মানসিক দুর্বলতাই মানুষকে ধর্মের দিকে টানে

0

দিনা ফেরদৌস:

মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে ওর “এক্সটেন্ডেড ডে কেয়ার” এর লোকজনের সাথে হাই, হ্যালো ছাড়াও টুকটাক কথা হয়।একদিন ডে কেয়ারের স্প্যানিশ এক মহিলা জিজ্ঞেস করলেন; প্রান্তী নামের অর্থ কী? বললাম ‘প্রান্ত’ থেকে প্রান্তী এসেছে। এটি একটি বাংলা শব্দ। ওর পুরো নাম হচ্ছে, ‘পাললিক প্রান্তী’। মানে হচ্ছে, “প্রান্তের পলিমাটির” মানুষ সে।

মহিলা হাসি মুখে বললেন, আমি জানি বাঙ্গালীদের নামের সুন্দর সুন্দর অর্থ থাকে, তাই তোমাকে জিজ্ঞেস করা। আর একদিন পাকিস্তানি এক মহিলা জিজ্ঞেস করলেন, ইন্ডিয়ান? বললাম না, বাংলাদেশি। ‘প্রান্তী’ নাম তো মুসলমান নাম মনে হচ্ছে না? বললাম, না, এটা বাংলা নাম। ওহ, আমি আরো ভেবেছিলাম ইন্ডিয়ান ( মানে হিন্দু ভেবেছিলেন)।

শীতের সময় মাথা বিশাল বড় চাদর দিয়ে ঢেকে যেতাম। ফলে ‘সুদানের’ একজনের সঙ্গে কঠিন ভালো সম্পর্ক হয়ে গেল। তিনি টাইট শার্ট-প্যান্ট সবই পরেন, তবে চুল কোন অবস্থাতেই বের করতে দেখেনি। তার হাসিমাখা প্রাণবন্ত মুখ আমারও বেশ ভাল লাগে। এই গরমে মিনি জামা-কাপড় পরে মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে গেলে তার সেই প্রাণবন্ত হাসিটি আর পাইনি।

খেয়াল করেছি, বড় বড় দেশ থেকে আসা লোকজন পরিচিত হতে পছন্দ করে নিজেদের দেশের নামে, জাতির নামে। আর নিজেদের সংখ্যালঘু ভাবা লোকজনদের দেখেছি ধর্ম দিয়ে পরিচিত হতে। ( ব্যক্তি পর্যায়ে নিয়েন না কেউ, বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে দেখেছি)।

এই বাংলাদেশি বলার কারণে আমাকে সৌদি আরবের একজন ক্লাসমেটের কাছে বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে দিনের পর দিন। আমার আশে-পাশের কোন সিটে সে বসতোই না, এমনকি গ্রুপ ওয়ার্ক পর্যন্ত আমার সাথে দিলে সে চেইঞ্জ করে ফেলতো। এদের কাছে আমার মুসলমানিত্বের কোনো দাম পাইনি। বাংলাদেশি মানেই আমি মিসকিন। ওর সাথে আমার আর কথা না হলেও আরেক সৌদি আরবীর সাথে ভালো খাতির হলে একবার বললাম; দেখো, বাংলাদেশি বলতেই তুমি কী ভাবো জানি না, তবে মনে রেখো, তোমার মতো আমিও আমেরিকান প্রাইভেট কলেজে পড়ছি প্রচুর টাকা খরচ করে, মানে আমার সেই ক্ষমতা আছে। আর বাংলাদেশে যারা আছে, দেশে তাদের উন্নতভাবে জীবন যাপন করার যোগ্যতা আছে বলেই দেশে থাকে। তোমার দেশে বাংলাদেশের যারা যায়, ছোট কাজ করে,তাদের পড়াশুনা যেমন থাকে না, তেমনি দেশে করার মতো কিছু থাকে না বলেই নিজেদের জমিজমা বিক্রি করে হলেও তোমাদের দেশে যায়। পারলে তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করো। আর তোমার দেশের লোকজনদের বলো ওদের সাথে একটু কোমল ব্যবহার করতে।

আমি আজ পর্যন্ত কোন সৌদি আরবীয়কে দেখেনি যে মুসলিম মুসলিম করে নিজেদের পরিচয় দিতে বা অন্যের পরিচয় খুঁজতে। নাচতে, গাইতে দেখেছি একসাথে অন্যান্য দেশের লোকজনদের সাথে সমান তালে। দুই অবস্থায় পড়ে আমার আর বুঝতে বাকি নেই যে,ধর্মের দিকে যারাই টানে, তা তাদের মানসিক দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 3.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3.2K
    Shares

লেখাটি ৯,৫৭৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.