‘মাকে আমার পড়ে না মনে’- ২

0

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী:

আমি সারাজীবন খুব বেশি বাবার মেয়ে ছিলাম। তুমিও একথা বলতে। ছয় সন্তানের মধ্যে আমার জন্মের সময় তোমাকে সবচেয়ে বেশি ব্যথা সহ্য করতে হয়েছিলো। নির্দিষ্ট তারিখের অনেক পরে জন্মেছিলাম, ওজনও ছিল বেশি। সিলেট ওসমানী মেডিকেলের লেবার রুমে ওই মুহূর্তে কোনো চিকিৎসক, নার্স কেউ ছিলো না। ব্যথায় কাতর তুমি চিৎকার করে ডাকছিলে, দেখতে পাচ্ছিলে আমার গলায় নাড়ি পেঁচিয়ে যাচ্ছে। জন্মের সময় যে আমার বাঁ হাতটা ভেঙে যায় তা তোমরা টের পেয়েছিলে ছাতকের বাড়িতে ফিরে আসার পর যখন কিছুতেই বাচ্চার কান্না থামছিলো না। সেই থেকে আজো পর্যন্ত কারণে-অকারণে  বাবা বলে ওঠে, ” আহা রে! আমার হাত ভাঙা মেয়েটা! ”
তাই নিয়ে কম হাসাহাসি হতো না আমাদের।

আমার সব কিছুতেই চিরজীবন এই ভদ্রলোকের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়। লেখাপড়ায় ভালো হলেও স্কুল ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা ছিল আমার। আব্বুকে বললেই সেদিন না যাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যেতো। কিন্তু তুমি টের পেলে আব্বুসহ বকা খেতাম। একদিকে আমার আবদার, অন্যদিকে তোমার চোখ রাঙানির ভয়ে বেচারা আব্বু অসহায় এক পরিস্থিতিতে পড়তো।

এটা সত্যি যে, সবার ছোট হওয়ার পুরো সুবিধাটুকু বাবার কাছ থেকে পেলেও তোমার কোলঘেঁষা বাচ্চা হতে পারিনি ছোটবেলায়। আসলে সে সুযোগ আসেইনি কোনোকালে।
তখন তোমাকে কেন যেন খুব ভয় লাগতো, মা।

আমার স্মৃতিতে ছাতক, সিলেটের কথা কিছুই মনে পড়ে না। আমি যখন থেকে তোমার মুখটা মনে করতে পারি তখন আমরা ধানমন্ডি -৭ নম্বর রোডের পানাউল্লাহ হাউজে, আমার দাদা বাড়িতে থাকি। তোমার ভাষায়, ‘৭১ এ বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও স্বাধীনতার মুখ দেখেনি এ বাড়ির অন্দরমহল। যে বিশাল বাড়িতে আমাদের তিন বোনকে নিয়ে তোমার ঠাঁই হয়নি – কারণ তুমি বীরাঙ্গনা!  চরিত্রহীনা! তিন তিনটে পুত্রসন্তান সমেত তোমাকে বিয়ে করেছে এ বাড়ির অবাধ্য ছেলে। অথচ তুমি তখন চাকরি করছো, তিন ছেলেকে পল্লবীতে আলাদা বাড়িভাড়া করে রেখেছো , সম্ভ্রান্ত, উচ্চবিত্ত শ্বশুরালয়ের ওপরে আর্থিকভাবে নির্ভর করোনি।

অফিস ফেরত ক্লান্ত তোমাকে ঘরে ফিরে বিশ্রাম নিতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। বাজার, রান্না, ভাইয়াদেরকে দেখতে রোজ সন্ধ্যায় পল্লবী যাওয়া, তাদের তদারকি, সেইসাথে তোমার নিজের মা – ভাইবোনদের প্রতি দায়িত্ব – কর্তব্য পালন করে গেছো একনিষ্ঠভাবে। কেউ বিপদে পড়লে আত্মীয়, বন্ধু, আপন- পর এ নিয়ে ভাবোনি। কার ডাক্তার দেখাতে হবে, কার চাকরি নেই, কার আশ্রয় দরকার, কার আর্থিক সংকট, কার হাসপাতালে খাবার রান্না করে নিয়ে যেতে হবে – তুমি ছুটে গেছো নির্দ্বিধায়।

ধানমন্ডির বাসার আশেপাশের সব বাড়ির গৃহ সহকর্মীদের দেখতাম তোমাকে ঘিরে নিজেদের বিবিধ সমস্যা আলোচনা করে পরামর্শ নিতো। তখন বোঝার মতো বয়স বা বুদ্ধি হয়নি, পরে বুঝতাম ওরা তোমার কাছে আসতো যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, পারিবারিক নির্যাতন বা প্রতারণার শিকার হয়ে। কেউ কেউ অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ করে।

আমি বলছি ১৯৮৪/৮৫ সালের কথা। সেইসময় থেকেই তোমার যোগাযোগ ছিল দেশি- বিদেশি বিভিন্ন সমাজসেবামূলক বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাথে, যাদের সাহায্যে তুমি এই মেয়েদেরকে সহায়তা করতে। আজীবন এই কাজগুলো করতে একেবারেই নিভৃতে, নিজ দায়িত্বে। এনিয়ে তোমাকে কোথাও, কোনোদিন আত্মপ্রচার করতে দেখিনি। ধানমণ্ডি লেকের পাড়ের অনেক ভবঘুরে যৌনকর্মীকে চিকিৎসা করিয়েছো, বাড়িতে কাজ দিয়েছো।

কেউ নেতিবাচক কথাবার্তা বললেও ভ্রুক্ষেপ করোনি। তখন জানতাম না তোমার জীবনের ‘৭১, সেই দুঃসহ ইতিহাস। কিন্তু ঘন বাদামী চোখের গভীর দৃষ্টি, বড় টিপ আর সুতির শাড়িতে গোলগাল মুখের আমার মাকে কোথায় যেন আর পাঁচজনের চেয়ে আলাদা মনে হতো।
এখন মনে হয়, ‘৭১ তোমার বুকে জ্বলন্ত কয়লার মতো জ্বলতো বলেই হয়তোবা তুমি ওদের পাশে দাঁড়িয়ে শান্তি খুঁজে পেতে চাইতে।

একসাথে সংসারের হাজারটা দায়িত্ব পালন শুধু না, ছেলেমেয়ে, আত্মীয় -পরিজন নিয়ে এক বিশাল পরিবারের গুরুদায়িত্ব তোমার মাথার ওপরে। সেইসাথে এইসব স্বেচ্ছাসেবা। কী করে পারতে তা এক বিস্ময়!

রোজকার জীবনযুদ্ধের পাহাড়- পর্বত ডিঙিয়ে পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ এই আমার পর্যন্ত তোমার ভালোবাসা, মনোযোগ পৌঁছুনোর সুযোগ পেতো না। আমার আশ্রয় – প্রশ্রয়ের ডালপালা তাই আব্বু আর বড় আপা রাজেশ্বরীকে ঘিরে বেড়ে উঠছিলো। আমি খুব আদর খুঁজতাম সবসময়।

জ্বর হলে সেদিন আমার একধরনের চাপা আনন্দ হতো। মনে আছে, আমার জ্বর শুনে আব্বু অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে আসতো।  তুমিও সেদিন বাড়তি মনোযোগ দিতে, শান্ত ভঙ্গিতে এসে সময় মেনে থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর মাপতে।
“কী খেতে ইচ্ছে করে?” এই প্রশ্ন তখন অবধারিত। প্রত্যেকবারই জ্বরের সময় আমি বলতাম, “থাইস্যুপ, চকলেট, বিস্কুট আর পনির।” আর যা খেলে আমাদের সবার জ্বর পালাতো, তা ছিলো তোমার হাতের পিসপাস। পরে কত চেষ্টা করেছি পিসপাস বানাতে, তোমার মতো হয়নি।

তাপমাত্রা যখন বাড়তে থাকতো, চোখ মেলতে পারতাম না। ঠিক তখনই কপালে তোমার হাতের শীতল একটা ছোঁয়া পেতাম। চোখ বুঁজেই বলে দিতে পারতাম ওটা তুমি মাগো! ওই স্পর্শ স্বর্গীয়, অপার্থিব। জগতের কোনো কিছুর সাথে যার তুলনা হয় না।
যতদিন বাঁচি, এখন আমি জ্বর আসুক আর চাই না। কপালে তোমার হাতের ছোঁয়া পাবো না – সে জ্বর সারবে কীভাবে মাগো!

মা, এই সত্যটা তুমি জেনে গেছো – আমি মোটেই কেবল বাবার মেয়ে না, আমি মনেপ্রাণে তোমারও মেয়ে।
(চলবে)
লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 777
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    777
    Shares

লেখাটি ২,৯৫৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.