“কেবল সন্তানই নয়, মায়েরা ইতিহাসও জন্ম দেয়”

0

সারোয়ার তুষার:

সত্তর-আশির দশকের আর্জেন্টিনার মায়েদের কথা মনে আছে নিশ্চই সবার। বিশ্বজুড়ে তারা পরিচিত ‘mothers of the disappeared’ হিসেবে। ১৯৭৬-৮৩ সালে আর্জেন্টিনার স্বৈরাচারী সামরিক সরকার সেই দেশের ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষকে গুম, এনকাউন্টার, গোপন আটক, টর্চার সহ নানাভাবে দমন করতো। কোন দৃশ্যমান প্রতিবাদ প্রতিরোধ ছিল না।

তারপর একসময় এই ‘হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া’, রাজনৈতিক কারণে হত্যার শিকার হওয়া ১৪ জন সন্তানের মা তাদের সন্তানদের ছবিসহ প্রেসিডেন্সাল প্যালেসের সামনের জড়ো হতে থাকে নিয়মিত। তাদের ‘হারিয়ে যাওয়া’ সন্তানদের খোঁজ চায় রাষ্ট্রের কাছে। সন্তানের খোঁজ চাওয়া মায়েদের সংখ্যা ক্রমশঃ বাড়তে থাকে এবং একসময় এই মায়েরা নিজেদের ‘mothers of all opressed’ বলে পরিচয় দিতে শুরু করেন।

আর্জেন্টিনার রাষ্ট্র ও ক্যাথলিক চার্চ সেইসময়ে এই ধারণা প্রচার করতো যে, ‘ভালো’ মাকে অবশ্যই ঘরোয়া পরিসরে থাকতে হবে, রাজনৈতিক ব্যাপারে মাথা ঘামানো, ঘরের বাইরে অবাধ চলাফেরা করা ঠিক ‘মাতৃসুলভ’ নয়। যেসব নারীরা ঘরের বাইরে বের হয়, তারা ‘ভালো’ মা নয়, তারা ‘বেশ্যা’, ‘পাগল নারী’ ইত্যাদি। কিন্তু এই ‘হারিয়ে যাওয়া’ মায়েরা ‘ভালো মাতৃত্বের’ সংজ্ঞাই বদলে দেন, তারা বলতে শুরু করেন, “ভালো মায়ের প্রধান কর্তব্য হচ্ছে সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সন্তানের জন্য উদ্বিগ্ন হওয়া। সামরিক জান্তা কেবল আমাদের সন্তানদেরই আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছে না। আমাদের পরিবারের সুখ শান্তি স্থিতিশীলতা সবই তারা কেড়ে নিচ্ছে। আমাদের সন্তানরাই কেবল গুম হচ্ছে না, গুম হয়ে যাচ্ছে আমাদের গোটা পরিবার। আমাদের সন্তানই যদি আমাদের বুকে না থাকে, তাহলে আর পরিবারের কী অর্থ থাকে? সুতরাং নিজেদের সন্তানদের জন্য উদ্বিগ্ন হতে হতে আমরা দেশের সব সন্তানেরই মা হয়ে গেছি। গোটা দেশের সব মায়ের আকুতিই আমরা গর্ভে ধারণ করা শুরু করেছি।”

এভাবে আর্জেন্টিনার মায়েদের এই প্রতিবাদ পুরো বিশ্বেই আলোড়ন তৈরি করেছিল। ‘অরাজনৈতিক’ মায়েরাই দীর্ঘকাল সামরিক জান্তার একমাত্র রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছিলেন। এমনকি এই ‘মাদারস অব অল চিলড্রেন’কে সামরিক জান্তার গুম নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল।

একইভাবে ২০০৪ সালে ১২ জন মনিপুরী মা নগ্ন হয়ে প্রতিবাদ করেন রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক একের পর এক নারীদের ধর্ষণের। ‘আফস্পা’ ( AFSPA- armed forces special power act) নামক দায়মুক্তি আইনের দরুণ ভারতীয় সেনাবাহিনী মনিপুর নাগাল্যান্ড মিজোরাম আসামের মতো অঞ্চলগুলোতে গণতান্ত্রিক ও স্বাধীনতাকামী আন্দোলনগুলোকে যেকোনো নির্মম উপায়ে দমন করার রাষ্ট্রীয় অনুমোদন পেয়েছিল। গুম খুন ধর্ষণসহ যেকোনো রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকেই ‘বিদ্রোহ দমনের কৌশল’ হিসাবে দেখা হতো, এখনো হয়। এই বাস্তবতায় ‘Indian Army, rape us! Kill us!’ লেখা এক ব্যানার নিয়ে এই মায়েরা প্রকাশ্যে প্রতিবাদ শুরু করেন রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের হাতিয়ার ধর্ষণের বিরুদ্ধে।

আর্জেন্টিনার মায়েদের এই অপ্রত্যাশিত বীরত্বপূর্ণ লড়াই নিছক ইতিহাস হিসেবে পড়তে পারলেই স্বস্তি পেতাম। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুম খুন এনকাউন্টার সিক্রেট ডিটেনশন এমন দুঃসহ বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে যে বাংলাদেশের মায়েদেরকেও তাদের সন্তানের ছবিসহ পাবলিক স্পেসে হাজির হতে হচ্ছে। অশ্রুসজল নয়নে তারা তাদের সন্তানদের খোঁজ চাইছেন সরকারের কাছে। গতকালকেও একজন গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদের পরপরই রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেছে। ত্বকী, বিশ্বজিৎ, তনু, কল্পনা চাকমা, রোমেল, মিথুন চাকমাদের মায়েদের কাছে মা দিবস কীভাবে হাজির হয়? সন্তানকে হারিয়ে কেমন আছেন এই মায়েরা? যার বাবা-মা উভয়কে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, সেই সাগর-রুনির সন্তান কেমন আছে আজ? কেমন কাটে তার প্রতিদিন?

ভারতীয় এক জেনারেল বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেক্টর কমান্ডার কর্নেল কাজী নুরুজ্জামানকে একবার বলেছিলেন, বাংলাদেশ যুদ্ধে জিততে পেরেছে, কারণ এখানকার মায়েরা তাদের সন্তানদের যুদ্ধে পাঠিয়েছিল; যার অসাধারণ হৃদয়বিদারক বর্ণনা আমরা পাই জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইতে। নিশ্চিত মৃত্যু হতে পারে জেনেও, যুদ্ধকালীন টালমাটাল পরিস্থিতিতে সন্তানকে নিজ বুকে আগলে রাখতে চাওয়ার মা সুলভ আকুতি থাকার পরেও জাহানারা ইমাম যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন তাঁর সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো সন্তানকে, যাকে পানির গ্লাসটাও এগিয়ে দিতে হতো এতোদিন। জাহানারা ইমাম বাংলাদেশের অজস্র মায়ের প্রতীক হয়ে আছেন এই কারণেই, যিনি কেবল সন্তানকে যুদ্ধেই পাঠাননি, এই দেশের সন্তানদের যারা হত্যা করেছে নির্মমভাবে, যারা হত্যার সহযোগী ছিল, তাদের বিচারের দাবিতে তিনি সংগ্রাম করেছেন আমৃত্যু।

কিংবা আজাদের মা? ছেলের সাথে যার সর্বশেষ দেখা হয়েছিল জেলে, ছেলে ভাত খেতে চেয়েছিল, পরেরদিন ভাত নিয়ে গিয়ে মা আর ছেলেকে পাননি, তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। এরপর যতদিন জীবিত ছিলেন, ভাত মুখে দেননি মা, নরম বিছানায় ঘুমাননি। মায়েরা যদি যোদ্ধা না হয়, তাহলে আর কারা যোদ্ধা?

এমনকি মা দিবসের পটভূমিতেও দেখতে পাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মায়েদের যুদ্ধবিরোধী ভূমিকা। যুদ্ধের প্রধানতম বলি মায়েরা, তাদের বুক খালি হয় যুদ্ধে। মায়েরা তাই যুদ্ধ চায় না। মাসকয়েক আগে এক ফিলিস্তিনি মা বলেছিলেন, ফিলিস্তিনে মা হওয়ার অর্থই হচ্ছে রাজনৈতিক কর্মী হওয়া। আমাদের সন্তানেরা দখলদার ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, আর আমরা ঘরে বসে থাকবো?

পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামো মায়েদের ভূমিকাকে নিষ্ক্রিয়, আনুগত্যপরায়ণ হিসেবে উপস্থাপন করে। আবার বংশ পরম্পরা ও উত্তরাধিকার নির্বিঘ্ন করতে সন্তান লালন পালনের ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকাকে মহিমান্বিতও করে, যদিও সন্তান ধারণ, পুনরুৎপাদনের মত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে নারীর স্বাধীন ভূমিকাকে স্বীকার করে না। কিন্তু এমনকি এই ব্যবস্থাতেও মায়েরা কখনো নীরবে কখনো সরবে লড়ে যান। কিন্তু যেহেতু ‘বীরত্ব’, ‘আত্মত্যাগ’ পুরুষতান্ত্রিক ডিসকোর্সে পরিণত হয়েছে, মায়েদের লড়াইকে তাই ঠিক ‘লড়াই’ মনে হয় না।

এর চেয়ে মা দিবসকে একটা কর্পোরেট ব্যবসা বাণিজ্যের দিবসে পরিণত করা গেলে অনেক সুবিধা, যেমন শুধুমাত্র গত বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মা দিবসে ২৩.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য হয়েছে। বাণিজ্য খারাপ কিছু না, কিন্তু একটা দিবসের মূল স্পিরিটকে গিলে ফেলে তাকে বাড়তি বেচাবিক্রির দিবসে পরিণত করার আইডিয়ার মধ্যে ঘোরতর সমস্যা আছে। এটা ঠিক কেমন আর্থ রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে মায়েরা তাদের সন্তানদের নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবে, সেই আলাপকে স্রেফ ‘নাই’ করে দেয়। রাষ্ট্রের স্বৈরাচার ও রাক্ষসমূর্তিকে আড়াল করে।

কেবল নারীরই নয়, ‘মাতৃত্ব’ হোক সামাজিক। এটাই হোক মা দিবসের চেতনা।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 129
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    129
    Shares

লেখাটি ৩৭০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.