সন্তান পালন যখন মায়ের জন্য বোঝা হয় না

শামীম রুনা:

মা দিবসে ফেবু’তে একটা ভিডিও দেখলাম,”The everyday superhero” নামে। রোজ অফিস-মিটিং, অসুস্থ ছোট বাচ্চা-সংসার নিয়ে নাস্তানাবুদ এক মায়ের গল্প। এক সময় বস্ তাকে প্রমোশনের সঙ্গে সঙ্গে অফিসে আলাদা একটি কেবিন দেয় যাতে করে সে বাচ্চাসহ অফিস করতে পারে। আপাত দৃষ্টিতে এটি একটি সমাধান হলেও আদপে এটি মোটেও একটি স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। কতদিন মা বাচ্চাকে নিয়ে অফিস করবে? আর অফিসের কর্ম ব্যস্ততার সাথে বাচ্চাটির এডজাস্টমেন্ট বা ওর মানসিক বিকাশ কতোটা সঙ্গতিপূর্ণ হবে, এটি অবশ্যই ভাবার বিষয়।

বিভিন্ন বয়সের রয়েছে বিভিন্ন রকম প্রয়োজনীয়তা আর চাহিদা। শৈশবের দিনগুলো সমবয়সীদের সঙ্গে খেলা, জীবনের প্রয়োজনীয় ছোট ছোট শিক্ষা, মানুষ, পরিবেশ আর সমাজের সঙ্গে পরিচিত হয়ে বড় হতে হতে একজন শিশুর মধ্যে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটবে, এটাই স্বাভাবিক। বদ্ধ অফিস রুমে যা সম্ভব নয়।

সমগ্র ইউরোপ নারী স্বাধীনতা বা জাগরণের জন্য কতটা কী করেছে সে ইতিহাসে না গিয়ে বরং নরওয়ের নারীর স্বাধীনতা এবং নারী কর্মী তৈরির কথা খানিকটা বলি।

নরওয়েতে পুরুষের তুলনায় চাকুরীজীবী নারীর হার বেশি। নারী বস্ -এর সংখ্যা বেশি এবং পুরুষের তুলনায় নারীর গড় আয়ুও বেশি। এই যে সবকিছুতে নারীর অগ্রাধিকার, তার মানে এই নয় যে এসব নারীরা একলা বাঁচে, তাদের ঘর-সংসার-সন্তান নেই। আমার তো মনে হয় পৃথিবীর অনেক জাতির তুলায় নরওয়েজিয়ান নারী-পুরুষ সবাই অনেক বেশি সাংসারিক আর কেয়ারিং। এরা ছোটদের আর বড়দের যথাযথ যত্ন এবং সম্মান দুটিকেই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেয় এবং পালন করে, এবং এটা হয়ে থাকে ব্যক্তিগত-সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে।

নরওয়ের নারীর কর্ম স্বাধীনতার বয়স খুব আদি নয়, ষাটের দশকের শেষের দিক থেকে সত্তরের প্রথম দিকে এদেশের নারীরা ঘর থেকে বেরিয়ে আসে, প্রায় সেই সময়টাতেই আমাদের নারীরাও ঘর ছেড়ে বাইরের পৃথিবীর দিকে পা বাড়িয়েছিল, কিন্তু কিছু রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি আর সামাজিক গোঁয়ার্তুমির কারণে নারীদের এগিয়ে চলার পথ দিন দিন আগাছায় ভরে উঠছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নরওয়ের অর্থনৈতিক দুরাবস্থায় তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং রাজকর্তৃত্ব মিলে-মিশে দেশের উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক সুশাসন ও সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করেছিলেন, যা এখনও বিদ্যমান আছে। দেশের উন্নয়নের জন্য তখন রাজা এবং প্রধানমন্ত্রী সাধারণ জনগণের সঙ্গে একই কাতারে চলাফেরা করতেন (এখনও চলেন), তারা কতটা সফল হয়েছিলেন বর্তমান নরওয়ে দেখে তা বিচার করা যায় নিশ্চিন্তে।

নরওয়ের অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল হলো ট্যাক্স। এই ট্যাক্স ব্যবস্থা এদেশে তেল পাওয়ার আগেই চালু হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অধিকাংশ নারী গৃহকাজে নিয়ে বাড়িতেই ব্যস্ত ছিলেন। দেশের শাসকরা জনসংখ্যার অর্ধেক অংশকে কাজে লাগানোর কথা ভাবলেন। আর নারীদের প্রধান দুর্বলতা বা ভালোবাসা যাই বলা হোক না কেন, তা হলো তাদের সন্তান। দেশ শাসকরা বুঝতে পরেছিলেন, সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে নারীদের দিয়ে বিশাল কর্মী বাহিনী গঠন সম্ভব। তাই নারী বান্ধব কর্মপরিবেশ তৈরির প্রথম এবং প্রধান ধাপ হিসাবে তারা গড়ে তুলেছিলেন বার্নাহাগে বা কিন্ডারগার্টেন। যেখানে এক বছর থেকে শুরু করে ছয় বছরে স্কুলে যাবার আগ পর্যন্ত সব বাচ্চারা মা বাবাদের কাজ থেকে ছুটির আগ পর্যন্ত থাকবে। তা ছাড়াও প্রাইমারি স্কুলের ক্লাশ ফোর পর্যন্ত বাচ্চারা স্কুল ছুটির পর বাসায় না ফিরে চারটা পর্যন্ত স্কুলের একস্ট্রা কেয়ার ডিপার্টমেন্টে থাকে। সন্তানদের এসব কিন্ডারগার্টেনে দিয়ে মায়েরা নিশ্চিন্ত মনে কাজ করতে পারে।

এছাড়া এদেশে একজন শিশু জন্মানোর পর মাতৃত্বকালীন ছুটির মতোন আছে পিতৃত্বকালীন অফিসিয়াল ছুটি। বাবা’র পিতৃত্বকালীন ছুটির সময় মা অবশ্যই তার কাজে যাবে এবং বাবা পুরোপুরি সন্তানের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকবে। আমাদের অনেক বাবাদের মতন রাতে দু’ একবার ন্যাপি বদলে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করার মতোন নয় মোটেও। অনেক সময় দেখা যায় বাচ্চার ব্রেস্ট ফিডিং-এর সময় হলে বাবা সন্তানকে নিয়ে মায়ের অফিসে হাজির হয়।

নরওয়ের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্কুলে ছেলেমেয়ে সবার জন্য রান্না শিক্ষা অাবশ্যকীয়। যে কারণে একজন পুরুষ আর একজন নারীর মিলিত সংসারে পালা করে সপ্তাহের দিনগুলো ভাগ করে দু’জনেই রান্না করে। এখানে পুরুষ সঙ্গীটিকে অপেক্ষা করতে হয় না কবে তার সঙ্গিনী অসুস্থ হবে, আর সে একবেলা, আধবেলা রান্নার মতো এমন ক্রিয়েটিভিটির সুযোগ পাবে!

নরওয়েতে নারীকে গৃহকর্মে সাহায্যকারী কেউ নেই সত্য, তারপরও নারী বাইরে নিশ্চিন্ত মনে কাজ করবার সুযোগ পায়। এই সুযোগ নারী একা তৈরি করেনি, এই সুযোগ রাষ্ট্র, সমাজ তথা তার পাশের পুরুষটি তৈরি করে দিয়েছে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.