বাবু-মা তোমাদের না পেলে ব্যর্থ হতো এ জীবন

0

সেবিকা দেবনাথ:

‘মা’ তখনও মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেনি। বিয়ে হয়ে গেলো। বিয়ের বছরই পরীক্ষায় বসে কোন রকমে পাস করলেন। ওই পর্যন্তই। লেখাপড়ায় আহামরি গোছের না হলেও বাংলার অধ্যাপকের মেয়ে হিসেবে তার আরও কিছুদূর লেখাপড়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু বিয়ের পর আর পড়ালেখা হয়নি। সংসার-সন্তানের জালে একে একে জড়িয়ে পড়লেন মা।

তখনও দেবুর (ভাই) জন্ম হয়নি। বয়সের ব্যবধান পাঁচ-ছয় বছর হলেও পরপর চার চারটে বোন হলাম আমরা। চার মেয়ে নিয়ে বাবু-মা’র মনে কোনো আক্ষেপ না থাকলেও আত্মীয়-স্বজনদের ট্যারা-ব্যাকা কথা অব্যাহত থাকলো। একটু বলি, বড় ছেলের চার মেয়ে নিয়ে ঠাকুরদা কিছুটা অসুখী হলেও ঠাকুমাকে কখনও এ নিয়ে মনোকষ্টে ভুগতে দেখিনি। আর মামার বাড়ি! সেখানে তো সব সময় আমরাই রাজত্ব করেছি, এখনও করছি।

ছোট বোন রথী যখন হবে, সবাই ভেবেছিল এবার বুঝি ছেলে হবে। কিন্তু সবাইকে নিরাশ করে রথী এলো এই পৃথিবীতে। কী সুন্দর এক শিশু! দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। কিন্তু তাতে মন ভরলো না আমার পরিবারের অন্য সদস্যদের। আকাশ ভেঙ্গে পড়লো যেন। ওকে স্নান করানোর জন্য নার্সিং হোমের নার্স গরম জল আনতে বলায় আমার পরিবারের এক সদস্য বলেছিল, ‘গরম জল লাগবে না ঠাণ্ডা জল দিয়েই স্নান করান’। এ ঘটনার পর ওই ব্যক্তির সঙ্গে অনেক বছর বড়দি কথা বলেনি।

ওস্তাদ রেখে বড়দির গান শেখা, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমার নাচ করা নিয়েও অনেকে অনেক আপত্তিকর মন্তব্য করতেন। ওসব কথায় বাবু-মা কষ্ট পেতেন ঠিকই কিন্তু আমাদের তা বুঝতে দিতেন না। আত্মীয়-স্বজনদের তীক্ষ্ন কথাগুলো বাবু-মা’কে বিশেষ করে মা’কে যেন আরও কঠোর করে দিতো। লেখাপড়া করতে না চাইলেই, বাবু-মা বলতেন, ‘যত যাই করো, গ্র্যাজুয়েশন করতেই হবে।’ বাবুর একটাই কথা ছিল, গ্র্যাজুয়েশন শেষ না করিয়ে তিনি তার কোনো মেয়েকে বিয়ে দেবেন না।

মানুষ কতটা হতে পেরেছি জানি না। তবে আমরা চার বোনই মাস্টার্স শেষ করেছি। ভাইটা এখন ইংরেজিতে অনার্স পড়ছে। প্রতিটি বাবা-মা’ই চায় তার অপূর্ণ ইচ্ছাগুলো সন্তানের মধ্য দিয়ে পূরণ করতে। আমার বাবু-মা’ও তা চাইতেন। কিন্তু তারা কোন দিনই কোন কিছু আমাদের উপর চাপিয়ে দেননি। তাদের মতামত জানানোর পাশাপাশি আমাদের মতটাও জানতে চেয়েছেন। এখনও চান।

চার বোনই চাকরি করছি। হয়তো আহা মরি কোন কিছু হতে পারিনি, কিন্তু ওতেই যেন মা সুখী। তার মেয়েরা চাকরি করছে, অর্থ উপার্জন করতে পারছে, নিজের একটা পরিচয় তৈরি করতে পেরেছে, তা ভেবেই তিনি সুখ অনুভব করেন।

যারা আমার বাবু-মা’র চার মেয়েকে নিয়ে ভীষণ চিন্তিত ছিলেন, এখনও তারা চিন্তিত। কারণ এখণও আমাদের তিন বোনের বিয়ে হয়নি। সময়-সুযোগ পেলেই তারা তাদের দুঃশ্চিন্তার কথা বাবু-মাকে জানিয়ে দেন। আগের মতোই তারা সেই কথাগুলো হজম করেন। এ নিয়ে যখন আমরা বাবু-মা’কে দু-এক কথা শোনাই, তখন মা বলেন, ‘তুমি কতটা বড় হয়েছো তা তুমি পরিচয় দেবে তোমার ব্যবহারে, কথায়। মুখের উপর কথা বলে দেয়ার মধ্যে কোন বাহাদুরী নেই। যে সয় সে রয়।’

মা’র কোনো গুণ কিংবা তার মতো সয়ে যাওয়ার ক্ষমতা আমাদের কোনো বোনেরই হয়নি। তাই হুট হাট করে মাথা গরম হয়। দুই একটা ভুল-ভাল কথাও বলে ফেলি। তাতে মা কষ্টই পান। আক্ষেপ করে বলেন, ‘লেখাপড়া শিখে তাইলে তোদের কী লাভ হলো?’

যতটা সহজে এই কথাগুলো বললাম, চার মেয়েকে নিয়ে মায়ের পথ চলটা মোটেও ততটা সহজ ছিল না। বাবু-মা’র প্রথম জীবনের সংসারে আর্থিক স্বচ্ছলতা খুব একটা ছিল না। বাবুর সীমিত আয়ে সন্তান এবং দুই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মানিয়ে চলাটা আর্থিকভাবে অনেকটা স্বচ্ছল পরিবার থেকে আসা একটি মেয়ের পক্ষে কতটা কষ্টের তা ভুক্তভোগীরাই জানেন।

কিন্তু মা পেরেছেন। বড় মেয়ে এবং বড় বৌ হিসেবে প্রতিটি দায়িত্ব মা পালন করেছেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে। সবার মন জুগিয়ে চলা একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু যতটা সম্ভব মা তা করেন। ছোট বেলায় মাকে হারিয়ে পাঁচ ভাই-বোনের মা হয়ে উঠেন আমার মা। মাঝে মাঝে মামা-মাসিকে খুব অসহ্য লাগতো। মনে হতো, তারা মা’র আদরে ভাগ নিয়ে নিচ্ছে। তখন বুঝিনি মা’র ছায়াটা কতটা শক্তিশালী। মামারা এখনও সংসারের খুঁটিনাটি থেকে শুরু করে সব কিছু মা’র সঙ্গে শেয়ার করেন। মা’র পরামর্শ চান। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও বই পড়া মা’র অন্যতম সখ। এখনও বই পড়েন। পৃথিবীর তাবৎ খবর তাকে আকৃষ্ট করে। খুটিয়ে খুটিয়ে জানতে চান। জেনে আনন্দ পান। এত অল্পতে সন্তুষ্ট হতে আমি খুব কম সংখ্যক মানুষকে দেখেছি।

মা’র মাঝে আশ্চর্য্য এক ক্ষমতা আছে। যে কাজে মা’র সায় থাকে না আমি লক্ষ্য করেছি, সেই কাজটা কিছুতেই যেন হতে চায় না। এটা আমাদের ভাই-বোনের বেলায় যেমন সত্যি, তেমনি মামাদের বেলায়ও। প্রায়ই মা’কে বলি, ‘মা তো অন্তর্যামী’। মা হেসে বলেন, ‘ধুর বোকা, ওসব কিছু না। যে কাজ করতে মন সায় দেয় না সেই কাজে কখনও সুফল আসে না।’

প্রতিটা সন্তানের কাছেই তার বাবা-মা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ। আমার কাছেও তাই। এখনও সামান্য পেট ব্যাথা থেকে শুরু করে বড় কোন অসুখ সবটাই মা’কে না জানিয়ে আমি কিছুতেই যেন শান্তি পাই না। শান্তির চেয়ে বড় কথা হলো, আমি কিছুতেই সুস্থ হই না। মা’র কাছে বলার পর যেন অর্ধেক অসুখ ভাল হয়ে যায় আমার। আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞাস করে আপনার প্রিয় খেলা কী, আমি উত্তর দেবো, মা’র পেটে ঠোঁট লাগিয়ে ‘ভুরর…ভুরর’ শব্দ করা। এখনও দারুণ লাগে। প্রিয় দৃশ্য, বাবু-মা’র হাসি। প্রিয় সুগন্ধি, উত্তর হবে, বাবু-মা’র গায়ের গন্ধ। মাঝে মাঝে বাবু-মার গামছায় নাক-মুখ গুজে রাখি। বড় বড় করে নিঃশ্বাস নেই। আমার মনে হয়, অফুরান অক্সিজেন ঢুকাচ্ছি শরীরে। হাল্কা কিংবা গড়গড় করে মা’র নাক ডাকার শব্দটাও যেন মনের মাঝে ভাল লাগা তৈরি করে।

বাবু-মা’র বাধ্যগত সন্তান হতে পারিনি আমি। পরজন্ম বলে যদি কিছু থাকে তবে, ঈশ্বরের কাছে একটাই চাওয়া তিনি যেন আমাকে বাবু-মা’র সন্তান করেই পাঠান। এই জন্মে তাদের যে ইচ্ছাগুলো পূরণ করতে পারিনি, পরের জন্মে যেন তার সবগুলো পূরণ করতে পারি। তাদের গর্বিত করতে পারি। এ জন্মে তোমায় একুটুই বলি, মা তোমায় ভালবাসি। বাবু তোমাকেও। তোমাদের না পেলে এই জীবনটাই সত্যিই ব্যর্থ হতো।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 193
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    193
    Shares

লেখাটি ২৬৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.