এক অ-প্রেমের কাহিনী!

পায়েল চক্রবর্ত্তী:

ছবিটি নিঃসন্দেহে সুন্দর। বড় বেশী সুন্দর, দৈব প্রেমের বাতায়ন, কৃষ্ণপ্রেমে মোহিত রাধা। শ্রীকৃষ্ণের বাঁশীর সুরে প্রস্ফুটিত কমল দল, প্রেমের যথার্থ সংজ্ঞা।

ইয়ে, বর্ণনাটা বড্ড ক্লিশে লাগছে বলুন? Honours এর নোটস এর মতো খানিক। রস- কষহীন বিষ! আচ্ছা, বেশী হ্যাজানো আমার ভালো লাগে না, টু -দি পয়েন্ট আসা যাক; সেটা বলতেই আসা।

উম, ধরে নিলাম এটা যমুনা (ডাল লেক হলেও ক্ষতি নেই) এবং রাশি রাশি পদ্ম। শ্রীমতি রাধা এবং কৃষ্ণ সান্ধ্যভ্রমণে বেরিয়েছেন।

যুবতী রাধা রানীর ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড খারাপ।
সারাদিন ঘর সংসার, ননদদের চোখ রাঙানি, শাশুড়ির বাক্যবাণ সহ্য করার পরও মেয়েটা ঘরে টিকতে পারতো, যদি বরটি মনমতো হতো। দুর্ভাগা মেয়ের বর নিতান্ত ছাপোষা শান্ত, কালীভক্ত, ভোঁতা লোক। সে জানে বউকে গ্রাসাচ্ছাদন দিলেই চলে, সকলের বউ তাতেই খুশী, তারটিই বা ব্যতিক্রম হবে কেন? আয়ান ঘোষ বাই প্রফেশন গোয়ালা, সুতরাং, বউ মথুরাতে দুধ, দই, ননী বিক্রি করে আসবে, সকলে যেহেতু সেটাই করে। টাকা আসছে, সংসার চলছে, সমস্যা কই ভাই আর?

রাধাও ছোটো থেকে সেই দেখে-শুনে বড় হয়েছে। হিসেব মতো এই স্টেরিওটাইপ জীবন তার ভালো লাগার কথা, কিন্তু আদপে সেটা হয়ে ওঠে না। রাধার ভেতরে গনগনা আগুন, সে পুড়তে চায় আগুনে, ছটফটিয়ে শেষ হতে চায়। ভোঁতা- সংসার সর্বস্ব, বয়সে অনেক বড় বরের স্বামীত্ব মানায় ভেতরে বিদ্রোহের ঝড় ওঠে।

মানসিক – শারীরিক অতৃপ্তিগুলো জমতে জমতে মেয়েটা একদিন চুপ করে যেতে থাকে। ঠিক যখন সে ভাবে এবারে নিজের আগুনকে ছাইচাপা দেবার সময় এসেছে, নাটকে নতুন মোড়।

কোত্থেকে এক বাউণ্ডুলে, বাঁশীওয়ালা এসে তার সবটুকু ওলট-পালট করে দ্যায়। টল-ডার্ক-হ্যান্ডসাম একটি ছেলে। হাসলে বিশ্ব ভুলে যার দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হয়, রাধার ভেতর আগুন হু হু করতে থাকে। সেটাও হয়তো চাপা পড়তো, লোকলজ্জা, পাপ-পূণ্য ইত্যাদির আন্দোলনে, কিন্তু ছেলেটির মধ্যে ভীষণ রকমের নেশা আছে, তায় সে নাছোড়বান্দা, তার নিত্যদিনের পথে হাজিরা দিয়ে নানাভাবে জানায় ‘ভালোবাসি’।

রাধা ক্রমশঃ ধরা দিতে থাকে ছেলেটির কাছে, না দিয়ে কিছুতে উপায় থাকে না আর। ছেলেটির মধ্যে আদিম টান, আর রাধার মধ্যে আস্ত আগ্নেয়গিরি। বরের কাছে অধিকার সূত্রে কেবল স্ত্রী এর কর্তব্যই পেয়েছে, তার নারীত্ব বের করার সাধ্য আয়ানের ছিল না, কৃষ্ণের ছিল।

রাধার চোখে প্রেমের রঙ গাঢ়, কৃষ্ণ উদাসীন, রাধা সংসার ভাসাতেও পারে, কৃষ্ণ হাসে, রাধা ঝগড়া করে, রাগ করে, সে রাগ টেকাতেও পারে না বেশিক্ষণ। কৃষ্ণকে সামনে দেখলেই সবকিছু ভোজবাজির মতো উবে যায়।

রাধা-কৃষ্ণ প্রেমে ভেসে যায়.. কৃষ্ণ ভাসে কি? নাহ… একেবারেই না। সে রাধার সাথে থেকেও আরো পাঁচটা মেয়ের সাথে ডেট করে, রাধাকে বন্ধুত্বের পাঁচালি শোনায়। তার অনেক সখী চাই, সে তার ফলোয়ার্সদের ফেরায় না, অথচ তার রাধা না হলে চলে না; সেটা শুধুমাত্র শরীরের টান নয়, হয়তো রাধার উদ্দাম ভালোবাসা অন্য কারও ভেতর পায় না বলে! কিংবা রাধা তাকে অধিকতর স্যাটিসফাই করার ক্ষমতা রাখে বলে।

কিন্তু একদিন রাধার এক্সপায়ারি ডেট পেরোয়… কৃষ্ণ বোর হতে থাকে। কাঁহাতক রোজ এই মান – অভিমানের প্যানপ্যানানি, ঘ্যানঘ্যানানি সহ্য করা যায়! সুযোগ আসে একদিন…তারপর মামাবাড়ির সম্পত্তির হদিশ পেয়ে কৃষ্ণ বাবা- মা’র কাছে ফিরেও যায়, মামাকে খুন করে প্রতিশোধ নেয়, এবং নিজে সিংহাসন দখল করে।

তারপর কৃষ্ণের আর রাধাকে প্রয়োজন পড়েনি কখনো। সমাজে প্রতিষ্ঠিত মানুষদের অতীত ঘাঁটলে চলে না। নতুন দায়-দায়িত্ব.. রাধা গ্রামের পুকুর, এখন কৃষ্ণের কাছে সমুদ্র আছে। সুতরাং এক ভার্জিনের সাথে প্রেম, অতঃপর বিয়ে। সুখের সংসার।

আর রাধা? তার ট্রাজেডি সাংঘাতিক! বিশ্ব-সুদ্ধ লোক তাকে নিয়ে কানাকানি করছে, স্বামী পরিত্যক্তা রাধার কী হলো? সে নিয়ে ইতিহাস নীরব! পড়েছিলাম, শেষমেশ রাধা কৃষ্ণের কাছে শেষ সময় কাটিয়েছিল, তার দাসী হয়ে।

ইতিহাস মিথ্যে বলে। রাধা বরং ফুঁসে উঠেছিল, সেটা হওয়াই উচিত। রাধার মতো অগ্নিকন্যারা দাসী হয়ে দিন কাটানোর মেয়ে নয়!

হয়তো কোনো এক সন্ধ্যেবেলায় রাধা তার প্রাক্তনের মুখোমুখি হয়েছিল। তার রাগের দাপটে আকাশে ভয়ানক মেঘ সেদিন.. পাগল করা ঝোড়ো হাওয়ায় গাছেরা ভয়ানক মাতাল… প্রকৃতি অনাসৃষ্টিতে মেতে… মেয়েটি একবার হয়তো বলে এসেছিল দৃপ্ত কন্ঠে, তোমাকে এর দাম দিতে হবে!! সেই বজ্রনির্ঘোষ ইতিহাস কখনো তুলে ধরবে না।

যুগে যুগে এক ব্যর্থ প্রেমের বোঝা বয়ে, নিঃশেষ হয়ে যাওয়া মেয়ের মিথ্যে গরিমা কীর্তন হয়ে যাচ্ছে। অথচ মেয়েটি সারাজীবনে কোনো দিকে সম্মান পায়নি। প্রেমিক ছেড়ে গেছে। স্বামী ছেড়ে গেছে… পরকীয়া করার অপরাধে মেয়েটি হয়তো সারা জীবন টীকা-টিপ্পনি পেয়ে গেছে… এক যৌবনের ভুল, গোটা জীবনকে কেড়েছে।

সমাজবিচ্ছিন্না রাধা কেমন আছে, তার দিনাতিপাত কীসে হয়, কৃষ্ণ একেবারের তরেও দেখতে আসেনি। ওরা আসেও না। বিবাহিতাকে নিয়ে শোয়া যায়, তাকে সম্মান দেওয়া যায় না! বেসিক্যালি, আয়ান আর কৃষ্ণ দুজনেই রাধাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে গ্যাছে। একজন অজ্ঞাতে, একজন অবহেলায়।

আর আমরা যতো কূপমণ্ডুকের দল, একটা ধ্বংসস্তুপের ওপর কল্পনার মোড়ক বুনে সেটা নিয়েই মাতামাতি করতে থাকি। এক ঠগের কী ঐশ্বরিক মহিমা আছে আমি জানি না, হয়তো ঘোরতর পুরুষতান্ত্রিক দেবসমাজ বলে এক মহিলাকে জাহান্নামে ঠেলে অন্যত্র সংসার পাতার পরেও তাকে দেব মহিমায় অর্চনা করা হয় যুগ যুগ ধরে।

হায়রে মানুষ! হায়রে কূপমণ্ডুকতা!!

শেয়ার করুন:
  • 760
  •  
  •  
  •  
  •  
    760
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.