পুড়ে যাওয়া বিকেল ও বেহালাবাদক

প্রজ্ঞা মৌসুমী:

দোতলার মুক্তা আধকচি পেয়ারার ডালের মতো হাতে কাপড় নিতে নিতে গজগজ করে, ‘এক্কেরে বজ্জাতের হাড্ডি। গেইট থাইক্কা আদ মগ বালু ধুয়া কাপড়ে দিছে। বাসা বাড়িত কামে আই মরতে।’ একেক রোদে ঘটনা পাল্টায়- ‘এক্কেরে বজ্জাতের হাড্ডি। টবের থাইক্কা মাটি তুইল্লা আমার মাতায় ডালচে। বাসা বাড়িত কামে আই মরতে।’ ওসব শুনতে এতো ভালো লাগে জোহরার। কড়কড়ে মাটির জল পাওয়ার মতো একটা সুখেল অনুভূতি হয়। মনে হয় মিঠে এক সুর বেজে গেছে কোথাও। এমন ঘর পেলেও বুঝি বর্তে যেত জোহরা। যেমন তেমন একটা সংসার, একটা পরিবারও হতে পারতো চাতক জোহরার সান্ত্বনা।

শেষ বিকেলে এ বাড়ি ও বাড়ির জানালায়-বারান্দায় টুক করে কোন সংসার উঁকি দিলে জোহরার বুকে গাঢ় হু হু জমে এক। মনে পড়ে ছোট্ট উঠান, ছোট ভাইবোন, এক কোণে পড়ে থাকা কটা মানকচু, কুপির আলোর ছটফটানি, জ্বাল দেয়া তরকারির ঘ্রাণ। আঙুলের হিসেবে সপ্তাহ খানেক, শুধু জোহরার মনে বয়ে গেছে অনন্তকাল। যেন কতকাল ও দেখেনি মা, ছোট দুটো ভাইবোন, ছোট্ট উঠান। এমনিতে ফুরসত কোথায়! সারাদিন ব্যস্ত ঘরছাড়া লোকের দশটা-আটটা ফাইফরমাশ নিয়ে। শুধু বিকেল গড়ালে রুনা খালার সাথে ডেরায় ফেরার অপেক্ষা ঘনিয়ে এলে জোহরার মন ছুট দেয় খসে পড়া তারার মতো।

মেসের কাজ জানলে জোহরার মা হয়তো মেয়েকে শহরেই পাঠাতো না। এ আন্দাজ করেই বুঝি রুনা খালার বাসা বাড়ির কামের মুখরোচক বর্ণনায় ওইটুকু বাদ পড়েছিল। প্রথম তো এতোগুলো ব্যাটাছেলে দেখে জোহরা রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়েছিল। একটানে খালা শোনায় নাম-ধাম-কাজের ফিরিস্তি। কিছুই কানে আসে না। ভয়ে উত্তেজনায় জোহরা তখন ঘামছে। ঘাবড়ে যাওয়াটা ও পক্ষেও ছিল। এতো ধাতস্থ হওয়া বুয়া প্রজাতির কেউ নয়। জোহরা কারো কাছে ছোট বোনটার আদল, কারো কাছে মেজো মেয়ে, কারো কাছে কচি কবোষ্ণ কবুতর। তবে ওটা ভাবনা পর্যন্তই।

এমনিতেই বুয়ার জন্য হাহাকার। তার উপর অভিযোগ, লুঙ্গি তুলে চারতলার আছিয়াকে নিজের মানিক-রতন দেখিয়ে ‘তোরটা দিবি?’ আকুল প্রস্তাব করেছে সানশাইন অফিসের ভুখা একাউন্টেন্ট। সূর্যের চেয়েও বালির তাপ বেশি বুঝাতে এ নিয়ে ফুঁসেই যাচ্ছে বাড়িওয়ালার রণচণ্ডী বোন। পারলে অস্ট্রেলিয়ায় থাকা মালিককে ফোন করে তেতলার মেসটাই উঠিয়ে দেয়। রুনা খালা নিজে মেসে কাজ করে না। চিল-কাকও বসতে ভয় পায় এমন গলার খালাকে নিয়েও হুটহাট ভয়ের কালে অসুখে পড়া জামাইকে ছুঁয়ে সেই যে জবান দিয়েছিল। হিকমতের এখনও বিশ্বাস ‘মেস বাড়িত কাম করা মাইয়ালোকের চরিত্রের টিক তাকে না। চাইলেও টিক রাকত ফারে না।’

বকশিশের বিনিময়ে হলেও এই আকালে এমন মেয়ে এনে দিয়েছে, তার জন্যই কৃতজ্ঞতাবোধে আক্রান্ত ওরা। বেসিক চাহিদার পরেই না ভোগ বিলাসিতা। তাই কবোষ্ণ কবুতর ছুঁয়ে ফেলার আকুল ইচ্ছেকে চাপা দেয়ার দৃঢ়তাও ওরা দেখাতে চায়। শুধু পাশের ডেরার আজর নানী ঘ্যানঘ্যান তুলে, ‘এমন ল্যাতল্যাতা ছেমরিরে মেসে দিবি? বিয়া দিতেও জামেলা অইব।’ রুনা খালার গনগনে আওয়াজের তোড়ে উড়ে যায় ফালতু বাতচিত। উঠতি মেয়ে নিয়ে সংসারী বাসার বিবিসাবদের হুজ্জুতি কি কম! বরাবরের মতো তো আর নয়। যতদিন না পাওয়া যাচ্ছে, ততদিন মানিয়ে নিক না জোহরা। মেসবাড়িই বা মন্দ কী! বিবিসাবের খবরদারি নেই, কথায় কথায় কিল-চাপড় নেই। তাছাড়া নিয়তিতে কষ্ট থাকলে, সে তার নিজের পথ ঠিক চিনে নেয়।

হয়তো তাই সবকিছুতেই অভ্যস্ত হতে শিখেনি জোহরা। এখনও বালতিতে একরঙা, দুরঙা আন্ডারওয়্যার ফুটে উঠলে ঘিনঘিনে ভাব হয় ওর। যেমনটা হয় মানুষের অযাচিত স্পর্শ পেলে। চার তলার বেনুর কাছে একদিন আকুতিও রাখে, জাঙ্গিয়া ধুয়ে দিলে দশ টাকা দেবে। জোহরার ঘিনঘিনেপনা বেনুর কাছে মনে হয় ঢং ‘মরণ। তুই কামলা মাইয়া। কাপড় ধুয়া তোর ডিউটি। কাপড়ে কি হেগোর মুলা লাইগ্গা আছে?’ অথচ ছোটবেলা থেকেই জোহরার মা বলতো, কাপড়েরও শরম থাকে। লোকজন যায় উঠানের অমন জায়গায় পাজামা দিবা না। ছড়াবা ঐ কোণে, আর এই যে পাজামার দু পায়ের মাঝখানের ভাঁজ সবসময় ভেতরের দিকে রেখে ঢেকে দিবা। ব্রেসিয়ারটা সেলোয়ারের নিচে ছড়াবা। চাচারা বাড়িতে থাকলে ব্রেসিয়ার, টেইপ, সেলোয়ার উঠানেই ছড়াতো না জোহরা।

হয়তো সেই সংস্কারেই জাঙ্গিয়ার মুখোমুখি হয়ে লজ্জাবতী লতার মতো নুয়ে পড়ে জোহরা। আর একটানা দুদিন জাঙিয়া পড়ে থাকতে দেখে দস্তর হক যায় ক্ষেপে। ওদেরও তো গণ্ডায় গণ্ডায় আন্ডারওয়্যার নেই। ভোর থেকে মধ্যরাত অবধি ঘামে নুনে হিসু কামে চিটচিটে হয়ে থাকা আন্ডারওয়্যার তো স্বস্তি চায়। জোহরা মাথা নুয়ে গোঁ ধরে থাকলে দস্তর হকের ইগো হয়ে উঠে বুনো ঘোড়া- এক্ষন ধুবি। পাশে দাঁড়িয়ে পড়ে আরও কিছু ইগোধারী জাঙ্গিয়ার মালিক। জোহরাকে ওরা ঠেলে দেয় বাথরুমে। যেন ওরা টের পায়, ধরে ফেলে জোহরার তুমুল অস্বস্তি- ওর কাছে জাঙ্গিয়া যেন শিশ্ন ধরার কাছাকাছি কিছু।

ছেলেমানুষি উল্লাসের মতো ওরা ছুঁড়ে দেয় একেকটা জাঙ্গিয়া জোহরার দিকে। যেমন পৃথিবীতে সব গ্রাস করে রোদ। তেমন ক্ষুধা আর উত্তেজনায় ওরা আধভেজা জোহরাকে দেখে, চিটচিটে জিভে আওয়াজ তোলে- ভালো করে ডলা দে, আরো জোরে, আরো ঘষে ঘষে। গুড়িয়ে যায় জোহরার সৌখিন বিকেল। কান্নার চেয়েও ভার কিছু গেঁথে থাকে মেয়ের গভীরে। জোহরা হয়ে গেছে এক করুণ বেহালা।

ছয়তলা রওশন ভিলার আরও একটি পুড়ে যাওয়া বিকেলে তখনও ঝিরঝির করে কথা- প্লেট পড়ে কী করে, শুধু সিরিয়াল আর খাওয়া, কোন কাজই করে না, বেনু কড়া করে এক কাপ চা, একটা আস্ত চোর, এবার থামো অনেক মেরেছো, বদমায়েশ, কাজের মেয়ের লাইগ্গা কইলজা জ্বলে, জানেন ভাবী পাঁচ তলার বুয়ার গায়েও দেখি ঠিক এই শাড়িটাই ছিঃ ছিঃ ছিঃ! আমি তো লজ্জায়।

দাঁড়কাকের মতো দোতলায় ডেকে যায় কেউ অথবা বেহালাবাদক ‘বাসা বাড়িত কামে আই মরতে’…

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.