একজন সাহসী মায়ের ও আমাদের গল্প

0

ফারজানা আকসা জহুরা:

“গর্ভধারণ থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মায়েদের পরীক্ষা ও দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রতিটি মায়ের জীবনই এক একটি সংগ্রামী জীবন। মা শুধু সন্তান জন্ম দেয় না, সন্তানকে বাঁচতেও শেখায়। আসলে কি জানেন, মা কথাটি খুব ছোট হলেও মা হয়ে ওঠাটা বড্ড কঠিন”।

আমার মা তেমন কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন না। আর দশটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মায়ের মতো তিনিও অতি সাধারণ মা ছিলেন। যদিত্ত আমার চোখে তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ নারী।

আমরা পরপর অনেকগুলি বোন ছিলাম। সাধারণত বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীদের ছোট থেকেই ইভটিজিং এর শিকার হতে হয়। কিন্তু আমার মায়ের ভয়ে পাড়ার ছেলেরা আমাদের খারাপ কিছু বলা তো দূরের কথা, খারাপ চোখে তাকাতেও পারতো না। আমার মা সবার সাথে সবসময় হাসি মুখে কথা বলতেন। কিন্তু কেউ যখন আমাদের বারান্দার সামনে বেশিক্ষণ দাড়িয়ে থাকতো, তখন আমার মা তাকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতো, কেনো সে এতোক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে? কী সমস্যা? ইত্যাদি … ইত্যাদি।

আমার মাকে পাড়ার সবাই ভয় পেতো, কারণ আমার মা এলাকার নামকরা গুণ্ডা-পাণ্ডাদেরও মুখের উপর উচিত কথা বলতে ছাড়তেন না, তাদের টেক্কা দিয়ে চলতেন। এর পরেও তারা আমার মাকে শ্রদ্ধাও করতো, কারণ, তিনি সবার সাথে ভালো ব্যবহার করতেন। অন্যের বিপদে আপদে সাহায্য করতেন। পাড়ার যে কোনো সমস্যা এগিয়ে যেতেন। এমনও হয়েছে আমার মা পাড়ার ছেলেদের অনেক বকাঝকা করেছেন, তবুও তারা কেউ মায়ের মুখে মুখে তর্ক করেনি। নিজেদের দোষ স্বীকার করে মাফ চেয়েছে। ইচ্ছে হলে তারা মায়ের সাথে তর্ক করতে পারতো, পারতো মা’কে অসম্মান করতে, কিন্তু তারা সেটা পারেনি। আর এই না পারাটা আমার মা নিজের যোগ্যতা দিয়ে অর্জন করেছিলেন।

আমার মা সবসময় মাথায় কাপড় দিয়ে চলতেন, কিন্তু কখনো বোরখা পরেননি। সাজসজ্জা আর পটের বিবির মতো সেজেগুজে বসে থাকা তার খুব অপচ্ছন্দ ছিল। সংসারের কাজকর্ম ছাড়াও বাইরের কাজকর্ম তিনিই দেখতেন। আমাদের জমিজায়গা আর যাবতীয় ঝামেলা তিনিই সামলাতেন। এমনকি গুণ্ডাদের হুমকি ধমকানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিতেন। অনেকেই আম্মুর এই সাহস দেখে মুগ্ধও হতেন।

সংবাদপত্র আর বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে তার আগ্রহ ছিল অনেক। একটু আধটু বই পড়ার নেশাও ছিল। হাদিস, কোরান কোনো কিছুই বাদ রাখেননি কখনও। ধর্ম, সমাজ, ইতিহাস এই সামগ্রিক জ্ঞান আমার মাকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল।

আমরা যখন একটু বড় ৮/৯ শ্রেণিতে পড়ি, তখন আমার মা খেয়াল করলেন, আমার ছোটো চাচার বন্ধু যারা এতোদিন মাকে ভাবি বলতো, তারা হঠাৎ করেই মাকে আন্টি বলা শুরু করেছে। আমার মা তখন অনেককে সরাসরি প্রশ্ন করেন, “কীরে এতোদিন তোদের ভাবি ছিলাম, আজ আন্টি হয়ে গেলাম? মেয়ে বড় হলে বুঝি এমনই হয়?” ওনারা আর কখনো মাকে আন্টি বলেনি, আর আমাদের চাচ্চু বলেই সম্বোধন করতো।

একবার একজন আমার মাকে প্রশ্ন করেছিল, ভাবী, আপনি এতো চিল্লাচিল্লি করেন কেন? মা প্রতি উত্তরে বলে ছিলেন যে, “যার ঘরে চারটা সেয়ানা মেয়ে থাকে, তাকে একটু অধটু হুংকার দিয়েই চলতে হয়”।

কথায় আছে না, “বাপ গুণে বেটা, আর মা গুণে বেটি”। তাই আমাদের মধ্যেও মায়ের সাহস ও প্রতিবাদী চরিত্রটি অনেক বেশি বিদ্যমান। আমরাও আমার মায়ের মতো ছোট থেকে হুংকার দিয়েই চলি। রাস্তাঘাটে যখনই কোনো সমস্যা হয়েছে তখনই তার প্রতিবাদ করেছি। কেউ বিরক্ত করলে তখনই পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছি। আমাদের প্রশ্নে আমাদের প্রতিবাদ তাদের বাধ্য করেছে চুপ হতে।

আমাদের এক ইংরেজী শিক্ষক একবার আমাদেরকে প্রশ্ন করেছিলেন যে রাস্তায় আমাদের কেউ কখনও কোনো বিরক্ত করে কি না? আমরা স্যারকে বললাম, না তো স্যার, কেনো? স্যার বলেছিলেন, ছেলেরা সব মেয়েদের বিরক্ত করে না, কিছু কিছু মেয়ে থাকে যাদেরকে সবাই বিরক্ত করে মজা পায়! সেদিন স্যার ওমন কথা কেন বলেছিলেন, তা তখন বুঝতে না পারলেও পরে ঠিকই বুঝতে পেরেছিলাম। আসলে যারা কখন কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করে না, একা একা চলাফেরা করতে পারে না, সবসময় অন্যের ছত্রছায়ায় চলাফেরা করে, এদের ছেলেরা একা পেলে একটু বেশি বিরক্ত করে। কারণ ছেলেরা জানে যে এরা কোনো উত্তর দিবে না।

আমার মা বলতেন, “পশুরা তাকেই আক্রমণ করে যে দুর্বল থাকে, সবল আর দৃঢ় মানুষকে সবাই সবসময় শ্রদ্ধাই করে”। কথাটা সবক্ষেত্রে ঠিক না হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দুর্বল নারীরা নির্যাতনের শিকার হয়। তাই তো, আমরাও মায়ের মতো সাহসী হওয়ার চেষ্টা করেছি সবসময়।

আজ থেকে ২০/২২ বছর আগে আমার মেজবোন জুডু ও কারাতে ব্ল্যাক বেল্ট পেয়েছিল। যা হয়তো এখনো অনেকে ভাবতে পারে না। আবার একা একা বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সাহস করেছিল। যা আমাদের সমাজে খুব স্বাভাবিক না।আমরাও ঢাকার বাইরে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি। আমার মা সবসময় চাইতেন, আমরা যেন নিজেরা স্বাবলম্বী হই, নিজেদের আলাদা পরিচয় তৈরি করতে পারি। নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারি। আমরাও তাই চেষ্টা করেছি। হয়তো পুরোটা পারিনি। তবুও চেষ্টা করছি।

আমার মা শুধু আমাদের মতো সুস্থ মেয়েদের মানুষ করেনি, প্রচণ্ড সহ্য আর ধৈর্য নিয়ে তার অটিস্টিক সন্তানকেও স্বাবলম্বী মানুষ বানিয়েছেন। লোকের কটু কথা আর তাচ্ছিল্যের পরেও সন্তানকে নিয়ে দিন রাত্রি বাইরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দুনিয়াদারি শিখিয়ে গেছেন। মানুষে হাসাহাসি আর সাধারণ স্কুলের অসহযোগিতার পরেও সাধারণ স্কুলেই নিজের ছেলেকে পড়িয়েছেন।

মনের অজান্তে আমরাও মায়ের মতো হওয়ার চেষ্টা করেছি। মায়ের প্রতিবাদী চরিত্রের কারণে আমরাও রাস্তা-ঘাটে-বাসে কখনও কোনো অন্যায় স্পর্শ সহ্য করিনি। সবসময় অন্যয়ের প্রতাবাদ ও প্রতিরোধ করেছি। রাস্তায় ও বাসে কত শত শয়তানকে যারা আমাদের ও অন্য নারীদের বিরক্ত করতো, তাদের গুঁতো দিয়ে…পায়ে পা দিয়ে জব্দ করেছি। আমাদের মতো তখন অনেকেই ছিল প্রতিবাদী। রাস্তায় যে কোনো সমস্যায় অন্য নারীরা এগিয়ে আসতো, প্রতিবাদও করতো। অনেকে আবার রাস্তার খারাপ মানুষগুলিরে পিটাতো। একটি মেয়ের দেখাদেখি অন্য মেয়েরা এগিয়ে আসতো।

হঠাৎ সেই প্রতিরোধ আর প্রতিবাদের চর্চাটা যেন হারিয়ে গেছে। দিনে দিনে আমরা প্রতিরক্ষা ও প্রতিবাদ দুটাই ভুলে যাচ্ছি। এখন আমরা সবকিছু দেখেও দেখি না, অন্যের বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই না। এখন সবাই খুব ভদ্র! তাই তো পেপার খুলে দেখি, রাস্তায় আর বাসের মধ্যে নারীদের যৌন হয়রানিকে কেউ অপরাধ বলে মনে করেন না! ঠিকই আছে, এইগুলি আমাদের চুপ থাকার ফল, আফটার অল উই আর এ গুড ওমেন!

এখন মেয়েরা নিজেদের সৌন্দর্য চর্চায় এতো ব্যস্ত যে, নিজের প্রতিরক্ষা করতেই ভুলে গেছে! মায়েরাও তেমনি, ভদ্র মেয়ে বানাতে গিয়ে দুর্বল মেয়ে বানাচ্ছে! ভালো ছাত্রছাত্রী বানাতে গিয়ে ভালো মানুষ বানাতে ভুলে যাচ্ছে! ছেলেমেয়েদের ছোটবেলা থেকে নিজেদের রক্ষার কৌশলটা শেখাতে পারছে না! তাদেরকে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের মনোভাব গড়ে তুলতে পারছে না। মা যদি নিজ সন্তানকে বাঁচতে না শেখায়, তাহলে কে তা শেখাবে?

মেয়েরা যদি ভাবে, আপাদমস্তক কাপড় তাদের রক্ষা করবে, সেটা ভুল।
যদি ভাবে পাত্তা না দিয়ে সে পার পাবে, সেটাও ভুল।
পড়তে হবে এবং জানতে হবে।
না জানলে এই সমাজ আমাদের ভুলভাল শেখাবে।
আমাদেরকে অজানা খাঁচায় বন্দী করবে।

প্রতিবাদী হতে হবে …. উত্তর দেওয়া শিখতে হবে ।
নিজেকে সুন্দরী না, বরং সাবলীল ও সবলভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
কেউ আক্রমণ করলে নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করতে হবে।
অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করতে হবে।
অন্যের বিপদে এগিয়ে যেতে হবে।

“বাঁচতে হলে হুংকার দাও”। তোমাদের বাঁচা দেখে, তোমাদের মেয়েরাও বাঁচতে শিখবে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 211
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    211
    Shares

লেখাটি ৭১৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.