭ বছরের পুরনো সংসারটা আমার দায়িত্বে রেখে গেছে। কঠিন দায়িত্ব। সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো আব্বু।

মা যেভাবে ভালুককে আদর – মায়া – যত্ন আর কড়া শাসনে রাখতো, তা কারো পক্ষেই সম্ভব না। বিশেষ করে শাসন করার ব্যাপারটা। ভালুকের (আব্বুর ডাক নাম ভালুক বা বীয়ার), বয়স এখন ৮৬। গত কয়েক বছর হলো চোখে একেবারেই দেখতে পায় না। ফেরদৌসীর জন্য বিস্তর কান্নাকাটি করে থেকে থেকে।

প্রথম কয়েকদিন কিছুক্ষণ পরপর আমাকে ডেকে বলে, “আমাকে এখন কী করতে হবে? আমি কোথায় যাবো?” এই বাড়ি ছেড়ে কিছুতেই যাবে না, কেন না ফেরদৌসীর স্মৃতি আছে। অগত্যা আমার আর নিজের সংসারে ফেরা হলো না আপাতত। সেই নভেম্বর থেকে বাড়িঘর ছেড়ে মায়ের বাড়িতে আছি বনি (আমার বন্ধু, পার্টনার), আমি, আমাদের দুই কন্যা।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

প্রায়ই আমাকে বলবে, শোনো, তোমার মায়ের কোনো খবর বলতে পারো? তোমার কী কোনো ধারণা আছে তোমার মা কোথায় যেতে পারে?

… আমি চোখের পানি সামলে তাঁর পিঠে হাত বুলিয়ে বলতে থাকি, আম্মু ভালো আছে, আব্বু! খুব ভালো আছে।

এখন আমাদের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান আব্বুকে স্বাভাবিক রাখা। আমরা বলতে আমি, বনি, বাচ্চারা, অতীত, খালা আর আনোয়ারুল মিলে সে এক বিশাল টিমওয়ার্ক। মাঝে-মধ্যে শেফালি খালাকেও দলে নেয়া হয়। মায়েরই রেখে যাওয়া টিম।
মার্চের ৬ তারিখে মা চলে গেল। ২৫ তারিখে আব্বুকে নিয়ে আমি একই হাসপাতালে। একই ডাক্তারের কাছে। তিনদিন থাকতে হলো, মাকে যে ওটিতে শেষ নেয়া হয়, সেই ওটির ঠিক উল্টো দিকের কেবিনে আমরা।

আমার মানসিক পরিস্থিতি অন্তঃসারশূন্য। তার আগের চারটা মাস মাকে নিয়ে হাসপাতালে থাকতে থাকতে সবখানে হাসপাতালের গন্ধ পাই এমনিতেই।

আব্বুর হাসপাতাল ভীতি আছে। নার্স এলে না হলেও বিশবার বলবে,
: কে আপনি? নাম কী?
আপনি কী আমার হাতে ইঞ্জেকশন দেবেন?
নার্স খুব মিষ্টি করে বলে,
: না বাবা , সুগার চেক করবো, একটু পিঁপড়ার কামড়ের মতো লাগবে।
: শুনুন, আমার বয়স সেভেন্টি সিক্স! (৮৬ ভুলে গিয়ে) এই বয়সে আমার ডায়াবেটিক চেক করে আপনার কোনো লাভ হবে না। আপনি বরং আমি যে আঙুলের সমস্যা নিয়ে এসেছি, তাই দেখেন।
কেবিনে গিয়ে ওদের যত্নআত্তি পেয়ে প্রথমে খুব খুশি।
: এখানে আমাকে স্যান্ডেল দেয়া হবে? বলেন কী? (শিশুর মতো হাসি)। টুথব্রাশ, চিরুনি আমার জন্য? বলেন কী? ( আবার একই হাসি)
ডিনারের মেন্যুটা কী?
ফেরদৌসী এখানে একটা স্পেশাল স্যুপ খেতো বলেছিলো, আমি সেই স্যুপটাই খাবো। She was a beautiful soul!

ডাক্তার, সিস্টার সবাই তাঁকে আদর করে যান। প্রশ্রয়ের হাসি হাসেন এই ভদ্রলোকের সরলতা দেখে। ফেরদৌসীর প্রিয় স্যুপই তাঁর জন্য আসে।
সমস্যা বাঁধলো ওটিতে নেয়া হলে। হাতের ইনফেকশনটার ড্রেসিং দরকার, হাতটা ব্যান্ডেজ করা হলো। এরপর থেকে হাসপাতালের কাউকে দেখলেই মুখ গম্ভীর, আর কথা বলে না। কারণ তাঁর ব্যথা লেগেছে।
: আমি এখানে থাকবো না, এরা টর্চার শুরু করেছে। এবার আমি বুঝলাম ফেরদৌসী কী কষ্টটা করে গেছে!
ডাক্তারের সহকারী, খুবই যত্নে তাঁর ব্যান্ডেজ দেখে দেন। মাকেও অনেক যত্ন করেছিলেন। আব্বু তাঁকে প্রথমে খুবই খাতির করলো। তারপর ড্রেসিং করতে এলেই বলে,
তাকে তো Allow করা যাবে না! He is a criminal!

প্রতিপদে টের পাচ্ছি মায়ের শাসনের প্রয়োজনীয়তা।
আব্বুকে শান্ত করার জন্য এবার কেবিনে তাঁকে রবীন্দ্রসংগীত শোনানো শুরু করলাম ফোন থেকে। বেডে শুয়ে তাল দেয়, নিজেও সুর মেলায়। এখনো নির্ভুল সুর। গানের গলা তাঁর চমৎকার। এবারে আমাকে তাঁর সাথে গাইতে হলো , “তুমি কী কেবলই ছবি”.. সব কিছুই ফেরদৌসীকে ঘিরে।

কোনো রকমে শেষ হলো হাসপাতাল পর্ব। শেষদিন আমি আর পারলাম না। বের হচ্ছি আর সমানে কাঁদছি। মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারিনি – এই ব্যথাটা মোচড় দিয়ে যায় বুকে।

এমনিতেই আব্বুর আচরণ একটা শিশুর মতো। বনি রুটিন মেনে ভোরবেলা আব্বুর পাশে গিয়ে বসে,
: আব্বু, কেমন আছেন? আজকে কী খাবেন?
খাওয়া-দাওয়ায় তেমন নিষেধাজ্ঞা নেই বলে নিশ্চিন্তে এই প্রশ্ন করা যায়।
আব্বু বলবে,
: চিতল মাছ খাওয়া যায় না? তোমার মা যেভাবে রান্না করতো ওইভাবে।
মাগুর মাছের ঝোল, ফেরদৌসী করতো।

আমাদের বাড়িতে “জামাই” ডাকার কোনো প্রচলন নেই কিন্তু আব্বু কিছু মনে পড়লে নাম ভুলে গিয়ে

জামাই! জামাই! বলে ডেকে বাড়ি মাথায় করে। কারণেঅকারণে ডেকে ডেকে বাড়ি মাথায় তোলার অভ্যাস আগেও ছিল – মা ধমক দিয়ে থামাতো। মা চলে যাওয়াতে আগের চেয়ে অনেক চুপচাপ হয়ে গেছে তারপরেও মাঝেমধ্যে অজান্তে আগের ফর্মে ফিরে যায়।
যাই হোক জামাই না মনে পড়লে বলে,
আমার মেয়ে কোথায়? তার হাসব্যান্ড গেল কোথায়?
আমার মেয়েদের নামও আব্বুর মনে থাকে না, – নাতনি! নাতনি! বলে ডাকে ওদের। নাতনিদের স্কুলের বৈশাখী মেলার জন্য তাঁর যক্ষের ধন পুরনো ব্রীফকেস থেকে দুশো টাকা বের করে দেয়, চকলেট দেয়। নাতনিরাও তাঁকে কিছু উপহার দিলে ওই ব্রীফকেসেই রাখে। বাকি সবার ব্রীফকেসে হাত দেয়া বারণ।

জামাইকে খোঁজ করার অর্থ হলো তাঁর কোনো কিছু খেতে ইচ্ছে হয়েছে বা অন্য কিছু কেনার আবদার আছে। এবং জামাই যে করেই হোক তা পূরণ করবে সে নিশ্চিত। বেশিরভাগই নিরীহ আবদার। কিন্তু বড্ড অসময়ে।
যেমন, একটা রিমোটের ব্যাটারি, শেভিং রেজার, পা ঘষার ঝামা, লজেন্স ইত্যাদি।
ভোর ছয়টায় বা গভীর রাতে তাঁর অদ্ভুত সব খাবার খেতে মন চাইবে।

: শোনো, আমাকে একটু আমের আচার খাওয়াতে পারো?
আমার খালা আমের আচার বানিয়ে বাড়িতে দিয়ে গেল। দুইদিন পর আবার,
: শোনো, আমার তো একটা মুশকিল হয়ে গেল, তোমাকে ডেকে কী বলব সব ভুলে যাচ্ছি। তিনদিন ধরে একটা জিনিস খেতে ইচ্ছে করছে, নাম মনে করতে পারছি না!
: কী আব্বু? কোনো সমস্যা নেই, মনে পড়লে আমাকে বলেন।
: আহ্ হা! পরে মনে করলে তো চলবে না। আমাকে এখনই বলতে হবে। আমের আচারের মতো আরেকটা কিছু আছে, খাওয়াতে পারবে?
: কী আব্বু? কাসুন্দি?
: মহা খুশি হয়ে হ্যাঁ, হ্যাঁ, কাসুন্দি!!

বনি সেদিন মংলা যাচ্ছে শুটিং এর কাজে একদিনের জন্য। যাওয়ার আগে দৌড়ে গিয়ে কাসুন্দি এনে দিয়ে গেল।
মংলা যাবে শুনে আব্বুর শখ হলো চইঝাল দিয়ে মাংস রান্না খাবে। এবারেও জামাই হতাশ করেনি। এক ব্যাগ চইঝাল হাতে নিয়ে ভোরবেলা পৌঁছালো। আব্বু তখন জামাইকে,
: এনেছো? ওগুলো তোমার ওয়াইফের হাতে দিয়ে যাও রান্নার জন্য।
জামাই চট্টগ্রামে শুটিং করতে গিয়ে ফোনে কাঁদছে, আব্বুর তার জন্য মন খারাপ।
চট্টগ্রাম থেকে নিয়ে এলো শুঁটকিমাছ।

আমাদের শিশুর মতো বাবাকে খুশি রাখতে আমি নতুন জামা, ক্রিম, সাবান, বডি স্প্রে নিয়ে আসি, নাতনিরা বই পড়ে শোনায়, জামাই বাজার করে, চাচাতো বোন রীমা আপা বাজার পাঠায় আর চিতল মাছের ঝোল, কোফতা, কই মাছ ভাজা, মাগুর মাছের ঝোল, শুঁটকি, চইঝাল দিয়ে মাংস – রান্না করে দেই একেক দিন একেকটা। এভাবেই চলছে দিন।

ভয়ে ভয়ে বলি, আব্বু কেমন হয়েছে?

: একদম তোমার মায়ের মতো! টপক্লাস!

২৫শে বৈশাখে টেলিভিশনে সারাদিন রবীন্দ্রনাথের গান শুনে সে স্মৃতিকাতর। সবাইকে ডেকে ডেকে বলছে কোন গানটা রাজেশ্বরী গাইতো, কোনটা ফেরদৌসীর প্রিয়।
শেফালি খালা ঘর মুছছে।
: কে তুমি? তুমি কে? নাম বলো!
: খালু, আমি শেফালি।
: ও তাই বলো! শোনো! আজ রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন বুঝলে? রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন! সোজা কথা!
শেফালি খালা বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে সায় দেয়।
: শোনো! আমার বাবা যখন দিনাজপুরে ছিলেন… বাবা তো খুব রাশভারী মানুষ ছিলেন…
যে কোনো বিষয় ঘুরেফিরে বাবার গল্পে এসে মোড় নেবে – এ বাড়ির সবাই এতোকালে তা জেনে গেছে। এই পিতৃভক্ত পুত্রকে তাঁর পিতার বাড়ি থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিলো – এই কষ্টটা আমি কোনোদিন ভুলতে পারি না।

গত চারদিন ধরে বৃষ্টিতে পানিবন্দী অবস্থা আমাদের। হাঁটুপানি ভেঙে অপ্সরী পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে। আমি পোকামাকড় ভয় পাই, পানিতে নামতে কান্নাকাটি অবস্থা। এমন সময় আব্বু মাথা নেড়ে, দুই হাতে তাল দিয়ে গান শুনছে।
আমি অতীতকে বললাম, দেখ তো কেমন লাগে? (অতীত আর আমি একে অন্যকে তুইতোকারি করেই বলি)
অতীত গিয়ে আব্বুকে মজা করে বলে, খালু, কী ব্যাপার? তোমার নাতনি পানিতে নেমে ইস্কুল যাইতাছে, মেয়ে কানতাছে, বাসায় পানি উঠসে, আর তুমি গান শুনতাসো!

আব্বু আবার বাড়ি মাথায় করে, আমার মেয়েকে পাঠাও, কোথায় গেল সে?
আমি আসলাম, জ্বী আব্বু!
: সর্বনাশ! এতো বড় খবরটা আমাকে দাওনি?
: কোন খবরটা, আব্বু?
: তোমার বাড়িতে বলে পানি উঠেছে? তুমি বরং এখানেই থেকে যাও।

আমি শত দুঃখেও না হেসে পারি না –
: আমার বাসায় না, আব্বু, পানি উঠেছে আপনার বাড়িতে.. আর আমি কোথাও যাচ্ছি না, এখানেই থাকছি। আব্বু, আপনি নাশতা খেয়েছেন?

: হ্যাঁ, খুব শান্তি করে খেলাম। এটা কখনকার খাবার খেলাম, মা? এখন কী দিন না রাত?

: আব্বু, এখন সকাল।

(দৃষ্টি হারানো এই মানুষটার একসময় নেশা ছিল বই পড়া, গান শুনতে শুনতে গাড়ি ড্রাইভ করা, বাগান করা।)

মা, তুমি বলতে, তুমি না থাকলে আব্বুকে যেন দেখে রাখি। আমি চেষ্টা করছি।
মা, তুমি ছাড়া জীবন অসম্ভব – তুমি কী দেখতে পাচ্ছো?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 324
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    324
    Shares

লেখাটি ১,৬১৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.