‘মা হওয়ার’ কিংবা ‘মা না হওয়ার’ সিদ্ধান্তটা কার?

0

জিনাত হাসিবা স্বর্ণা:

মা হওয়া কিংবা না হওয়ার সিদ্ধান্তে সরাসরি যে মানুষটার জীবনে প্রভাব পড়ে সে সেই নারী। কিন্তু কয়জন নারী সেই সিদ্ধান্ত নিজে নেয়? একদল তো আছেন যার যৌনজীবন নিজের আয়ত্ত্বের একেবারেই বাইরে, প্রাপ্তবয়স্ক হবার আগেই ‘বিয়ে দিয়ে’ বাবা-মা ‘দায়িত্ব পালন’ করে বসে থাকেন। যেটাকে আমরা শিশু/বাল্যবিয়ে বলে থাকি।
এই দলের ‘মা’ হবার সিদ্ধান্তে কোনোই অংশ নেই। তারা কেবলই বংশবৃদ্ধিতে ব্যবহৃত। কিন্তু ‘শিক্ষিত‘ কিংবা ‘কর্মজীবী’ যে নারীরা, তাদেরই কি এই সিদ্ধান্তে ভূমিকা আছে কোনো? স্বেচ্ছায় মা হলেন বা স্বামী/পরিবার/সমাজের (এমনকি ডাক্তারের) চাপে পড়ে মা হলেন, তাতে কিছু এসে যায় না। মায়ের উপর যে প্রত্যাশার ভার, তাতে কিন্তু কমতি নেই। পান থেকে চুন খসলেই, ‘কেমন মা?’ অভিযোগে তোপের মুখে পড়তে হয় কমবেশি সব মাকেই।

এমনকি যে সন্তানেরা মায়ের মহিমায় আর গুণগানে চারদিক আলোকিত করে রাখেন, তারাও মায়ের দিকে আঙুল তুলতে একটুও দ্বিধা করেন না যখন নিজের স্বার্থে টান পড়ে। মা ‘যথাযথ’ যত্ন করছেন না? মা ‘নিজের খেয়ালে’ থাকেন? মা ‘অন্য কারো’ প্রেমে পড়েছেন? মা সংসার ‘ভাঙতে’ চাইছেন? এর যেকোনো কিছু হলেই সন্তানদের ভীষণ লেগে যায়। মা তখন ভীষণ খারাপ। তিনি আর মা-ই নন, ডাইনি সদৃশ কিছু। মা যদি লক্ষ্মীটির মতোন সন্তানের যত্নে লেগে থাকেন, মা যদি বাবাতেই তার জীবন-মরণ খুঁজে পান, মা যদি যেকোনো মূল্যে সংসার এবং সন্তানদের আগলে রাখেন, তাহলে সে-ই হলো ‘মা’। ‘মহিমান্বিত’ এক চরিত্র! কোনো কারণে উনি মানুষ হয়ে উঠলেই সব গেলো!

আমাদের পরিবারগুলো যেমন জেনে বুঝেই নিরন্তর বিভিন্ন মাধ্যমে চাপ তৈরি করতে থাকে যেন বিবাহিত মেয়েটি অবশ্যই দ্রুত ‘মা’ হয়ে উঠে, তেমনটি কিন্তু নজর দেন না সন্তান জন্ম দেওয়ার পরেও যেন এই মেয়েটি ‘মানুষ’ হিসেবে বেঁচে থাকে সেইদিকে। আমাদের সমাজ যেমন করে জন্মনিয়ন্ত্রণে/সন্তানধারণে নারীটিকে দায়বদ্ধ করে, তেমনি করে পুরুষটিকে দায়বদ্ধ করেনা জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি অবলম্বনে কিংবা সন্তান ধারণে।

ডাক্তারেরা নারীর শরীর আর বয়সকে মাথায় রেখে যখন সহজেই সন্তান ধারণের পরামর্শ দিয়ে ফেলেন, তখন মোটেই আমলে নেন না এই নারীর মানসিক অবস্থান আর ব্যক্তিজীবনের পছন্দ-অপছন্দ তার সুস্থ থাকা না থাকার উপর কতোখানি প্রভাব ফেলে।

রাষ্ট্র যখন জন্মনিয়ন্ত্রণের আর সন্তানের যত্নের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা রাখেন নারীর জন্য, তখন এটা বিবেচনা করেন না যে এর সাথে সাথে শিশুর জন্মের আগের পরের সমস্ত দায়ভারও সেই নারীর উপর বর্তানোরই ব্যবস্থা করা হলো।

মা দিবসে মায়েদের অতি/মহামানব হিসেবে মহিমান্বিত করার চেয়ে মানুষ হিসেবে তাদের অবস্থান বোঝাটা বেশি জরুরী। এই মহিমান্বিত অবস্থানের টোপে পড়ে ‘মা’ হবার দায়ভার নারীরা আর বেশিদিন নিবেন না। কারণ আজ হোক কাল হোক, ‘মা হওয়ার’ কিংবা ‘মা না হওয়ার’ সিদ্ধান্ত নেবার মতোন যোগ্যতা এবং অবস্থানে তারা পৌঁছবেন। সেই সিদ্ধান্ত অবশ্যই কারো না কারো ‘বাবা হওয়ার’ কিংবা ‘বাবা না হওয়ার’ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে। শেষমেষ সিদ্ধান্তটা কেমন হবে তা নির্ভর করে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র আর বিজ্ঞান দিনে দিনে কতটুকু তৈরি হচ্ছে তার উপর।

জিনাত হাসিবা , ১৩ মে ২০১৮

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 395
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    395
    Shares

লেখাটি ৮১৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.